চট্টগ্রামের ভূমি অধিগ্রহণ শাখার আলোচিত চেইনম্যান (শিকলবাহক) সেই নজরুল ইসলাম (৫৫) ও তার স্ত্রী আনোয়ারা বেগমের (৫২) বিরুদ্ধে প্রায় ১৩ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।


ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল এই সম্পদ অর্জনের পেছনে নজরুলের সাতজন নিকটাত্মীয়ের সম্পৃক্ততার তথ্যও পাওয়া গেছে। এ সাতজনকে অভিযুক্ত করে গত ৩০ এপ্রিল চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয় চট্টগ্রাম-২-এর উপপরিচালক মো. আতিকুল আলম।

নজরুল ইসলাম ১৯৯৪ সালের ২৪ আগস্ট চেইনম্যান পদে চট্টগ্রামের ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় ১ হাজার ৬৭৬ টাকা বেতনে চাকরিতে যোগ দেন। সবশেষ ২০১৯ সালে সর্বসাকল্যে তার বেতন ২৩ হাজার ১৫০ টাকা।


অভিযোগ রয়েছে, ৫৫ দিন আগে অনেকটা গোপনে অভিযোগপত্রটি আদালতে দাখিল করা হয়। তবে বিষয়টি জানাজানি হয় গত রবিবার। চার্জশিট দাখিলে কেন গোপনীয়তা সেই প্রশ্নের উত্তর দেননি দুদকের দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তা।

প্রায় দুই মাস আগে দাখিল করলেও আদালতে এই অভিযোগপত্র গ্রহণের ওপর শুনানি এখনো হয়নি। তবে শিগগির শুনানি হবে বলে গতকাল সোমবার বিকেলে  আদালতে দুদকের দায়িত্বপ্রাপ্ত জিআরও শাহেদ ইকবাল। তিনি জানান, দুর্নীতির মামলায় চেইনম্যান নজরুল ইসলাম জামিনে আছেন। অন্য আসামিরা গ্রেপ্তার হননি। অভিযোগপত্র গ্রহণের ওপর শুনানির দিন তাদের বিরুদ্ধে আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করতে পারে বলে জানান শাহেদ।  

এর আগে ২০১৯ সালের ২১ নভেম্বর ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে আয় করা ৯ কোটি ৭৭ লাখ ৩৫ হাজার ৯৭৬ টাকা ৫টি ব্যাংক হিসাবে সন্দেহজনক লেনদেন এবং ৩ কোটি ১৩ লাখ ৭৯ হাজার ৬৯৮ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে চেইনম্যান নজরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী আনোয়ারা বেগমের বিরুদ্ধে মামলা করেন দুদক, সজেকা, চট্টগ্রাম-২-এর সাবেক উপসহকারী পরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিন।

মামলা তদন্তের জন্য সংস্থাটির তৎকালীন উপপরিচালক মাহবুবুল আলমের নেতৃত্বে একটি টিম গঠন করা হয়।

সর্বশেষ ২০২২ সালের ২১ মার্চ মামলার তদন্তভার গ্রহণ করেন সংস্থাটির উপপরিচালক মো. আতিকুল আলম। ‘তদন্তে ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে নজরুল ও তার স্ত্রীর বিপুল পরিমাণ অর্থ, স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ অর্জনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। নজরুলের দুর্নীতি ও অনিয়মের সঙ্গী হয়েছেন তারই পাঁচজন নিকটাত্মীয়। তাদেরও অভিযুক্ত করা হয়েছে’  বলেন দুদক উপপরিচালক মো. আতিকুল আলম।

নজরুল ইসলাম এবং তার স্ত্রী আনোয়ারা বেগম ছাড়া অভিযুক্ত পাঁচ নিকটাত্মীয় হলেন হাটহাজারী পূর্ব দেওয়ান নগরের শওকত আকবরের স্ত্রী কোহিনুর আক্তার (৪২), একই উপজেলার গুমানমর্দ্দন ইউনিয়নের মীনা গাজী চৌধুরী বাড়ির ইদ্রিস মিয়ার ছেলে মো. জামাল উদ্দিন (৫০), একই ইউনিয়নের বালুখালী এলাকার মৃত রমজান আলীর ছেলে শামসুল আলম, নগরের মোহাম্মদপুর এলাকার শাহাদাত হোসেন (৩২) ও ষোলশহর ২ নম্বর গেট এলাকার নুরুল হক চৌধুরীর স্ত্রী সামশুন নাহার চৌধুরী (৪৫)। এর মধ্যে কোহিনুর আক্তার সম্পর্কে আনোয়ারা বেগমের বোন।

জানা গেছে, চেইনম্যান নজরুল ইসলাম বর্তমানে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে কর্মরত। তার গ্রামের বাড়ি হাটহাজারী উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের বালুখালী গ্রামে। বর্তমানে তিনি নগরের ওআর নিজাম রোড জুমাইরা পয়েন্ট ৩ নম্বর রোডের ৪০৪ নম্বর ফ্ল্যাটে থাকেন।

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, নজরুলের বাবা মৃত আলী আহমদ ছিলেন সাধারণ একজন কৃষক। পৈতৃক সূত্রে নজরুল কোনো সম্পত্তি পাননি। তার বড় ছেলে বর্তমানে লন্ডনে পড়াশোনা করছেন। ছোট ছেলে চট্টগ্রাম নগরের প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ সম্পন্ন করেছেন।

অভিযোগপত্র থেকে জানা যায়, নজরুলের স্ত্রীর নামে ট্রেড লাইসেন্স থাকলেও প্রকৃতপক্ষে তিনি একজন গৃহিণী। স্বামীর দুর্নীতির টাকায় তার নামে নগরের ওআর নিজাম রোডের ৩ নম্বর লেনে ‘জুমাইরা পয়েন্ট’ ভবন থেকে ২০১৫ সালের ৩ নভেম্বর কেনা হয়েছে ২০৭০ বর্গফুট আয়তনের একটি ফ্ল্যাট (৪০৪ নম্বর)। একই এলাকায় অবস্থিত ‘সানমার গ্লোভ গার্ডেন’ থেকে ২০১৮ সালের ২৯ জানুয়ারি কেনা হয় ১৬২০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট, ২০০২ সালে প্রায় ৩১ শতক জমি কেনা হয় হাটহাজারী থেকে।

আনোয়ারা বেগমের নামে নগরের খুলশী, পাঁচলাইশ ও জেলার হাটহাজারী থানা এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট, বাড়ি ও বিপুল পরিমাণ জমি রয়েছে। এ ছাড়া নগরের চিটাগাং শপিং কমপ্লেক্স থেকে স্ত্রী আনোয়ারার নামে কেনা হয় তিনটি দোকান। সেগুলো হলো দোকান নম্বর ২২, ৩০ ও ৩৭। নজরুল পরিবার নিয়ে থাকেন নগরের ওআর নিজাম রোড এলাকায় জুমাইরা পয়েন্ট নামের বহুতল ভবনের ৪০৪ ফ্ল্যাটে।

দুদক সূত্রে জানা যায়, মামলার দায় থেকে বাঁচতে ২০১২-১৩ থেকে ২০১৯-২০ করবর্ষ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৩১ লাখ টাকা আয়কর প্রদান করে রিভাইজড রিটার্ন দাখিল করেন নজরুল ইসলাম। কিন্তু নজরুলকে এই টাকা দেন তারই নিকটাত্মীয় অভিযোগপত্রভুক্ত অন্য আসামি মো. জামাল উদ্দিন। তিনি (জামাল উদ্দিন) তার মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেড, আমানবাজার শাখা থেকে ওই টাকা নজরুলকে দেন। ২০১৭ সালের ১৬ এপিল থেকে ২০১৯ সালের ২১ নভেম্বর পর্যন্ত আড়াই বছরে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, মুরাদপুর শাখায় অন্তত পাঁচ কোটি টাকা জমার তথ্য পেয়েছে দুদক।

সূত্রটি জানায়, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, ষোলশহর শাখায় থাকা এফডিআরের মেয়াদপূর্তির আগেই প্রায় ৬৩ লাখ টাকা উত্তোলন করে অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি জামাল উদ্দিনের মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের হিসাবে স্থানান্তর করেন নজরুলের স্ত্রী আনোয়ারা বেগম। তার নামে (আনোয়ারা বেগম) চিটাগাং শপিং কমপ্লেক্সে কেনা তিনটি দোকানের নামে ইউসিবিএল ব্যাংক, মুরাদপুর শাখায় থাকা পৃথক দুটি হিসাব নম্বরে ১ কোটি ৯ লাখ টাকার স্থিতি পেয়েছে দুদক। পাশাপাশি নজরুলের শ্যালিকা কোহিনুর আক্তারের ব্যাংক হিসাবে (ইউসিবিএল, মুরাদপুর শাখা) ২ কোটি ২ লাখ ৫৫ হাজার টাকা স্থিতি (২০২৩ সালের ৫ জানুয়ারি) পায় দুদক।

দুদকের কর্মকর্তারা আরও জানান, ভূমি অধিগ্রহণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা সরকারের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ বাবদ যে টাকা পান, সেই টাকা ছাড় করাতে কমিশন দিতে হয়। আর এই কমিশনের ভাগ অনেকেই পান। সেই কমিশন তোলার কাজটি করতেন চেইনম্যান নজরুলসহ এলএ অফিসের অন্যান্য অফিস সহকারী, সার্ভেয়ার ও কানুনগোরা।

এলএ অফিসের এক কর্মকর্তা  জানান, চেইনম্যান নজরুলের আরেক সহযোগী ছিলেন অফিস সহকারী আনোয়ার হোসেন। বছরখানেক আগে দুর্নীতির দায়ে তাকে সাতকানিয়া উপজেলায় বদলি করা হয়। চট্টগ্রাম শহরের কাতালগঞ্জ এলাকায় তার আলিশান ফ্ল্যাট বাড়ি ও গাড়ি আছে। তবে রহস্যজনক কারণে এখনো দুদকের কবজায় আসছেন না এই আনোয়ার হোসেন।

২০১৯ সালের ৭ নভেম্বর নগরে ষোলশহর ‘চিটাগাং শপিং কমপ্লেক্সের দোতলায় ‘আনুকা’ নামের দোকানে এলএ শাখার ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ পেয়ে দুদকের এনফোর্সমেন্ট অভিযান পরিচালনার করা হয়। এ সময় বিভিন্ন গ্রাহকের কাছ থেকে নেওয়া ঘুষের সাড়ে ৭ লাখ টাকাসহ ৯১ লাখ ৮৩ হাজার টাকার ১২টি চেক উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় দুদক জেলা সমন্বিত কার্যালয় চট্টগ্রাম-২ সহকারী পরিচালক রতন কুমার দাশ বাদী হয়ে পৃথক একটি মামলা করেন।