চট্টগ্রামে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রথম প্রতিবাদ করেছিলেন মৌলভী সৈয়দ ও এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীরা।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর একটি অপপ্রচার খুব করে চালানো হয় যে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দেশে কোন প্রতিবাদ হয়নি। অলিখিত বিধি-নিষেধ দেশের মানুষের মধ্যে এক ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে রেখেছিল। সারাদেশে কারফিউ জারি করে রেখেছে সামরিক জান্তা, খুনিদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও প্রতিবাদ করেছেন অনেকেই।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পরপরই চট্টগ্রামে যে ক’জন দলীয় নেতাকর্মী সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধে অবতীর্ন হয়েছিল শহীদ মৌলভী সৈয়দ ও মরহুম এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী তাদের মধ্যে অন্যতম।

৭১ এর বীর রনাঙ্গনের সাহসী এই দুই যুদ্ধা গেরিলা যুদ্ধের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ৭৫ পরবর্তী সময়ে জাতির জনকের স্ব-পরিবারের নিহত হওয়ার ঘটনাকে তাই স্বাভাবিক ভাবেই মেনে নিতে পারেননি তারা। তাই মৌলভী সৈয়দ ও এ বি এম মহিউদ্দীনরা সশস্ত্র বিপ্লবের ঘোষনা দিয়ে শুরু করেছিলেন গোপন মিশন। সফল ভাবে কয়েকটি সফল অপারেশনও পরিচালনা করেছিলেন।

১৯৭৬ সালের ৭ নভেম্বর দেশদ্রোহিতার অভিযোগে জিয়ার সামরিক সরকার মৌলভী সৈয়দ কে ১নং ও এ বি এম মহিউদ্দীন চৌধুরীকে ২নং আসামী করে মোট ১৬ জন বিপ্লবী নেতা কর্মীকে মামলা-১, মামলা-২, মামলা-৩ নামে পরিচিত ৩টি মামলা দায়ের করা হয়।

মৌলভী সৈয়দ

৭৫ এর ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর সারা দেশে যে কজন বিপ্লবী অস্ত্র হাতে মাঠে নেমেছেন তার অন্যতম তিনি। শুধু তাই নয় তিনি ৭৫ এর ১৫ আগস্টের পর সাবেক মেয়র মরহুম এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ সশস্ত্র বিপ্লবীদের সংগঠিত করেছেন, ভারতে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, দেশে তৎকালীন স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি সফল অপারেশনও করেছেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করতে গিয়ে যে কজন প্রাণ দিয়েছেন মৌলভী সৈয়দ তাদের মধ্যে প্রথম শহীদ।

মৌলভী সৈয়দ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে চট্টগ্রাম নগর গেরিলা বাহিনীর অধিনায়ক ছিলেন। অনলবর্ষী এই বক্তা চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন, সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বর্তমান দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোছলেম উদ্দীন আহমেদকে। এছাড়াও তিনি চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। সাধারণ সম্পাদক ছিলেন চট্টগ্রামের আরেক কিংবদন্তী নেতা সাবেক মেয়র এ বি এম মহিউদ্দীন চৌধুরী। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু ঘোষিত বাকশালের চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার যুগ্ম সম্পাদক এর দায়িত্ব দেওয়া হয় তাকে। সাধারণ সম্পাদক ছিলেন সাতকানিয়া থেকে নির্বাচিত সাবেক এমপি মরহুম জননেতা এম সিদ্দিক আহমদ। যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে আরো যারা দায়িত্ব পালন করেছিলেন তারা হলেন মরহুম জননেতা আতাউর রহমান খান কায়সার, সাতকানিয়ার কৃতি সন্তান এম আবু সালেহ, মরহুম এ.কে.এম আব্দুল মান্নান ও নাজিম উদ্দীন।

৭৫ এর ৩ নভেম্বর খালেদ মোশারফের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যখন জিয়াউর রহমান গ্রেফতার হন তখন খালেদ মোশারফের পক্ষে ঢাকার সমাবেশের অন্যতম উদ্যোক্তাদের একজন ছিলেন মৌলভী সৈয়দ।

৭ নভেম্বর পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্যে যখন খালেদ মোশারফ নিহত হন তখন মৌলভী সৈয়দ, এ বি এম মহিউদ্দীন চৌধুরী সহ পুরো দলটি ভারতে আশ্রয় নেন। এসময় ভারত থাকাকালীন সময়ে ইতিপূর্বে ৭৩ এর নির্বাচনের দলীয় সংসদ সদস্যদের নিয়ে তিনি প্রবাসী সরকার গঠনের তৎপরতা চালাতে থাকেন। যদিও এই কাজে তিনি ব্যার্থ হয়ে পুনরায় বাংলাদেশে আসা যাওয়ার মধ্যেই বিভিন্ন সরকারী স্থাপনার মধ্যে গেরিলা হামলা চালাতে থাকেন।

পরবর্তীতে ভারতে জাতীয় নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধির দল পরাজিত হলে মৌলভী সৈয়দ ও সহকর্মীদের ভারতীয় পুলিশ বাহিনী আটক করে ময়মনসিংহ বর্ডার দিয়ে পুশব্যাক করে। বাংলাদেশের সীমানার প্রবেশের সাথে সাথে সেদিন মৌলভী সৈয়দ সহ তার অনেক সহকর্মী বাংলাদেশের পুলিশের কাছে গ্রেফতার হন। পরবর্তীতে তাদের ঢাকার ক্যান্টনমেন্টের জায়েন্ট ইন্টারগেশন সেলে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করা হয়।

১৯৭৭ সালের ১১ আগস্ট স্বৈরশাসক জিয়াউর রহমান বিনা বিচারে তাকে হত্যা করেছিল। মেজর জিয়া সেদিন বিচারের নামে প্রহসন করে অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করেছিল। কর্ণেল তাহেরসহ অনেক মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করেছিল।

পরবর্তীতে সামরিক বাহিনীর হেলিকপ্টারে করে তার লাশ চট্টগ্রামের বাঁশখালীর গ্রামের বাড়িতে নিয়ে দাফন করে দীর্ঘ ১ মাস পুলিশ দিয়ে কবর পাহাড়া দেয় সামরিক সরকার। যাতে করে জনগন এই হত্যার প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে না পারে।

পূর্ন্যভূমি চট্টলার বীর পুরুষ, অসামান্য দেশপ্রেমের অধিকারী এই বীর জীবন উৎসর্গ করেছিলেন বঙ্গবন্ধুকে ভালবেসে দেশ সেবায়।

এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর জাতির সংকটকালে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা যখন প্রতিবাদ করার সাহস দেখাননি, তখন চট্টগ্রামে প্রকাশ্যে এর প্রতিবাদ করেছিলেন তদানীন্তন শ্রমিক নেতা এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। এরপর সামরিক সরকারের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিশোধ নিতে নেতাকর্মীদের সংগঠিত করেছিলেন তিনি।

 ‘মুক্তিযুদ্ধের আগে থেকেই জ্যেষ্ঠ নেতাদের পাশাপাশি চট্টগ্রামে তরুণ-যুবকদের আরও একটি রাজনৈতিক ধারা সক্রিয় ছিল। তারা ছিলেন শেখ ফজলুল হক মনির অনুসারী। এই ধারার নেতারা মিলে ১৯৭১ সালে জয় বাংলা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করেছিলেন। সেই জয় বাংলা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন তৎকালীন যুবনেতা মৌলভী সৈয়দ ও তৎকালীন শ্রমিক নেতা এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী।

১৫ আগস্টের শোকাবহ ঘটনার দু’দিন পর আগ্রাবাদ সরকারি কমার্স কলেজের মাঠে এক বৈঠক ডাকেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। বৈঠকে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে করণীয় সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। পরে মৌলভী সৈয়দ ও এস এম ইউসুফসহ চট্টগ্রামে ছাত্রলীগ-যুবলীগ-শ্রমিক লীগ নেতাকর্মীদের সংগঠিত করতে থাকেন।

তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তখন চট্টগ্রামে যে প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল তাতে ভীত হয়ে তৎকালীন সরকার দমন-নীতি অবলম্বন করে। বিদ্রোহের অভিযোগে তখন তিনটি মামলা দায়ের করা হয়। পরবর্তীতে ওই মামলাগুলো একত্রিত করে একটি চার্জশিট প্রদান করা হয়। মামলাটিকে তখন সরকারের পক্ষ থেকে ‘চট্টগ্রাম ষড়যন্ত্র’ মামলা বলে অভিহিত করা হয়েছে। মামলায় মৌলভী সৈয়দ ও মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ ১৬ জনকে আসামি করা হয়।

ওই মামলার পর সরকারের দমন-পীড়নের এক পর্যায়ে মহিউদ্দিন চৌধুরী ভারতে চলে যান। সেখান থেকে তিনি চট্টগ্রামে আন্দোলনকারীদের সংগঠিত করতে থাকেন। এসময় চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা থেকে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ ভারতে গিয়ে মহিউদ্দিন চৌধুরীদের গ্রুপে যোগ দেন।

এরপর প্রতিরোধের জন্য দেশ থেকে লোকজন রিক্রুট করে ভারতে নিয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। প্রশিক্ষণ শেষে সশস্ত্র যোদ্ধাদের দেশের ভেতর পাঠিয়ে গেরিলা তৎপরতা চালানোর পরিকল্পনা ছিল তাদের। পরে পরিস্থিতি অনুকুলে না আসায় সেই চিন্তা থেকে সরে এসে দেশে ফিরে আসেন  এবং আবারও চট্টগ্রামে দলকে সংগঠিত করেন।

দলমতের ঊর্ধ্বে ওঠা এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী ছিলেন চট্টগ্রামের জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ। পেয়েছিলেন ‘চট্টলবীর’ উপাধি। ১৯৪৪ সালের ১ ডিসেম্বর চট্টগ্রামে রাউজান উপজেলার গহিরা গ্রামে জন্ম তার। স্কুল জীবনেই তিনি জড়িয়ে পড়েন ছাত্র রাজনীতিতে। ১৯৬৮ ও ’৬৯ সালে চট্টগ্রাম নগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করা মহিউদ্দিন একাত্তরে গঠন করেন ‘জয় বাংলা’ বাহিনী। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে গিয়ে আইএসআই (পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা) এর হাতে আটক হয়ে অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করেন। পরে পাগলের আচরণ করে কারাগার থেকে ছাড়া পেয়ে পালিয়ে যান ভারতে। সেখানে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ শেষে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন সম্মুখ সমরে। যুদ্ধ করেন ভারত-বাংলা যৌথবাহিনীর মাউন্টেন ডিভিশনের অধীনে। স্বাধীনতার পর শ্রমিক রাজনীতিতে যুক্ত হন। যুবলীগের নগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক পদ পান। ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন বঙ্গবন্ধুর প্রিয়ভাজন।

প্রায় দুই যুগ মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক থাকার পর ২০০৬ সালের ২৭ জুন মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং মৃত্যু পর্যন্ত তিনি এই পদে ছিলেন। ১৯৯৪, ২০০০ ও ২০০৫ সালে তিন দফায় চট্টগ্রামের মেয়র নির্বাচিত হন তিনি।