প্রশাসন আন্তরিক হলে পাহাড় হতে অবৈধ দখলদার এবং অবৈধ বসতি উচ্ছেদ সম্ভব তার প্রমাণ আলিনগর এবং জঙ্গল সলিমপুর । প্রশাসনের চাপের মুখে প্রভাবশালী অবৈধ দখলদাররা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে । আলিনগর এবং জঙ্গল সলিমপুরের মত চট্টগ্রামের সব পাহাড় থেকে অবৈধ দখলদার এবং অবৈধ বসতি উচ্ছেদ করে সেখানে বনায়ন বা সব পাহাড়ী এলাকাকে সাফারী পার্ক করা সম্ভব।
চট্টগ্রামের সমস্ত পাহাড়গুলোকে “বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হেরিটেজ” ঘোষণা চট্টগ্রামের গণ মানুষের দাবি।
পাহাড়-নদী-সমুদ্রের অপূর্ব সমন্বয়ে সৌন্দর্যের লীলাভূমি চট্টগ্রাম শহর । কিন্তু পাহাড় কাটার কারণে ধীরে ধীরে সৌন্দর্য হারিয়ে গেছে চট্টগ্রাম শহরের ।
বন্দর নগরী চট্টগ্রাম ও আশেপাশে থামছে না পাহাড় কাটা। বেপরোয়া পাহাড়খেকো ভূমিদস্যুদের লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। তারা প্রকাশ্যে পাহাড় কেটে মাটি লুট করছে, জমি দখল করে গড়ে তুলছে অবৈধ বসতি। নির্বিচারে পাহাড় কর্তনের ফলে এ অঞ্চলে প্রতি বছরই পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটছে। আর তাতে ঘটছে গণমৃত্যুর ঘটনা।
প্রভাবশালী ব্যক্তিরা দলীয় নামে, সমিতির নামে এবং ধর্মীয় প্রতিষ্টানের নামে সরকারী পাহাড় দখল করে আছেন ।
গ্যাস, বিদ্যুত, পানিসহ সকল ধরনের সরকারী সেবা পাওয়ায় পাহাড়ে বসবাস করছে লোকজন। পাহাড়ে বিদ্যুত গ্যাস ওয়াসার সংযোগ থাকায় তাদের উচ্ছেদ করলেও সেবা সংস্থাগুলোর পাল্টাপাল্টি দোষারোপের সুযোগটা নিচ্ছে অবৈধ বসতি স্থাপনকারীরা। সূত্রমতে, পাহাড়ে বসতি গড়ার পেছনে রাজনৈতিক মদদপুষ্ট নেতারা জড়িত । বসতকারীদের ভোটব্যাংক হিসেব ব্যবহার করে জনপ্রতিনিধিরা। তাই তারা উচ্ছেদে অনীহা দেখায়। অসহায় লোকজনদের পাহাড়ে বাসা ভাড়া দিয়ে বিপুল অঙ্কের চাঁদাবাজি করছে। সরকারী সেবা সংস্থাগুলোর সংযোগ থাকায় পাহাড়ে বসতির আগ্রহ থামছে না। প্রতিবছরই উচ্ছেদ অভিযানে সেবা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে জেলা প্রশাসন। কিন্তু কিছুদিন পর লোকজন আবারও ফিরে যায় পুরনো আবাসস্থলে।
প্রশাসন আন্তরিক হলে পাহাড় হতে অবৈধ দখলদার এবং অবৈধ বসতি উচ্ছেদ সম্ভব তার প্রমাণ আলিনগর এবং জঙ্গল সলিমপুর । প্রশাসনের চাপের মুখে প্রভাবশালী অবৈধ দখলদাররা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে । আলিনগর এবং জঙ্গল সলিমপুরের মত চট্টগ্রামের সব পাহাড় থেকে অবৈধ দখলদার এবং অবৈধ বসতি উচ্ছেদ করে সেখানে বনায়ন বা পুরো পাহাড়ী এলাকাকে সাফারী পার্ক করা সম্ভব।
জঙ্গল সলিমপুর পরিদর্শনে গিয়ে ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ বলেন, পাহাড়ে আর কোন ভূমিদস্যু, কোন সন্ত্রাসীর জায়গা হবে না। পর্যায়ক্রমে চট্টগ্রাম শহর এবং আশেপাশের সকল পাহাড়কে ভূমিদস্যু এবং দখলদার মুক্ত করা হবে।
মন্ত্রী আরো বলেন, পাহাড়বেষ্টিত জঙ্গল সলিমপুরে কিছু উন্নয়ন প্রকল্প তৈরির কার্যক্রম সরকার হাতে নিয়েছে। তারমধ্যে রয়েছে আধুনিক সুযোগ সুবিধা সম্বলিত একটি স্পোর্টস ভিলেজ, জনসাধারণের চিকিৎসার জন্য হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল, সর্বসাধারণের জন্য একটি সাফারি পার্ক, কেন্দ্রীয় কারাগার, একটি নান্দনিক মসজিদ, উচ্চ শক্তির বেতার সম্প্রচার কেন্দ্র, পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং এখানে বসবাসকারী ছিন্নমূল জনসাধারণকে পুনর্বাসন।
জঙ্গল সলিমপুর পরিদর্শনে গিয়ে তথ্যমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদ বলেন, চট্টগ্রাম শহরে অনেক পাহাড় কেটে ফেলা হয়েছে। এই পুরো জায়গাটা পাহাড় ছিল। এগুলো নির্বিচারে ধ্বংস করা হয়েছে। নানা সমিতির নামে নানা ভাবে এই পাহাড় কাটা হয়েছে।
বায়েজিদ লিংক রোডের পাশের এই এলাকায় প্রায় ১৪০০ একর এবং পেছনে আরও ১৭০০ একর খাস জমি আছে জানিয়ে তিনি বলেন, “সত্বর যেটা দরকার তা হল- নোটিশ দিয়ে দেওয়া, যাতে আর কেউ যেন জায়গা দখল না করে। দখল অবশ্যই বেআইনী।
আর যারা প্রকৃত ভূমিহীন তাদের অবশ্যই সরকার পুনর্বাসন করবে।
চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ও পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মো. আশরাফ উদ্দিন "সকালের চট্টগ্রাম"কে বলেন,পাহাড়ের পাদদেশে যারা বসবাস করছে তারা মূলত অবৈধভাবে স্থাপনা করছে। পাহাড়ে বসবাসকারীদের স্থায়ীভাবে সরাতে ইউটিলিটি সার্ভিস যত কমানো যাবে, মানুষ সেখানে বসবাসে তত নিরুতসাহিত হবে। পাহাড় থেকে চলে যাবে। তাই বিদ্যুৎ বিভাগ যদি এমন কিছুর মাধ্যমে পুরোপুরি বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে দেয় তাহলে মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা না পেয়ে সেখানে আর অবস্থান করবে না।
তিনি আরও বলেন, ‘টিউবওয়েল থেকে পানি তুলতেও বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। এছাড়া টিভি দেখা থেকে শুরু করে মোবাইল ব্যবহার ও দৈনন্দিনের যাবতীয় কাজের ক্ষেত্রেও বিদ্যুৎ ছাড়া সম্ভব নয়। বিদ্যুতের অংশটা যদি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়। তাহলে পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাস নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
তবে আলিনগর এবং জঙ্গল সলিমপুরে অবৈধ দখলদার এবং বসবাসকারীদের উচ্ছেদ করে সরকারি স্থাপনা করা এবং প্রকৃত ভূমিহীনদের পুনর্বাসনের যে মহা পরিকল্পনায় সরকার নিয়েছেন তা দেখভাল করছেন জেলা প্রশাসক।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন "সকালের চট্টগ্রাম"কে বলেন, আমরা বিভিন্ন স্তরের সরকারি কর্মকর্তারা আলিনগর এবং জঙ্গল সলিমপুর সরেজমিনে পরিদর্শন করেছি। পুরো জায়গাটা আমরা দেখেছি। এখানে কীভাবে পুরো পাহাড় কেটে সাবাড় করে পরিবেশ বিপর্যস্ত করা হয়েছে। এখানের পুরোটাই সরকারের খাস জায়গা। এখানে যারা প্লট বিক্রি করেছে তারা পুরোটাই অবৈধভাবে করেছে। আলিনগর, জঙ্গল সলিমপুরসহ আশেপাশের যেসব সরকারী পাহাড় অবৈধ ভাবে দখল করে আছে সেসব সরকারি জায়গা উদ্ধারে সরকারী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবো আমরা।
জঙ্গল সলিমপুর পরিদর্শনে গিয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান বলেন, জঙ্গল সলিমপুরে সরকারের পরিবেশবান্ধব মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারা পরিদর্শন করেছেন। এখানে কোনো ধরনের অবৈধ স্থাপনা রাখা যাবে না। সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে।২০২৩ সালের মধ্যে প্রত্যেক গৃহহীন-ভূমিহীন মানুষকে পুনর্বাসনের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। যারা ভূমিহীন-গৃহহীন তাদের পুনর্বাসন করা হবে।
পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সচিব ও চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহম্মদ নাজমুল আহসান "সকালের চট্টগ্রাম"কে বলেন, বিশাল এ এলাকায় সবুজ পাহাড় ছিল। মানুষের বসতি ছিল না। ২০০০ সালের পর বিভিন্ন স্থান থেকে অপরাধীরা এখানে এসে আশ্রয় নিতে শুরু করে। পাহাড়ে অবৈধ দখলদার ও ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে অভিযান বন্ধ নেই। প্রশাসনের অগোচরে মুষ্টিমেয় লোক পাহাড় কেটে বসতি গড়ে তোলে। শুধু জঙ্গল সলিমপুরে ভেতরে প্রায় ৪০০ একর পাহাড় কেটে ন্যাড়া করে ফেলা হয়েছে। বর্তমানে এখানে ২৪ হাজার পরিবারের লক্ষাধিক লোকের বসবাস। তিনি বলেন, জঙ্গল সলিমপুর দেশের অভ্যন্তরে আরেক সাম্রাজ্য। আলীনগরে প্রবেশ করতে পরিচয়পত্র দেখাতে হত। কোনো অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোনসেট নেওয়া যেত না। প্রবেশমুখে সোর্স থাকতো। অপরিচিত লোক ঢুকলে ভেতরের লোকজনদের জানিয়ে দেওয়া হত। পরে ভেতরে থাকা লোকজন মহিলাদের অগ্রভাগে দিয়ে ভেতরে ব্যারিকেড সৃষ্টি করতো। ২০১৭ সালে এবং ২০১৯ সালে উচ্ছেদে গেলে বাধার মুখে পড়ে প্রশাসন। এমনকি গত ১৪ মে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের সলিমপুর পরিদর্শনের সময় একইভাবে নারীদের দিয়ে মানববন্ধন সৃষ্টি করা হয়।
এখানে ২০০৭ সালের পর থেকে বেশি দখল হয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পালিয়ে আসা চিহ্নিত আসামিদের অবস্থান রয়েছে। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে ৪-৫টি করে খুনের মামলাও রয়েছে।
মহানগর এবং আশেপাশের অন্যান্য পাহাড়গুলোতে অবৈধ দখলদার এবং বসবাসকারীদের উচ্ছেদের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা নোটিশ পাঠিয়েছি পাহাড় থেকে সরে যাওয়ার জন্য। নিজ থেকে সরে না গেলে আমরা প্রশাসনিকভাবে সবার সহযোগিতা নিয়ে উচ্ছেদ করবো । চট্টগ্রামের ঐতিহ্য সাগর, নদী ও পাহাড়। চট্টগ্রামের ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে আমরা প্রশাসন খুবই আন্তরিক, আমরা চট্টগ্রামের জনসাধারণ এবং সাংবাদিক ভাইদের সহযোগিতা কামনা করছি।
পাহাড় কেটে হাউজিং গড়ে তুলতে সহযোগী সরকারি সংস্থা সিডিএ
পশ্চিম খুলশীর যে জায়গায় পাহাড় কেটে নীলাচল হাউজিং গড়ে উঠেছে সেটির অনুমোদন দিয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনও পাহাড়ের মাঝে তাদের রাস্তা তৈরি করে দিয়েছে। অথচ ২০১৮ সালের ২৮ জানুয়ারি যখন এ আবাসিক এলাকা গড়ে তোলা হচ্ছিল তখন এখানে অভিযান চালিয়ে পাহাড় কাটার প্রমাণ হাতেনাতেই পেয়েছিল জেলা প্রশাসন। ২৭ নম্বর দাগে থাকা সাড়ে ৫ একর পাহাড়ের প্রায় আড়াই একর কেটে ফেলায় ১০ জনকে আসামি করে তখন মামলাও করেছিল পরিবেশ অধিদপ্তর। জব্দ করা হয়েছিল পাহাড় কাটার নানা সরঞ্জাম।
প্রশাসনের এমন নিষ্ফ্ক্রিয়তার কারণেই পাহাড় কাটার প্রমাণ হাতেনাতে পাওয়ার পরও এটিকে আবাসিক এলাকায় রূপান্তর করতে সক্ষম হয় দখলদাররা। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষও (চউক) তাদের দেয় প্লট ও ফ্ল্যাট করার অনুমোদন। আর চউকের কিছু কর্মকর্তার রয়েছে অপরাধীর সঙ্গে যোগসাজশ ।'
এছাড়া চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়কে সমতল দেখিয়ে নকশা অনুমোদনেরও অভিযোগ রয়েছে সিডিএ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে চউকের উপ-প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো: আবু ঈসা আনছারী "সকালের চট্টগ্রাম"কে বলেন, 'ভুল তথ্য দিয়ে কেউ যদি প্লট বা ফ্ল্যাট করার অনুমোদন নেয় তবে তা বাতিল করার এখতিয়ার রাখে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। আর চউকের কেউ যদি অপরাধীর সঙ্গে যোগসাজশ করে তার বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে কর্তৃপক্ষ।
দখলে সহযোগী পিডিবি
খাস জমিতে পাহাড় কাটা ও খাস জমি দখলের অন্যতম সহযোগী পিডিবি। এখানে বিদ্যুতের ১১কেভির সঞ্চালন লাইন থেকে ট্রান্সফরমারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়েছেন। খাস জমি দখল পাকাপোক্ত করতে বড় মসজিদ বানিয়ে প্রথমে ওই মসজিদে বিদ্যুতের সংযোগ দেওয়া হয়েছে। মিটারে সংযোগ নিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে প্রতি ইউনিট ২০ টাকা করে নেওয়া হয়।
পিডিবির চট্টগ্রাম দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী রেজাউল করিম জানান, ২০১৬-২০১৭ সালে কোনো দালিলিক ভিত্তি ছাড়াই বিদ্যুতের লাইনগুলো নির্মাণ ও সংযোগ দেওয়া হয়েছিল। বিদ্যুৎ সম্প্রসারণ প্রজেক্টের মাধ্যমে বিভিন্ন লোকজনের সুপারিশের প্রেক্ষিতে লাইনগুলো নির্মাণ করা হয়েছিল। এরইমধ্যে ভূমিমন্ত্রীর নির্দেশনায় আলী নগরের বিদ্যুতের লাইন তুলে নিয়ে আসা হয়েছে। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে।
প্রধান প্রকৌশলী বলেন, জঙ্গল সলিমপুরে এখনো প্রায় দুই কিলোমিটার ১১কেভি সঞ্চালন লাইন ও ৪৪০ ভোল্টের সরবরাহ লাইন রয়েছে। এতে ১০-১২টি বড় ট্রান্সফরমার রয়েছে।
তিনি বলেন পর্যায়ক্রমে সকল পাহাড়ের সব অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে।
পাহাড় রক্ষায় পরিবেশ অধিদপ্তরের তৎপরতা কম
অনেক সময় পাহাড় কাটার তথ্য দিয়ে ফোন করলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বললেও ঘটনাস্থলে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা যান না । ২০২০ সালে মতি ঝর্ণা এলাকায় পাহাড় কেটে ঘর নির্মাণ করে। যাতে মাসিক ঘর ভাড়া পায় দেড় লাখ টাকা। পরিবেশ অধিদপ্তর সেখানে জরিমানা করেছেন মাত্র চার হাজার টাকা। চট্টগ্রামের পাহাড় কাটায় পরিবেশ কর্মকর্তাদের যোগসাজস প্রসংগে জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের (মহানগর) হিল্লোল বিশ্বাস “সকালের চট্টগ্রাম”কে বলেন,আমি এইসব বিষয়ে অবগত না। কোথাও পাহাড় কাটার সংবাদ পাওয়ার পর আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছি।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ এফ ইয়াছমিন “সকালের চট্টগ্রাম”কে বলেন, চট্টগ্রামের পাহাড় গুলো রক্ষা করা চট্টগ্রামের স্বার্থে প্রয়োজন। এই পাহাড়গুলোকে অবৈধ দখলদার থেকে উদ্ধার করে বনায়ন করা উচিত। এফ ইয়াছমিন আরো বলেন, আগস্ট বাংলাদেশের জন্য একটি শোকাবহ মাস । এ মাসেই চট্টগ্রামের সমস্ত পাহাড়গুলোকে “বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হেরিটেজ” ঘোষণা চট্টগ্রামের গণ মানুষের দাবি। সরকারের উচিত শোকাবহ আগস্ট মাসে চট্টগ্রাম পাহাড়গুলোকে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হেরিটেজ ঘোষণা করা।
চট্টগ্রামের সিনিয়র আইনজীবি জাহাংগির আলম "সকালের চট্টগ্রাম”কে বলেন, পাহাড় কাটা বন্ধে যাদের কাজ করার কথা, তারা যদি কাজ না করেন তাহলে আমরা কথা বলে কোনো লাভ হবে না। অনেক বছর ধরেই পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটছে। পাহাড় কাটা বন্ধ ও রক্ষার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু কিছুই তো হচ্ছে না। সরকারের যেসব বিভাগের দায়িত্ব তারা তো নীরব। ‘২০০৭ সালে পাহাড় ধসে ব্যাপক প্রাণহানির পর শক্তিশালী পাহাড় রক্ষা কমিটির প্রদত্ত সুপারিশ বাস্তবায়নে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। পাহাড় রক্ষায় পরিবেশবাদী সংগঠন ‘বেলা’র পক্ষ থেকে হাইকোর্টে দায়েরকৃত মামলায় ২০১২ সালের ১৯ মার্চ সুনির্দিষ্ট রায় হয়েছে। ওই রায়ে পাহাড় কর্তনকারীদের বিরুদ্ধে পরিবেশ আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি পাহাড়ে নির্মিত স্থাপনাগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন হাইকোর্টের সেই আদেশ বাস্তবায়ন করছে না।’
তিনি বলেন পাহাড় দখল এবং কাটা বন্ধে সরকারকে কঠোর হতে হবে। পরিবেশ আইন সংশোধন করে পাহাড় কাটা অবস্থায় আটক হলে সর্বনিম্ন ১০ লাখ টাকা জরিমানা এবং জামিন অযোগ্য মামলা দায়ের এবং মামলার সাজা হবে যাবজ্জীবন। তাহলে পাহাড়কাটা এবং দখল বন্ধ হবে।
অনলাইন এডিটরস ক্লাবের আহবায়ক মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী "সকালের চট্টগ্রাম”কে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ ছাড়া চট্টগ্রামের পাহাড় রক্ষা করা সম্ভব নয় ।গ্যাস পানির বিদ্যুত সংযোগ যতদিন থাকবে উচ্ছেদ সফল হবে না।প্রকৃতি-পরিবেশ এবং মানুষের জীবন রক্ষায় অনতিবিলম্বে নগরের পাহাড় থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হবে। সেখানে সরকারি খাস জমি দখল করে বিক্রির যে বেআইনী কার্যক্রম চলছে তা থামাতে হবে। পাহাড় দখলকারীদের সবাইকে আইনের আওতায় আনতে হবে।
তিনি আরো বলেন,পাহাড় রক্ষায় ২০১৭ সালে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠিত হয়েছিল। সেই কমিটি তাদের প্রতিবেদনে পাহাড় ধসের ২৮টি কারণ চিহ্নিত করে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধে ৩৬টি সুপারিশ করেছিল। সুপারিশগুলোর মধ্যে দু-একটি নামেমাত্র বাস্তবায়ন হলেও বেশিরভাগই রয়ে গেছে কাগজে-কলমে। কমিটি পাহাড় ধসের যে ২৮টি কারণ উল্লেখ করেছিল তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল-ভারি বর্ষণ, পাহাড়ে বালির আধিক্য, পাহাড়ের উপরিভাগে গাছ না থাকা, গাছ কেটে ভারসাম্য নষ্ট করা, পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস গড়ে তোলা, পাহাড় থেকে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না রাখা, বনায়নের পদক্ষেপের অভাব, বর্ষণে পাহাড় থেকে নেমে আসা বালি ও মাটি অপসারণে দুর্বলতা।
এই কমিটির সুপারিশগুলোর মধ্যে ছিল-পাহাড়ের ৫ কিলোমিটারের মধ্যে হাউজিং প্রকল্প না করা, জরুরি বনায়ন, গাইডওয়াল নির্মাণ, নিষ্কাশন ড্রেন ও মজবুত সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা, পাহাড়ের পানি ও বালি অপসারণের ব্যবস্থা করা, যত্রতত্র পাহাড়ি বালি উত্তোলন নিষিদ্ধ করা, পাহাড়ি এলাকার ১০ কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা নিষিদ্ধ করা, মতিঝর্ণা ও বাটালি হিলের পাদদেশে অবৈধ বস্তি উচ্ছেদ করে পর্যটন স্পট করা, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসতি স্থাপন নিষিদ্ধ করা, পাহাড় কাটায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, মহানগরীকে পাহাড়ি এলাকা হাটহাজারীর দিকে সম্প্রসারণ না করে কর্ণফুলীর দক্ষিণ পাড়ে পটিয়া ও আনোয়ারার দিকে সম্প্রসারণ।
আইটি বিশেষজ্ঞ এ ইউ চৌধুরী নাহিদ "সকালের চট্টগ্রাম”কে বলেন,আলিনগর এবং জঙ্গল সলিমপুর মতো সকল পাহাড় ধেকে অবৈধ দখলদার এবং বসতি স্থাপনকারীদের উচ্ছেদ করে পাহাড়গুলোতে ঔষধি,ফলজ এবং বনজ বৃক্ষরোপণ করে পাহাড়কে পুর্বাবস্থায় ফেরত নেওয়া সম্ভব ।
আলিনগর এবং জঙ্গল সলিমপুরে জেলখানা, হাসপাতাল সহ বিভিন্ন স্থাপনা করলে মানুষের বসতি বেড়ে যাবে এবং প্রভাবশালীরা আশেপাশের পাহাড় অবৈধ দখল শুরু হবে।
আলিনগর এবং জঙ্গল সলিমপুরে যেসব সমতল ভূমি রয়েছে ওই এলাকায় একটি আন্তর্জাতিক মানের আইটি পার্ক করে বাকি জায়গায় গুলোতে বনায়ন করা উচিত।