একটি ঘটনা দিয়ে বিষয়ের আলোচনায় যেতে চাই। পেশায় উকিল আমার এক ঘনিষ্ট জনের নেশা-পেশা ছিল খতিয়ানের অংশীজনের জমি কিংবা একই জমি সস্তাদামে পুনর্বার বিক্রয় করা। প্রচলিত আইনে এ কাজ করাও তার পক্ষে খুব সহজ ছিল। তিনি বোনকে বঞ্চিত করে বাবাকে বাধ্য করে সমুদয় সম্পত্তি বিভিন্ন ব্যক্তি ও একটি বৃহৎ শিল্প গোষ্ঠীর নিকট বিক্রয় করেন। এ উকিল বাবার মৃত্যুর পর ওয়ারিশ সনদ দিয়ে পূর্বে বিক্রীত জমি পুনরায় সাবরেজিস্টার অফিসে পণশূন্য দলিলমূলে বিক্রয় করেন।
ক্রেতা উক্ত দলিলমূলে বি.এস নামজারী সৃজিত হলে প্রতিপক্ষগণ অবগত হয়ে সৃজিত নামজারী খতিয়ানের বিরুদ্ধে সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবার আপত্তি করলে উক্ত খতিয়ান বাতিল করা হয়। খতিয়ান বাতিল করা হলেও ক্রেতা টাকার বিনিময়ে স্থানীয় এক ভূমিদস্যু ও পুলিশের সহযোগিতায় ১২ শতক জমির পরিবর্তে ২০ শতক জমি দখলে নেয়। এ ভূমি নিয়ে ফৌজদারী কার্যবিধি অনুযায়ী আদালতে মামলা করা হয়। মামলা নালিশে ভূমিতে পক্ষদ্বয়ের শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য স্থিতিবস্থা বজায় রাখার আদেশ প্রদান করলে স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়ি ও থানার ওসির সহযোগিতায় রাতের বেলায় স্বদলবলে সশস্ত্র অবস্থায় জমিটি দখল করে দেয়াল নির্মাণ করেন। বাধা প্রদান করলে ভূমির মালিকের বিরুদ্ধে মিথ্যা চাঁদাবাজী মামলা করে ফিল্মি স্টাইলে ঘর নির্মাণ করেন ভূমিদস্যুরা। নিরীহ ভুক্তভোগীরা পণশূন্য দলিল অকার্যকর ও বাতিল চেয়ে সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে মামলা রুজু করেন। স্থানীয় পর্যায়ে জোরজুলুমের প্রভাব ও আইনের শাসন না থাকায় একখণ্ড ভূমি নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে চারটি মামলা সৃষ্টি হয়। মামলা একটি মহা অভিশাপ। এ অভিশাপে বেশির ভাগ নিরীহ মানুষ নিঃস্ব হয়। মামলার টেনশনে প্রেসার বেড়ে যায়, অনেকে হার্ট এ্যাটাক করে মারা যায়। এ দেশের প্রথা অনুযায়ী মামলা থেকে মামলা হয় বলে মসজিদে নামাজের পর ঋণগ্রস্ত, রোগ-ব্যাধি এবং মামলা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য দোয়া কামনা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে মিথ্যা মামলা দিয়ে পুলিশ ম্যানেজ করে প্রতিপক্ষকে হয়রানি করার জন্য গ্রেফতার করা হয় এবং পরবর্তীতে জামিন না পাওয়ার জন্য কোর্টে তদবির করা হয়। নারী নির্যাতন ও মিথ্যা চাঁদাবাজি মামলার একমাত্র উদ্দেশ্য দ্রুততম সময়ে প্রতিপক্ষকে হয়রানি/ হেনস্তা করা কিংবা অবৈধ স্বার্থ হাসিল করা। এসব মামলা করার আর্জি আদালতের আশেপাশে কম্পিউটার দোকানে এমএসওয়ার্ড করা থাকে। শুধু মাত্র এনআইডি আর কয়েকজন সাক্ষীর নাম দিলে কাল্পনিক ঘটনার বিবরণ দিয়ে মামলার আর্জি প্রস্তুত হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে এ কাজে জড়িত থাকে কোর্ট সংশ্লিষ্ট কতিপয় দালাল শ্রেণির লোকজন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক খন্দকার ফারজানা রহমান বলেছেন- এমন মামলা হচ্ছে মূলতঃ নানা জনের বুদ্ধিতে। তিনি বলছেন, 'মন্ত্রণাদাতা প্রথমত হচ্ছে পরিবারের মানুষজন। পরিবারের আত্মীয়-স্বজন। কিন্তু এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে কতিপয় উকিল। মানুষ যখন মামলা করে শুরুতেই কিন্তু একজন উকিলের কাছেই যায়। অনেক সময় উকিলের কথায়ও এমন মামলা হয়।' বিদ্যমান বিচার সংস্কৃতিতে মামলার খরচ মেটাতে নিঃস্ব হচ্ছেন
অধিকাংশ বিচারপ্রার্থীরা। জমানো সঞ্চয়, গবাদিপশু এমনকি ভিটি-মাটি, বিক্রি করেও মিলছেনা ন্যায়বিচার। কেটে যাচ্ছে বছরের পর বছর, বাড়ছে দারিদ্রতা। অপরদিকে বিচার প্রার্থী নিঃস্ব হলেও অর্থ-বিত্তে ফুলে-ফেঁপে উঠছে আদালত কেন্দ্রিক পেশাজীবীরা। বিশ্লেষকরা বলেন, মামলাজট না কমার অন্যতম কারণ হচ্ছে বিচার-সংশ্লিষ্টদের ইচ্ছাকৃত মামলা জিইয়ে রাখায় কমাতে অসহযোগিতা করেন ওই মহল। মামলার দীর্ঘসূত্রিতা এবং মামলাজটের কারণ শুধু বিচারক কিংবা সহায়ক কর্মচারী স্বল্পতাই নয়, দায়ী গোষ্ঠীগত স্বার্থ চিন্তা, নানা মাত্রিক স্বার্থ সংরক্ষণ, দুর্নীতি এবং দুর্বল বিচার ব্যবস্থাপনা। অনেক মামলার বিচার না হওয়ায় গোষ্ঠী স্বার্থেরই নির্দেশক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়; মামলায় বার্ষিক ক্ষতি ১১.৫১৯ কোটি টাকার মধ্যে ৫০ ভাগই অনৈতিক লেনদেনে। মামলা পরিচালনার খরচ মেটাতে ধার-দেনায়ও জর্জরিত হয়, বিক্রি করতে হয় জায়গা-জমিও। নিঃস্ব হচ্ছে মামলাকারী। ফুলে-ফেঁপে উঠছে অর্থ-বিত্তে আদালত কেন্দ্রিক পেশাজীবীরা। ভূমি মামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ১২ কোটি মানুষ, মামলাধীন জমির পরিমাণ ২৩.৫ লাখ একর। বেশির ভাগ মামলা ভূমি বিরোধ কেন্দ্রিক। জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির, চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত অপরাজিত ম্যাগাজিনে জনৈক কবির
'বাদী হয়ে হাদী' ছড়ায় বিচার প্রার্থীর করুন অবস্থা ফুটে উঠেছে।
আবদুল হাদি
মামলার বাদী,
সিল্কের শার্ট তার
হয়ে যায় খাদি।
জমি যায়, বাড়ি যায়,
হাঁড়ি যায়, গাড়ি যায়,
জাল যায়, মাছ যায়,
বাগানের ঘাস যায়,
গরু যায়, হাঁস যায়,
গোলা গোলা ধান যায়,
দিতে দিতে প্রাণ যায়-
উকিলের ফিস,
বাদী হয়ে হাদি আজ
ফিনিস ফিনিস।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি ও অর্থ নষ্ট এড়াতে হলে প্রথমে বিচারকাজ ত্বরান্বিত করতে হবে। দ্রুতগতিতে বিচার সম্পন্ন করতে পারলে বিচারপ্রার্থীরা
অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত কম হবে।
এক্ষেত্রে আইন বিচার বিভাগকে আরও উদ্যোগী ভূমিকা গ্রহণ
করতে হবে এবং মামলাজট নিরসনে নতুন পথ বের করতে
হবে। দীর্ঘদিন ধরে পুঞ্জীভূত এ সংকট থেকে সহসায় বেরিয়ে আসতে বিচারক ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের আন্তরিকতা এবং বিচার ব্যবস্থার উন্নয়ন, পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করা প্রয়োজন। মন্ত্রণালয়ের উচিত বিচারাঙ্গন থেকে দুর্নীতিবাজদের উৎখাত করে কীভাবে মামলাজট কমিয়ে বিচার ত্বরান্বিত করা যায় সেটার একটা কার্যকরী সমাধান খুঁজে বের করা। প্রচলিত আইন অনুযায়ী আদালত থেকে স্বপ্রণোদিত হয়ে মিথ্যা মামলাকারীকে শাস্তি দেওয়ার নজির খুবই কম। প্রসিকিউশনও মিথ্যামামলাকারীদের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে যথাযথ ভূমিকা রাখেন না। মিথ্যা মামলায় দীর্ঘদিন আদালতের বারান্দায় ভোগান্তি ও জীবনের মূল্যবান সময় নষ্ঠ মিথ্যা মামলা দায়েরকারীরা থাকেন ধরা ছোঁয়ার বাইরে। দণ্ডবিধির ২১১ ধারা অনুযায়ী মিথ্যা মামলায় নির্দোষ প্রমাণিত হলে মিথ্যা অভিযোগকারী বা মামলা দয়েরকারীর বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা করার বিধান থাকলেও অর্থ সময় ও হয়রানির কারণে অনেকে পাল্টা মামলা করে না তাই মামলা মিথ্যা বা ভিত্তিহীন প্রমাণিত হলে বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট মামলা দায়েরকারীকে ফৌজদারি কার্যবিধির ২৫০ ধারা অনুযায়ী স্বপ্রণোদিতভাবে দণ্ড দিতে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশ প্রদান করতে হবে। মিথ্যামামলা রুজুকারীদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করতে হবে যাতে
ভবিষ্যতে মিথ্যা মামলা রুজু না হয়। আইনজীবী কর্তৃক বিচার প্রার্থীরা ক্ষতিগ্রস্থ হলে টর্ট আইনে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সুযোগ প্রদান করার কার্যক্রম প্রচলন করতে হবে।
লেখক: সংগঠক