ভারত দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম একটি বৃহৎ শক্তিধর দেশ।দেশটি ১৯৪৭ সালে ইংরেজদের নিকট থেকে স্বাধীনতা লাভ করে।আয়তন দিক দিয়ে বিশ্বের সপ্তম এবং জনসংখ্যা দিক দিয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্র।২০২৫ সালের 'গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার ইনডেক্স’ অনুসারে সামরিক শক্তিতে ভারতের অবস্থান চতুর্থ।এশিয়ার প্রাচীনতম এ বিশাল দেশটিতে বিভিন্ন ধর্মের নানা গোষ্ঠীর,ভিন্ন ভিন্ন ভাষাভাষীর লোক বসবাস করে। দেশটি বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবেও পরিচিত।বিশাল আয়তন ও প্রায় ১৪০ কোটি জনসংখ্যার অধ্যুষিত দেশটি অর্থনৈতিক দিক দিয়েও ভালো অবস্থানে রয়েছে। তাদের তৈরি পণ্য বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে বিপনন ও বাজারজাত হয়ে থাকে।
     

 অপরদিকে ১৯৪৭ সালে ইংরেজদের নিকট থেকে স্বাধীনতা প্রাপ্তির মাধ্যমে দেশ ভাগের পর পাকিস্তান রাষ্ট্রটি সৃষ্টি হয়।এটিও দক্ষিণ এশিয়ায় অবস্থিত ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্র।আয়তনের দিক দিয়ে এটি বিশ্বে ৩৩তম এবং জনসংখ্যার দিক দিয়ে ৫ম বৃহত্তম দেশ।এটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হলেও নানা ধর্মের জাতি, গোষ্ঠী এখানে বসবাস করে থাকে। ২০২৫ সালের 'গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার ইনডেক্স’ অনুসারে সামরিক শক্তিতে বিশ্বে পাকিস্তানের অবস্থান ১২তম।দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থা তত মজবুত নয়।ইংরেজদের নিকট থেকে স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর থেকে কাশ্মীরকে নিয়ে উল্লিখিত দু'টো দেশের মধ্যে প্রতিনিয়তই বিবাদ, সংঘাত লেগেই থাকে।দেশ ভাগের পর কাশ্মীরের কিছু অংশ পাকিস্তানের দখলে চলে যায় যা 'আজাদ কাশ্মীর' নামে পরিচিত।অপরদিকে অন্য অংশটি 'জম্মু কাশ্মীর' নামে ভারতে অধীনেই রয়েছে। বিগত আটাত্তর বছরের মধ্যে কাশ্মীর সমস্যা বা দ্বন্দ্ব নিয়ে উক্ত দু'টো দেশ বেশ কয়েকবার পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়।প্রতিনিয়তই দেশ দু'টো একে অপরের বিরুদ্ধে লেগেই আছে। উল্লিখিত দুটো দেশই পারমানবিক শক্তিধর দেশ।তাদের নিকট রয়েছে প্রায় সম সংখ্যক আনবিক বোমা।সমরাস্ত্র ও সেনা সংখ্যার দিক দিয়ে ভারতের চেয়ে পাকিস্তান পিছিয়ে থাকলেও এক্ষেত্রে  কোনো দেশ পরস্পরকে কোনো প্রকার ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়।
       গত ২২শে এপ্রিল ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু কাশ্মীরের পেহেলগামে পর্যটকদের উপর এক অতর্কিত সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন পর্যটক নিহত হন।নিহতদের মধ্যে নারী,পুরুষ ও শিশু রয়েছে। ভারত দাবি করে যে,পেহেলগাম হামলায় জড়িত চারজন হামলাকারীর মধ্যে দুজন পাকিস্তানের নাগরিক।ঐ হামলার পরিপ্রেক্ষিতে পারমাণবিক অস্ত্রধারী দুই প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে।প্রতিবেশী দেশ দু'টি পরস্পরের সীমান্ত বন্ধ করার পাশাপাশি সিন্ধুর পানি চুক্তিসহ সকল প্রকার বাণিজ্য স্থগিত করে।উভয় দেশ আকাশসীমা বন্ধ করে নিজেদের কূটনৈতিকদের প্রত্যাহার করে নেয়। পেহেলগামে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার দুই সপ্তাহের মাথায় দেশ দুটো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।
      ০৭ মে প্রথম প্রহরে পাকিস্তান ও পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের নয়টি স্থানে ভারত বিমান হামলা চালায়।ভারতের দাবি তারা নয়টি জঙ্গি আস্তানায় আঘাত করেছে তবে কোনো সামরিক স্থাপনায় নয়।পাকিস্তানের পক্ষ থেকে ছয়টি স্থানে হামলা হওয়ার কথা স্বীকার করা হয়।ইসলামাবাদ জানায় ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কয়েকটি মসজিদ ও বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্তত ২৬ জন নিরীহ বেসামরিক ব্যক্তি নিহত ও ৪৬ জন আহত হয়েছেন।তারা দাবি করে যে, হামলাকারী তিনটি অত্যাধুনিক রাফায়েল যুদ্ধ  বিমানসহ পাঁচটি যুদ্ধ বিমান ও অনেক ড্রোন ধ্বংস করেছে।অপরদিকে ভারতীয় পুলিশ জানায় যে, তাদের নিয়ন্ত্রিত জম্মু কাশ্মীরে পাকিস্তানের গোলায় ১০ জন নিহত ও ৪৮ জন আহত হয়েছেন।পাকিস্তান দাবি করে ভারত ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের ভূখন্ডে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করে হামলা করেছে যা আন্তর্জাতিক রীতিনীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী।পাকিস্তান পেহেলগাম হামলার আন্তর্জাতিক তদন্ত দাবি করে।
     কয়েকদিনের ভারত-পাকিস্তান সংঘাত ও যুদ্ধ নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে চরম উৎকন্ঠার মধ্যে দিনাতিপাত করতে দেখা যায়।পাকিস্তানের দাবির ন্যায় অনেকেই মনে করেন যে,ভারতের বিজেপি সরকারের জনপ্রিয়তা হ্রাসের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার জনগণের আস্থা অর্জনের লক্ষে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে নিজেরাই জম্মু-কাশ্মীরের পেহেলগাম হত্যাকান্ড ঘটিয়ে তার দায়ভার পাকিস্তানের উপর চাপিয়ে প্রতিশোধ গ্রহণের অজুহাত সৃষ্টি করেছে।কিন্তু অবস্থা দৃষ্টে মনে হয় বিযয়টি ভারতের জন্য হিতের বিপরীত হয়েছে। এ পর্যন্ত ভারত প্রচুর ক্ষয় ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া ছাড়াও হারাতে হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা মূল্যের অত্যাধুনিক রাফায়েল যুদ্ধ বিমানসহ অনেক সমরাস্ত্র ও জানমাল।অবশেষে আমেরিকার  হস্তক্ষেপে বিবাদমান দেশ দু'টি  যুদ্ধ বিরতিতে যেতে বাধ্য হয়।এতে দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের মনে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে। ভারত একতরফাভাবে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে হামলা চালানোর স্বপক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় করতে পারেনি। তাছাড়া তাদের গৃহীত পদক্ষেপের যৌক্তিকতা আম্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য হয়নি।এতে প্রমানিত হয় মিথ্যা ক্ষণস্থায়ী,সত্য চির স্থায়ী। অন্যায়,ছলচাতুরী ও জোর জবরদস্তি কখনো ভালো ফল বয়ে আনে না। মনে রাখা প্রয়োজন যে, ইট মারলে পাটকেল খেতে হয়। 
(লেখক একজন প্রাবন্ধিক)