চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে তোলা একটি ছবি সম্প্রতি অনেকের নজর কেড়েছে। জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির মতো গুরুত্বপূর্ণ সভায় যখন মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা একসঙ্গে বসেন, তখন কার আসন কোথায় হবে বা কার পাশে কে বসবেন সেটা কোনো ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় নয়। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের নির্ধারিত একটি স্পষ্ট নিয়ম রয়েছে, যাকে বলা হয় ‘ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স’ বা রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদাক্রম।
ছবিটি একটু মনোযোগ দিয়ে দেখলে বোঝা যায়, সভার মাঝখানে প্রতিমন্ত্রী বসেছেন যা প্রোটোকল অনুযায়ী স্বাভাবিক। কিন্তু তাঁর ঠিক পাশেই দেখা যাচ্ছে জেলা প্রশাসক (ডিসি)কে। অন্যদিকে সংসদ সদস্যদের বসানো হয়েছে টেবিলের একেবারে কোণার দিকে। এখানেই প্রশ্ন উঠছে রাষ্ট্রীয় নিয়ম অনুযায়ী কি আসন বিন্যাস এমন হওয়ার কথা?
বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদার একটি নির্দিষ্ট তালিকা রয়েছে। মন্ত্রীপরিষদ কর্তৃক জুলাই, ২০২০ পর্যন্ত সংশোধিত(যা এখনো কার্যকর) ওয়ারেন্ট অফ প্রিসিডেন্স অনুসারে প্রতি মন্ত্রীর অবস্থান ০৮ নম্বর ক্রমিকে,সংসদ সদস্য- ১৩,সচিব,মেজর জেনারেল,আইজি-১৫,বিভাগীয় কমিশনার-২১,ডিআইজি-২২,ডিসি-২৪, এসপি,মেজর ও উপজেলা চেয়ারম্যান-২৫ নম্বর ক্রমিকে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদার নিয়ম অনুযায়ী একজন সংসদ সদস্যের অবস্থান জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, এমনকি ডিআইজি বা বিভাগীয় কমিশনারের চেয়েও উঁচুতে। এই পদমর্যাদাক্রম শুধু আনুষ্ঠানিক মর্যাদা নির্ধারণের জন্য নয়; বরং রাষ্ট্রীয় সভা-সমাবেশে প্রোটোকল, আসন বিন্যাস এবং আনুষ্ঠানিকতা নির্ধারণের ক্ষেত্রেও এটি অনুসরণ করার কথা।
সাধারণ নিয়ম হলো সভায় প্রধান অতিথির ঠিক পাশেই বসবেন উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে যিনি পদমর্যাদায় দ্বিতীয় অবস্থানে আছেন। এই ক্ষেত্রে প্রতিমন্ত্রীর পরেই পদমর্যাদায় সবচেয়ে সিনিয়র হলেন সংসদ সদস্য। ফলে নিয়ম অনুযায়ী তাঁদেরই বসার কথা ছিল প্রতিমন্ত্রীর ঠিক পাশে। কিন্তু আলোচিত ছবিতে দেখা যাচ্ছে, জনপ্রতিনিধিদের রাখা হয়েছে এক কোণায় এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বসানো হয়েছে মাঝখানে।
এমন দৃশ্য অনেক সময় সাধারণ মানুষের মনে বিভ্রান্তি তৈরি করে। অনেকেই মনে করেন, জেলা পর্যায়ে ডিসি বা এসপি-ই যেন প্রোটোকলে সবার উপরে। বাস্তবে তাঁরা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করলেও রাষ্ট্রীয় মর্যাদার দিক থেকে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি অর্থাৎ সংসদ সদস্য তাঁদের চেয়ে উঁচু অবস্থানে থাকেন। এমনকি কোনো সভায় বিভাগীয় কমিশনার উপস্থিত থাকলেও প্রোটোকল অনুযায়ী তাঁর অবস্থানও এমপির নিচেই।
সম্ভবত জেলা প্রশাসন এই সভার আয়োজক হওয়ায় কর্মকর্তারা নিজেদের মধ্যে কাছাকাছি বসেছেন। কিন্তু এ ধরনের আসন বিন্যাস অনেক সময় অনিচ্ছাকৃতভাবেই ভুল বার্তা দেয়। এতে সাধারণ মানুষের মনে ধারণা জন্মায় যে প্রশাসনিক কর্মকর্তারাই যেন প্রোটোকলের শীর্ষে অবস্থান করছেন।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় বাস্তবতা কিন্তু ভিন্ন। এখানে জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মর্যাদা ও সম্মানই সর্বাগ্রে বিবেচিত হওয়া উচিত। তাই রাষ্ট্রীয় প্রোটোকল বা পদমর্যাদাক্রম মেনে সভা-সমাবেশের আয়োজন করা শুধু আনুষ্ঠানিকতার বিষয় নয় এটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।