রমজান মাস আত্মশুদ্ধি, সংযম ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক মহিমান্বিত সময়। এই মাসের প্রতিটি দিন ও রাত মুমিনের জন্য ইবাদত ও আত্মসমালোচনার এক সুবর্ণ সুযোগ। বিশেষ করে শেষ দশ দিন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এই সময়েই রয়েছে লাইলাতুল কদর যে রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। আর এই শেষ দশকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো ইতিকাফ।
ইতিকাফ এমন একটি ইবাদত, যেখানে একজন মুসলমান দুনিয়ার সকল ব্যস্ততা থেকে নিজেকে আলাদা করে মসজিদে অবস্থান করে একান্তভাবে আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকেন। এটি শুধুমাত্র একটি রুটিন পালন নয়; বরং এটি আত্মার গভীর পরিশুদ্ধি, গুনাহ থেকে ফিরে আসা এবং সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করার এক অসাধারণ মাধ্যম। রাসুল (সা.) নিজে নিয়মিত এতেকাফ পালন করতেন এবং তাঁর সাহাবীরাও এই সুন্নতকে গুরুত্বসহকারে অনুসরণ করতেন।
কিন্তু বর্তমান সমাজে এই পবিত্র ইবাদতকে ঘিরে যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা গভীরভাবে উদ্বেগজনক। এখন অনেক জায়গায় এতেকাফ যেন এক ধরনের “সুবিধাভিত্তিক ব্যবস্থা” হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গ্রাম পর্যায়ে বা ছোটখাটো জুম্মা মসজিদ যেগুলোতে দেখা যাচ্ছে মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে টাকা দিয়ে বিভিন্ন লোককে এতেকাফ নেওয়া হচ্ছে, আবার বড় বড় মসজিদগুলোতে দেখা যাচ্ছে ভিন্নতা অর্থের বিনিময়ে নির্দিষ্ট জায়গা, উন্নত খাবার, আরামদায়ক পরিবেশএসবের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, এমন লোকজনও ইতিকাফ বসছেন, যাদের ইসলামের মৌলিক জ্ঞান পর্যন্ত নেই; কিন্তু অর্থের প্রলোভন বা সামাজিক মর্যাদা অর্জনের আকাঙ্ক্ষায় তারা এই ইবাদতে অংশ নিচ্ছেন।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে এতেকাফের উদ্দেশ্য কি? এটি কি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা, নাকি এটি একটি গভীর আত্মিক সাধনা? যদি কেউ ইসলামের মৌলিক জ্ঞান না রেখেই, কেবল টাকা বা সামাজিক প্রভাবের কারণে ইতিকাফ বসেন, তাহলে সেই ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য কতটুকু পূরণ হবে? ইবাদত তখন আর আত্মিক উন্নতির মাধ্যম থাকে না; বরং তা এক ধরনের প্রদর্শনীতে পরিণত হয়।
ইসলামে প্রতিটি আমলের মূল ভিত্তি হলো নিয়ত। যদি নিয়ত সঠিক না হয়, তাহলে বাহ্যিকভাবে যতই ইবাদত করা হোক না কেন, তা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। এতেকাফও এর ব্যতিক্রম নয়। এখানে মূল বিষয় হলো আন্তরিকতা, বিনয় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু যখন অর্থ ও সামাজিক মর্যাদা এখানে প্রাধান্য পায়, তখন সেই ইবাদতের পবিত্রতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, ইসলামের জ্ঞান ছাড়া ইবাদত করা অনেক সময় সঠিকভাবে ইবাদত পালনে বাধা সৃষ্টি করে। এতেকাফের কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন রয়েছে কী করা যাবে, কী করা যাবে না, কোন কাজগুলো ইবাদতকে নষ্ট করে এসব বিষয় জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যারা এই মৌলিক জ্ঞান ছাড়াই এতেকাফে বসেন, তারা অনেক সময় অজান্তেই এমন কাজ করে বসেন, যা এতেকাফের উদ্দেশ্যকেই ব্যাহত করে।
এছাড়া, টাকার বিনিময়ে ইতিকাফের সুযোগ সৃষ্টি করা এক ধরনের বৈষম্যও তৈরি করে। যারা অর্থ দিতে সক্ষম, তারা উন্নত সুযোগ-সুবিধা পায়; আর যারা গরিব, তারা হয়তো এই ইবাদত পালনের সুযোগই পায় না বা সীমিত পরিবেশে থাকতে বাধ্য হয়। অথচ ইসলাম সমতার ধর্ম এখানে ইবাদতের ক্ষেত্রে ধনী-গরিবের কোনো ভেদাভেদ নেই।
অবশ্যই মসজিদ পরিচালনার জন্য কিছু খরচ থাকে, এবং সেই খরচ মেটাতে স্বেচ্ছা অনুদান গ্রহণ করা যেতে পারে। কিন্তু সেটিকে যদি বাধ্যতামূলক করা হয় বা বিশেষ সুবিধার বিনিময়ে অর্থ নেওয়া হয়, তাহলে সেটি ইবাদতের মূল চেতনাকে ক্ষুণ্ন করে। ইতিকাফ কখনোই বিলাসবহুল অভিজ্ঞতা হওয়ার কথা নয়; বরং এটি ত্যাগ, সংযম এবং আত্মনিবেদনের প্রতীক।
সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের এ বিষয়ে সচেতন হওয়া জরুরি। মসজিদ কমিটি, আলেম-উলামা এবং সচেতন মুসলমানদের উচিত এতেকাফকে সহজ, সরল এবং সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা। একই সঙ্গে মানুষকে ইসলামের মৌলিক জ্ঞান অর্জনে উৎসাহিত করতে হবে, যাতে তারা সঠিকভাবে ইবাদত পালন করতে পারে।
ব্যক্তিগতভাবেও আমাদের আত্মসমালোচনা করা প্রয়োজন। আমরা কেন এতেকাফ করছি? আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, নাকি মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য? যদি আমাদের উদ্দেশ্য সঠিক না হয়, তাহলে সেই ইবাদত থেকে আমরা প্রকৃত উপকার লাভ করতে পারব না।
বর্তমান ভোগবাদী সমাজে যেখানে প্রতিটি বিষয়েই প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে, সেখানে এতেকাফের মতো একটি ইবাদত আমাদের জন্য হতে পারে এক অনন্য সুযোগ—নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার, নিজের ভুলগুলো শোধরানোর এবং আল্লাহর কাছে ফিরে আসার।
সবশেষে বলা যায়, ইতিকাফের প্রকৃত সৌন্দর্য তার সরলতা, আন্তরিকতা এবং আত্মিক গভীরতায় নিহিত। এটিকে যদি আমরা অর্থ, প্রলোভন বা অজ্ঞতার মাধ্যমে কলুষিত করি, তাহলে আমরা নিজেরাই এর মহিমা নষ্ট করছি। তাই আসুন, আমরা সবাই মিলে ইতিকাফকে তার প্রকৃত চেতনায় ফিরিয়ে আনি যেখানে থাকবে না কোনো বাণিজ্যিকতা বা প্রদর্শন, থাকবে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক নিখাদ প্রয়াস।
লেখক: সংবাদকর্মী, কলামিষ্ট ও সমাজকর্মী।