বনানী ১১ নম্বরে আমার সম্পাদিত ‘বাংলাদেশ ডিফেন্স জার্নাল’–এর অফিসে বসে আছি। সময় বিকাল প্রায় চারটা। হঠাৎ দেখা করতে এলেন সেনাবাহিনীর একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেল,আমার পূর্বপরিচিত, কয়েক কোর্স জুনিয়র। তখন তিনি ডিজিএফআইয়ের এফএসআইবি ব্যুরোতে কর্মরত। ব্যুরোটির পরিচালক ছিলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শেখ মামুন খালেদ। সে সময় দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব ছিল এই ব্যুরোর ওপরই।
বিএনপি সরকারের আমলে এই ব্যুরোর অধীনে একটি স্পেশাল অপারেশন্স উইং গঠন করা হয়েছিল। তাদের কাজ ছিল দেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা। তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের বিস্তারিত তথ্য, প্রশাসন ও পুলিশের কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক অবস্থান, দুর্নীতির অভিযোগ কিংবা বিদেশি সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা,সবকিছুর পূর্ণাঙ্গ তথ্যভান্ডার তাদের হাতে ছিল।
ওয়ান-ইলেভেনের পর এই তথ্যভান্ডার ব্যবহার করেই শুরু হয় বিএনপির সক্রিয় নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযান। প্রশাসনের যাঁদের ওপর বিএনপির সামান্য ছাপও ছিল, তাঁদের সাইডলাইন করা হয়। পুলিশের ওপরও নেমে আসে কঠোর ব্যবস্থা। আশ্চর্যের বিষয়, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এমনকি ২৮ অক্টোবরের লগি-বৈঠার সহিংস ঘটনাও কার্যত চাপা পড়ে যায়।
গোয়েন্দা সংস্থার আরেক প্রভাবশালী ব্যুরো
ডিজিএফআইয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যুরো ছিল সিটিআইবি। নাইন-ইলেভেনের পর জঙ্গি তৎপরতা মোকাবিলার জন্য বিএনপি সরকার এই ব্যুরো গঠন করে। কিন্তু বাস্তবে বড় বড় সন্ত্রাসী হামলা,যেমন জেএমবির দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলা, ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলা কিংবা শেখ হাসিনার ওপর হামলা কোনোটিই তারা ঠেকাতে পারেনি।
এই ব্যুরোর পরিচালক ছিলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ টি এম আমিন, যিনি সেনাবাহিনীতে ‘বিহারি আমিন’ নামে পরিচিত ছিলেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক সুপারিশে তিনি ওই পদে নিয়োগ পান। ওয়ান-ইলেভেনের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতাদের ধরে এনে জেরা করা, অর্থ আদায় করা এসব অভিযোগও তখন শোনা যেতে থাকে।
হাওয়া ভবনে হঠাৎ অভিযান...

এক পর্যায়ে ডিজিএফআইয়ের কর্মকর্তাদের মনে হয়, বিএনপি সম্পর্কে তাঁদের কাছে থাকা তথ্য যথেষ্ট নয়। ফলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় হাওয়া ভবনে হানা দেওয়ার। আকস্মিক অভিযানে সেখানকার নথিপত্র, কম্পিউটারসহ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জব্দ করা হয়। এতে বিএনপির সংগঠন কাঠামো থেকে শুরু করে রাজনৈতিক কৌশল সবই গোয়েন্দাদের হাতে চলে আসে।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগকে গোপনে জানিয়ে দেওয়া হয় যে তাদের অফিসেও অভিযান হবে। ফলে তারা আগেই সব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরিয়ে নেয়। পরে আওয়ামী লীগের অফিসে অভিযান চালানো হলেও তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
গোপন জরিপ ও বিস্ময়কর তথ্য
আমার অফিসে আসা সেই লেফটেন্যান্ট কর্নেল আমাকে একটি ‘অতিগোপনীয়’ ফাইলের ফটোকপি দিলেন। এতে ছিল ডিজিএফআইয়ের করা ৩০০ আসনের নির্বাচনী জরিপের ফলাফল। আসনভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায় বিএনপি প্রায় ১৫৫ থেকে ১৬০টি আসনে এগিয়ে।
আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতেই তিনি বললেন“স্যার, মাঠের বাস্তবতা এটিই। কিন্তু আমাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বিএনপিকে ৩০টির বেশি আসন দেওয়া যাবে না।”
আমি বিস্মিত হয়ে জানতে চাই, এত কম আসন কীভাবে সম্ভব? তিনি জানালেন, নির্বাচনী প্রকৌশল ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদের কঠোর নির্দেশ রয়েছে বিএনপিকে ক্ষমতায় আসতে দেওয়া যাবে না। এর পেছনে একটি প্রতিবেশী দেশের প্রভাবও আছে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।
এনএসআইয়ের জরিপেও একই ফল
আমি বিষয়টি আমার বন্ধু অবসরপ্রাপ্ত মেজর খলিল বিন ওয়াহিদকে জানাই। আমরা সিদ্ধান্ত নিই এনএসআইয়ের এক সিনিয়র কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করার। সেগুনবাগিচায় এনএসআই অফিসে গিয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করি।
তিনি ডিজিএফআইয়ের জরিপটি দেখে নিজস্ব লকার থেকে তাঁদের জরিপ বের করেন। বিস্ময়ের সঙ্গে দেখি এনএসআইয়ের জরিপেও বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতারই ইঙ্গিত।
তিনিও নিশ্চিত করেন সেনাপ্রধানের নির্দেশ রয়েছে বিএনপিকে ৩০টির বেশি আসন না দেওয়ার। নির্বাচনী ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দায়িত্বে রয়েছেন ডিজিএফআইয়ের কিছু কর্মকর্তা।

বেগম জিয়ার কাছে বার্তা পৌঁছানো..

আমরা দ্রুত গুলশানে বেগম খালেদা জিয়ার অফিসে যাই। সেখানে প্রচণ্ড ভিড় থাকায় সরাসরি দেখা সম্ভব হয়নি। পরে তাঁর নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল ফজলে এলাহী আকবরের হাতে জরিপের নথি তুলে দিই এবং সব তথ্য জানাই।
তিনি প্রথমে বিষয়টি বিশ্বাস করতে পারেননি। পরে সুযোগ পেয়ে বেগম জিয়াকে পুরো বিষয়টি জানান। তবে তিনিও বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করেছিলেন এত বড় ব্যবধান কীভাবে তৈরি করা সম্ভব?

অতিরিক্ত ব্যালট পেপারের অভিযোগ...
পরবর্তী কয়েক দিনে আমরা নির্বাচনী ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিস্তারিত জানার চেষ্টা করি। নিশ্চিত তথ্য না পেলেও একটি বিষয় বারবার সামনে আসে অতিরিক্ত ব্যালট পেপার ছাপানো হচ্ছে। অভিযোগ ছিল, ডিজিএফআইয়ের তত্ত্বাবধানে সেগুলো নির্দিষ্ট আসনে পাঠানো হচ্ছিল এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সহায়তায় তা বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছিল।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা ও কিছু কর্মকর্তার একটি অংশ জড়িয়ে পড়ে বলে অভিযোগ ওঠে।
একটি রাজনৈতিক অধ্যায়ের বিতর্কিত অধ্যায়
পরে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সমঝোতার আড়ালে নানা ধরনের কৌশল ও প্রতারণার ঘটনাও ঘটেছিল। অনেকেই মনে করেন, সেই সময়ের কিছু সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড বাংলাদেশকে দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেয়।
অনেকে পুরস্কার হিসেবে পেয়েছিলেন পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। অন্যদিকে আঞ্চলিক রাজনীতিতেও তৈরি হয়েছিল নতুন বাস্তবতা।
ওয়ান-ইলেভেনের সেই সময়কাল আজও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিতর্কিত ও রহস্যঘেরা অধ্যায়,যেখানে ক্ষমতা, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং নির্বাচনী প্রকৌশলের অভিযোগ মিলেমিশে তৈরি করেছে এক জটিল প্যারাডক্স।

লেখক : সাবেক সেনা কর্মকর্তা, সাংবাদিক, ডিফেন্স জার্নাল-এর সম্পাদক