1. চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) মূল্যবান আবাসিক প্লট বরাদ্দকে ঘিরে চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। ক্ষমতার অপব্যবহার, নীতিমালা লঙ্ঘন এবং ‘বেনামি লেনদেন’ এর মাধ্যমে সরকারি সম্পদ আত্মসাতের এই ঘটনায় জড়িয়েছে প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও সাবেক জনপ্রতিনিধি।
  2. অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, চউকের সাবেক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও বর্তমান চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন এবং আওয়ামী লীগ নেতা চউকের সাবেক বোর্ড সদস্য ও হাটহাজারী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ইউনুস গণি চৌধুরী যোগসাজশে এই প্লট জালিয়াতি সম্পন্ন করেছেন।
  3.  ‘বিশেষ বিবেচনা’ নীতিমালার আড়ালে লুটপাট
  4. ২০০৮ সালে অনুমোদিত অনন্যা আবাসিক প্রকল্পের মূল নীতিমালায় ‘বিশেষ বিবেচনা’ নামে কোনো কোটা ছিল না। তবে ২০১৩ সালের ২১ অক্টোবর চউকের ৪০৫তম বোর্ড সভায় হঠাৎ এই ক্যাটাগরি যুক্ত করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের প্লট পাইয়ে দিতেই এই ব্যবস্থা চালু করা হয়।
  5. এই তালিকার ৫২ নম্বরে অন্তর্ভুক্ত করা হয় তৎকালীন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আশরাফুল আমিনকে। নিয়ম অনুযায়ী প্লট বরাদ্দের আগে অন্তত চারটি জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ বাধ্যতামূলক হলেও, তা গোপন রাখা হয় যা সাধারণ নাগরিকদের সমান সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেছে।
  6.  বেনামি লেনদেনের ছক: ‘ঢাল’ হিসেবে ম্যাজিস্ট্রেট
  7. আইনজ্ঞদের মতে, এটি একটি সুপরিকল্পিত ‘বেনামি লেনদেন’। চউকের বোর্ড সদস্য হিসেবে সরাসরি প্লট নেওয়া সম্ভব না হওয়ায় ইউনুস গণি চৌধুরী, আশরাফুল আমিনকে ব্যবহার করেন ‘ঢাল’ হিসেবে।
  8. নথিপত্রে যা পাওয়া গেছে:
  9. ২১ নভেম্বর ২০১৩: ৩.৮০ কাঠার ডি-৩১৪এ নম্বর প্লট আশরাফুল আমিনের নামে বরাদ্দ (মূল্য ২২.৮০ লাখ টাকা)
  10. ১১ এপ্রিল ২০১৬: লিজ এগ্রিমেন্ট সম্পন্ন
  11. ১১ আগস্ট ২০১৬: মাত্র ৪ মাসের মাথায় প্লটটি ইউনুস গণির স্ত্রী জাকিয়া বেগমের নামে রেজিস্ট্রি
  12. বাজারদরের তুলনায় অনেক কম দামে (৩৪.২০ লাখ টাকা) প্লট হস্তান্তর হওয়ায় এটি পূর্বপরিকল্পিত লেনদেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয় সূত্র বলছে, ওই এলাকায় প্রতি কাঠার মূল্য বর্তমানে ৬০-৭০ লাখ টাকা।
  13.  নীতিমালা ভঙ্গ ও বাণিজ্যিক ব্যবহার
  14. লিজ নেওয়ার সময় হলফনামায় আশরাফুল আমিন উল্লেখ করেছিলেন, চট্টগ্রামে তার বা পরিবারের নামে কোনো প্লট নেই এবং এটি আবাসিক কাজে ব্যবহার করবেন। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই প্লট হস্তান্তর করে তিনি শর্ত ভঙ্গ করেন।
  15. আরও চাঞ্চল্যকর বিষয়, আবাসিক প্লটটি পরবর্তীতে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা হয়। ২০২৩ সালের ৫ এপ্রিল জাকিয়া বেগম প্লটটি ইসলামী ব্যাংকের কাছে বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়ার জন্য চউক থেকে ছাড়পত্র নেন।
  16.  বিরোধপূর্ণ বক্তব্যে নতুন প্রশ্ন
  17. অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আশরাফুল আমিন দাবি করেন, অর্থের অভাবে তিনি কোনো প্লটই গ্রহণ করেননি। তবে ২০১৬ সালের নিবন্ধন দলিলে তার স্বাক্ষরসহ হস্তান্তরের প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা তার বক্তব্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
  18.  দুদকের তদন্তে নতুন মোড়
  19. শুধু চউকের প্লট নয়, বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনে কর্মরত থাকাকালীন সময়েও আশরাফুল আমিনের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে ২০২৬ সালের ২২ জানুয়ারি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। ৫ ফেব্রুয়ারি তাকে সশরীরে তলব করা হয় এবং বর্তমানে তদন্ত চলছে।
  20.  আইন কী বলছে?
  21. আইনজ্ঞদের মতে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে দণ্ডবিধির ৪২০ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ডসহ প্রশাসনিক শাস্তির মুখোমুখি হতে হতে পারে।
  22.  
  23. সরকারি সম্পদ বণ্টনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রশ্নে এই ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এখন দেখার বিষয় প্রভাবশালী এই চক্রের বিরুদ্ধে আইন কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।