1. চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রাজধানী। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, শিল্পকারখানা, রপ্তানি বাণিজ্য এবং কৌশলগত অবস্থানের কারণে এই শহরের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামের উন্নয়ন পরিকল্পনায় জনগণের প্রকৃত প্রয়োজনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বাহ্যিক চাকচিক্য ও বড় বড় মেগা প্রকল্প। ফলে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত টানেল ও ফ্লাইওভারের পরও নগরবাসীর দৈনন্দিন দুর্ভোগ কমেনি। বরং সাধারণ মানুষের প্রশ্ন,এই প্রকল্পগুলো কি সত্যিই জনস্বার্থে ছিল, নাকি ছিল ‘লুটপাটের প্রকল্প’?
  2. চট্টগ্রামে গত এক দশকে যেসব উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে, তার মধ্যে কর্ণফুলী টানেল, একাধিক ফ্লাইওভার ও উড়ালসড়ক সবচেয়ে আলোচিত। সরকার এসব প্রকল্পকে উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব প্রকল্পের সুফল নগরবাসীর বৃহৎ অংশ পায়নি। বরং নগরীর মূল সমস্যা যানজট, অপরিকল্পিত পরিবহন ব্যবস্থা, গণপরিবহনের সংকট এবং দক্ষিণ চট্টগ্রামের সঙ্গে দুর্বল যোগাযোগ এসব সমস্যাই রয়ে গেছে আগের মতো।
  3. বিশেষ করে কর্ণফুলী টানেল নির্মাণে ব্যয় হয়েছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। অথচ প্রতিদিন কতসংখ্যক যানবাহন এই টানেল ব্যবহার করছে, সেই প্রশ্ন এখনো আলোচনায়। অনেকেই মনে করেন, টানেলের প্রয়োজনীয়তা যতটা প্রচার করা হয়েছিল, বাস্তবে তার ব্যবহার ও জনউপকারিতা ততটা নয়। একইভাবে ফ্লাইওভারগুলোও নগরীর কিছু এলাকায় সাময়িক স্বস্তি দিলেও সামগ্রিক যানজট কমাতে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ সমস্যার মূল জায়গা ছিল পরিকল্পনার অভাব, সমন্বয়হীন ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক গণপরিবহনের অনুপস্থিতি।
  4. অন্যদিকে দক্ষিণ চট্টগ্রামের লাখো মানুষের বহু বছরের দাবি ছিল একটি আধুনিক কালুরঘাট সেতু। প্রায় শতবর্ষ পুরোনো এই সেতু আজও দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের প্রধান ভরসা। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই সেতু পারাপার হয়। একমুখী চলাচল, দীর্ঘ যানজট, ট্রেন চলাচলের সময় সড়ক বন্ধ থাকা এসব কারণে মানুষের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। একটি নতুন ও আধুনিক কালুরঘাট সেতু নির্মিত হলে শুধু দক্ষিণ চট্টগ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থাই উন্নত হতো না, বরং শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটন খাতেও ব্যাপক গতি আসত।
  5. কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, জনগণের এই দীর্ঘদিনের দাবিকে উপেক্ষা করে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে এমনসব প্রকল্পকে, যেগুলোর রাজনৈতিক প্রচারণামূলক মূল্য বেশি। সাধারণ মানুষ মনে করে, যেসব প্রকল্পে বড় অঙ্কের বাজেট থাকে, সেসব প্রকল্পে দুর্নীতি ও কমিশন বাণিজ্যের সুযোগও বেশি থাকে। এ কারণেই অনেকের কাছে টানেল ও ফ্লাইওভারের মতো প্রকল্পগুলো ‘লুটপাটের প্রকল্প’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
  6. চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো গণপরিবহন ব্যবস্থা। প্রতিদিন নগরীর লাখো মানুষ কর্মস্থল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়িক কাজে চলাচল করে সীমাহীন ভোগান্তির মধ্যে। রাস্তায় গাড়ির চাপ দিন দিন বাড়ছে, কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়ছে না কার্যকর পরিবহন ব্যবস্থা। এই অবস্থায় চট্টগ্রামের জন্য সবচেয়ে যুগোপযোগী সমাধান হতে পারত একটি আধুনিক মনোরেল বা মেট্রোরেল ব্যবস্থা।
  7. বিশ্বের উন্নত শহরগুলোতে যানজট নিরসনে মনোরেল অত্যন্ত কার্যকর একটি মাধ্যম হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। চট্টগ্রামের মতো পাহাড়, সংকীর্ণ সড়ক ও ঘনবসতিপূর্ণ শহরে মনোরেল হতে পারত একটি বাস্তবসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। এতে একদিকে যেমন যানজট কমত, অন্যদিকে সময় ও জ্বালানির অপচয়ও হ্রাস পেত। নগরবাসী পেত নিরাপদ, দ্রুত ও আধুনিক গণপরিবহন সুবিধা।
  8. কিন্তু দুঃখজনকভাবে চট্টগ্রামের উন্নয়ন পরিকল্পনায় গণপরিবহন কখনোই যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। বরং ব্যক্তি গাড়িনির্ভর অবকাঠামো নির্মাণেই বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। ফলে নগরীর সাধারণ মানুষ উন্নয়নের সুফল থেকে বঞ্চিত হয়েছে। একটি শহরের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন সেই উন্নয়ন সাধারণ মানুষের জীবনকে সহজ করে। শুধু দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামো নির্মাণ করলেই প্রকৃত উন্নয়ন হয় না।
  9. আজ চট্টগ্রামের মানুষ বুঝতে পারছে, উন্নয়নের নামে যেসব বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে, তার অনেকগুলোই ছিল জনস্বার্থের চেয়ে রাজনৈতিক ও আর্থিক স্বার্থনির্ভর। যদি একই অর্থ জনগণের প্রকৃত প্রয়োজন কালুরঘাট সেতু, মনোরেল, ষআধুনিক বাস ব্যবস্থা, ড্রেনেজ উন্নয়ন ও জলাবদ্ধতা নিরসনে ব্যয় করা হতো, তাহলে চট্টগ্রামের চিত্র অনেকটাই বদলে যেত।
  10. চট্টগ্রাম দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। অথচ এই শহরের মানুষ বছরের পর বছর অবহেলা, যানজট, জলাবদ্ধতা ও অপরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার শিকার। তাই এখন সময় এসেছে উন্নয়নের নামে বাহাদুরি নয়, বাস্তব প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়ার। জনগণের করের টাকায় এমন প্রকল্প হতে হবে, যা সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নত করবে, কেবল রাজনৈতিক প্রচারণার হাতিয়ার হবে না।
  11. চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনায় তাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত গণমানুষের চাহিদাকে। একটি আধুনিক কালুরঘাট সেতু, কার্যকর মনোরেল ব্যবস্থা, পরিকল্পিত গণপরিবহন এবং টেকসই নগর ব্যবস্থাপনাই পারে চট্টগ্রামকে সত্যিকারের আধুনিক শহরে পরিণত করতে। অন্যথায় হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্প শুধু কাগজে উন্নয়নের গল্প হয়ে থাকবে, কিন্তু মানুষের দুর্ভোগ আর হতাশা কখনো কমবে না।
  12. লেখক: সংবাদকর্মী, কলামিস্ট ও সমাজকর্মী।