- চট্টগ্রামে ভাড়া নেওয়ার পর পরিকল্পিতভাবে ছয়টি কাভার্ডভ্যান আত্মসাতের অভিযোগে জামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে কোতোয়ালি থানা পুলিশ। শুক্রবার (২৪ জুলাই) সকালে নগরের লালখান বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় আত্মসাত হওয়া একটি কাভার্ডভ্যান উদ্ধার করে জব্দ করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, বাকি পাঁচটি কাভার্ডভ্যান উদ্ধারে একাধিক টিম কাজ করছে এবং এ ঘটনায় জড়িত একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সন্ধানও মিলেছে।
- পুলিশের দাবি, প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, আত্মসাত হওয়া ছয়টি কাভার্ডভ্যানের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় দুই কোটি টাকা। ব্যবসায়িক লেনদেনের আস্থাকে কাজে লাগিয়ে গাড়িগুলো ভাড়ায় নেওয়া হলেও পরে সেগুলো আর মালিকপক্ষের কাছে ফেরত দেওয়া হয়নি। তদন্তে এটিকে পূর্বপরিকল্পিত প্রতারণা ও আত্মসাতের ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
- মামলা থেকে গ্রেপ্তার
- কোতোয়ালি থানা সূত্র জানায়, সিএন্ডএফ প্রতিষ্ঠান ফ্যাক্ট লজিস্টিকস-এর মালিকানাধীন ছয়টি কাভার্ডভ্যান আত্মসাতের ঘটনায় গত ১২ মে কোতোয়ালি থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলাটি হওয়ার পর থেকেই পুলিশ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে।
- তদন্তের একপর্যায়ে জামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরীর সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়। এরপর তার অবস্থান নিশ্চিত করে শুক্রবার সকালে লালখান বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানের সময় তার দেখানো তথ্যের ভিত্তিতে আত্মসাত হওয়া একটি কাভার্ডভ্যানও উদ্ধার করা হয়।
- উদ্ধার একটি, বাকি পাঁচটির খোঁজে অভিযান
- মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার উপপরিদর্শক (এসআই) কাজী মনিরুল করিম বলেন, “শুক্রবার সকালে অভিযান চালিয়ে আত্মসাত হওয়া একটি কাভার্ডভ্যান উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত অন্যদের শনাক্তে তদন্ত চলছে। তাদের গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আশা করছি, বাকি কাভার্ডভ্যানগুলোও দ্রুত উদ্ধার করা সম্ভব হবে।”
- তিনি জানান, আত্মসাত হওয়া গাড়িগুলোর অবস্থান শনাক্তে বিভিন্ন জেলার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গেও সমন্বয় করা হচ্ছে। কোথাও গাড়িগুলো বিক্রি, লুকিয়ে রাখা কিংবা ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে অন্যত্র স্থানান্তর করা হয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
- যেভাবে আত্মসাত
- তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, ব্যবসায়িক পরিচয়ের সুযোগ নিয়ে কাভার্ডভ্যানগুলো ভাড়ায় নেওয়া হয়েছিল। শুরুতে নিয়মিত যোগাযোগ থাকলেও একপর্যায়ে অভিযুক্তরা গাড়িগুলোর অবস্থান গোপন করতে শুরু করে। নির্ধারিত সময়ে গাড়ি ফেরত না দিয়ে নানা অজুহাত দেখানো হয়। পরবর্তীতে মালিকপক্ষ যোগাযোগ করেও গাড়িগুলো ফেরত না পাওয়ায় বিষয়টি আত্মসাতের পর্যায়ে পৌঁছায় এবং থানায় মামলা করা হয়।
- পুলিশ বলছে, এটি তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের ফল নয়; বরং পরিকল্পিতভাবে যানবাহন আত্মসাতের একটি কৌশল অনুসরণ করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। এ কারণে এ ঘটনার সঙ্গে আরও ব্যক্তি বা একটি সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত থাকতে পারে।
- দুই কোটি টাকার সম্পদ
- তদন্তে জানা গেছে, আত্মসাত হওয়া ছয়টি কাভার্ডভ্যানের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় দুই কোটি টাকা। গাড়িগুলো ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম নিটল মোটরস থেকে কিস্তিতে কিনেছিলেন। ইতোমধ্যে সব কিস্তির অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে এবং গাড়িগুলোর ওপর নিটল মোটরসের আর কোনো আর্থিক দাবি নেই।
- পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গাড়িগুলো বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত হতো। ফলে এগুলো হারিয়ে যাওয়ায় শুধু যানবাহনের মূল্যই নয়, ব্যবসায়িক কার্যক্রমও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে।
- আত্মসাত হওয়া কাভার্ডভ্যানগুলোর নম্বর
- পুলিশ জানিয়েছে, আত্মসাত হওয়া ছয়টি কাভার্ডভ্যানের নিবন্ধন নম্বর হলো: CM-TA-11-5650, CM-TA-11-4733, CM-TA-11-5649, CM-TA-11-5647, CM-TA-11-5648, CM-TA-11-4324
- এগুলোর মধ্যে একটি উদ্ধার হলেও বাকি পাঁচটি এখনও নিখোঁজ রয়েছে।
- অতীত কর্মকাণ্ডও খতিয়ে দেখছে পুলিশ
- তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, গ্রেপ্তারকৃত জামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে জুলাই-২৪-এর নাশকতা ও হত্যার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া তিনি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আওয়ামী যুবলীগ ও ছাত্রলীগের পদ-পদবী ব্যবহার করে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে চোরাই পণ্য বের করার একটি সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলেও তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
- তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ বলছে, তদন্তের স্বার্থে অতীত কর্মকাণ্ডও যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
- সংঘবদ্ধ চক্রের সন্ধানে তদন্ত
- আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, একটি বা দুটি নয়, একসঙ্গে ছয়টি কাভার্ডভ্যান আত্মসাতের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখছে না পুলিশ। তদন্তকারীদের ধারণা, গাড়িগুলো বিভিন্ন স্থানে সরিয়ে ফেলা হয়েছে কিংবা ভিন্ন পরিচয়ে ব্যবহারের চেষ্টা করা হতে পারে। এমনকি নকল কাগজপত্র তৈরি করে মালিকানা পরিবর্তনের চেষ্টাও হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।
- তদন্তকারীরা সংশ্লিষ্ট মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড, আর্থিক লেনদেন, অবস্থানগত তথ্য এবং বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করছেন। প্রয়োজনে দেশের বিভিন্ন জেলায় অভিযান পরিচালনারও প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
- পরিবহন খাতে নতুন উদ্বেগ
- পরিবহন ব্যবসায়ীরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে ভাড়ায় নেওয়া গাড়ি আত্মসাৎ, জাল কাগজপত্র তৈরি এবং মালিকানা পরিবর্তনের মতো অপরাধ বেড়েছে। ফলে গাড়ি ভাড়ায় দেওয়ার আগে চালক, ভাড়াটিয়া এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ও নথি যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে।
- তাদের মতে, সংঘবদ্ধ প্রতারকচক্র প্রথমে ব্যবসায়িক আস্থা তৈরি করে। এরপর দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি বা নিয়মিত ভাড়ার সম্পর্ক গড়ে তুলে একপর্যায়ে যানবাহন নিয়ে আত্মগোপনে চলে যায়। ফলে মালিকদের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি আইনি জটিলতাও তৈরি হয়।
- তদন্ত অব্যাহত
- কোতোয়ালি থানা পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত জামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরীকে আদালতে হাজির করে প্রয়োজনে রিমান্ড আবেদন করা হবে। জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে আত্মসাত হওয়া বাকি পাঁচটি কাভার্ডভ্যানের অবস্থান, এ ঘটনায় জড়িত সহযোগীদের পরিচয় এবং পুরো চক্রের কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়ার আশা করছে তদন্তকারী সংস্থা।
- পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, তদন্ত এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। নতুন তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে এ মামলায় আরও আসামি যুক্ত হতে পারে। একই সঙ্গে আত্মসাত হওয়া বাকি কাভার্ডভ্যান দ্রুত উদ্ধারে অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে।
- তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এ মামলার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ হলে শুধু কাভার্ডভ্যান আত্মসাতের ঘটনাই নয়, এর পেছনে সক্রিয় সম্ভাব্য নেটওয়ার্ক, আর্থিক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা সম্পর্কেও আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসতে পারে।