বন্দরনগরী চট্টগ্রামে বাড়ছে গণপরিবহনের সংকট। নগরের ব্যস্ত সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ স্টপেজগুলোতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও অনেক যাত্রী কাঙ্ক্ষিত যানবাহন পাচ্ছেন না। বিশেষ করে স্বল্প দূরত্বে চলাচলের অন্যতম প্রধান বাহন অটো টেম্পুর সংকট দিন দিন তীব্র হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত যাত্রীরা বাড়তি ভাড়া ও দীর্ঘ অপেক্ষার ভোগান্তিতে পড়ছেন, অন্যদিকে রেজিস্ট্রেশন ও রুট পারমিট না পাওয়ায় বিপুলসংখ্যক অটো টেম্পু গ্যারেজে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন মালিকরা।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, চট্টগ্রাম মহানগরীতে দীর্ঘ সময় ধরে নতুন অটো টেম্পুর রেজিস্ট্রেশন ও রুট পারমিটের সুযোগ সীমিত বা বন্ধ থাকায় পরিবহন খাতে এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে চট্টগ্রাম মহানগরীতে সাত বছর ধরে অটো টেম্পুসহ বিভিন্ন যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন ও রুট পারমিট বন্ধ থাকার কথা উল্লেখ করা হয়।

এদিকে সরকারি নথিতে দেখা যায়, অটো টেম্পুসহ মোটরযানের রেজিস্ট্রেশনের জন্য নির্ধারিত প্রক্রিয়া রয়েছে এবং রুট পারমিটের ক্ষেত্রে আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের পর আঞ্চলিক পরিবহন কমিটির অনুমোদনের বিধান রয়েছে।

 

জনসংখ্যা ও নগরায়ণ বাড়লেও পরিবহনে সেই অনুপাতে সম্প্রসারণ নেই: 

চট্টগ্রাম মহানগরীর আয়তন, জনসংখ্যা ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নতুন আবাসিক এলাকা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়িক কেন্দ্র গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিদিন নগরের সড়কে মানুষের চলাচলও বাড়ছে।

২০২২ সালের জনশুমারি-সংক্রান্ত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম জেলার মোট জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৯১ দশমিক ৬৩ লাখ এবং শহরাঞ্চলের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৪৮ দশমিক ৪৮ লাখ।

তবে পরিবহন সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, জনসংখ্যা ও যাতায়াতের চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বল্প দূরত্বের গণপরিবহন ব্যবস্থা সম্প্রসারিত হয়নি। বরং পুরোনো গাড়ির একটি অংশ বিকল হয়ে রাস্তা থেকে উঠে যাওয়ায় বিদ্যমান পরিবহন ব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বেড়েছে।

ব্যস্ত পয়েন্টে যাত্রীদের দীর্ঘ অপেক্ষা

কোতোয়ালী, নিউ মার্কেট, বহদ্দারহাট, আগ্রাবাদ, অলংকার, জিইসি ও চকবাজারসহ নগরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সকাল ও বিকেলের ব্যস্ত সময়ে গণপরিবহনের জন্য যাত্রীদের দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে দেখা যায় বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

একই সময়ে অফিসগামী কর্মী, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশ দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে বাধ্য হয়ে সিএনজি অটোরিকশা, রিকশা কিংবা অন্যান্য অপেক্ষাকৃত ব্যয়বহুল যানবাহনের দিকে ঝুঁকছেন।

যাত্রীদের অভিযোগ, গণপরিবহনের বিকল্প কম থাকায় অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ভাড়ার তুলনায় বেশি অর্থ গুনতে হচ্ছে। বিশেষ করে জরুরি সময়ে দর-কষাকষির সুযোগ কম থাকায় বাড়তি ভাড়া দিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

সংকটের সুযোগে বাড়ছে ‘জমা’র চাপ

পরিবহন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের একটি অংশের অভিযোগ, রাস্তায় চলাচলকারী অটো টেম্পুর সংখ্যা কমে যাওয়ায় বিদ্যমান গাড়ির ওপর মালিক ও চালকদের নির্ভরতা বেড়েছে। এর সঙ্গে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘দৈনিক জমা’ বাড়ার অভিযোগও রয়েছে।

চালকদের ভাষ্য, দৈনিক জমার পরিমাণ বেশি হলে জ্বালানি, মেরামত ও অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে আয় ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে যাত্রী সংকটের সুযোগ নেওয়ার প্রবণতাও তৈরি হয়।

তবে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ জমা বা অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাম্প্রতিক কোনো সমন্বিত পরিসংখ্যান প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। ফলে এ অভিযোগগুলোর পৃথকভাবে যাচাই প্রয়োজন।

 

গ্যারেজে পড়ে নষ্ট হচ্ছে বিনিয়োগ

সবচেয়ে বড় সংকট দেখা দিয়েছে অটো টেম্পুর মালিকদের মধ্যে। মালিকদের অভিযোগ, গাড়ি কেনার পর রেজিস্ট্রেশন ও রুট পারমিটের জটিলতার কারণে সেগুলো রাস্তায় নামানো সম্ভব না হওয়ায় অনেক গাড়ি দীর্ঘদিন ধরে গ্যারেজে পড়ে আছে।

দীর্ঘদিন চালু না থাকায় গাড়ির ইঞ্জিন, ব্যাটারি, বডি, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা ও বিভিন্ন যন্ত্রাংশ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বৃষ্টির পানি ও আর্দ্র পরিবেশে পড়ে থাকলে মরিচা ধরে গাড়ির কাঠামোগত ক্ষতিও হতে পারে।

ফলে যে গাড়িতে মালিকের বিনিয়োগ ছিল, সেটিই এখন তার কাছে আয়হীন সম্পদে পরিণত হয়েছে। মালিকদের ভাষ্য, গাড়ি চালু না থাকলেও গ্যারেজ ভাড়া, ঋণের কিস্তি ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ বহন করতে হচ্ছে।

‘গাড়ি কিনে এখন ঋণের কিস্তি শোধ করাই কঠিন’

গাড়ি ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ফোরকান বলেন, “বিগত সরকারের সময় কিছু অযোগ্য নেতা ও স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আখের গোছাতে এবং কৃত্রিম সংকট বজায় রাখতে রেজিস্ট্রেশন বন্ধ করে রেখেছিল। আজ আট বছরে চট্টগ্রামে কত মানুষ বেড়েছে। সেই অনুপাতে অটো টেম্পু বাড়ানো তো দূরের কথা, পারমিট বন্ধ রেখে সাধারণ যাত্রীদের ওপর চাপ তৈরি করা হচ্ছে। চড়া জমার চাপে চালকরাও দিশেহারা।”

অপর ভুক্তভোগী টেম্পু মালিক মোহাম্মদ আব্দুল কাদের বলেন,“আমরা বছরের পর বছর বিআরটিএসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে পারমিটের জন্য লিখিত আবেদন জানিয়েছি। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। গাড়ি গ্যারেজে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে, অথচ প্রতিমাসে গ্যারেজ ভাড়া দিতে হচ্ছে। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে গাড়ি কিনে এখন আমরা নিঃস্ব।”

 

প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় কোথায় আটকে আছে সমাধান?

রুট পারমিটের বিষয়ে বিআরটিএর সরকারি তথ্য বলছে, আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের পর তা আঞ্চলিক পরিবহন কমিটির (RTC) কাছে উপস্থাপন করা হয় এবং অনুমোদনের পর রুট পারমিট ইস্যু করা হয়।

অন্যদিকে বিআরটিএর চট্টগ্রাম কার্যালয়ের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মোটরযান নিবন্ধনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, নির্ধারিত ফি, গাড়ি পরিদর্শন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের মতো ধাপ রয়েছে। অটো টেম্পুর ক্ষেত্রেও অনুমোদিত বডি ও আসন বিন্যাসের স্পেসিফিকেশনসহ প্রয়োজনীয় নথির কথা উল্লেখ রয়েছে।

অর্থাৎ, সমস্যা শুধু একটি দপ্তরের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ নয়; নতুন গাড়ির নিবন্ধন, রুট নির্ধারণ, সড়কের ধারণক্ষমতা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক পরিবহন কমিটির সিদ্ধান্ত—সবগুলো বিষয় সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

ভুক্তভোগী মালিক-শ্রমিকদের দাবি, তারা চট্টগ্রাম মেট্রো আরটিসি, বিআরটিএর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কাছে একাধিকবার স্মারকলিপি ও আবেদন করেছেন। কিন্তু দীর্ঘসূত্রতার কারণে কার্যকর সমাধান মিলছে না।

 

শুধু গাড়ি বাড়ালেই কি সমাধান হবে?

পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, অটো টেম্পুর সংখ্যা বাড়ানোর আগে নগরের বর্তমান পরিবহন চাহিদা, সড়কের ধারণক্ষমতা, বিদ্যমান রুট, যানজট এবং যাত্রী চলাচলের ধরন বিশ্লেষণ করা জরুরি।

কারণ, পরিকল্পনাহীনভাবে নতুন গাড়ি নামানো হলে একদিকে যেমন যানজট বাড়তে পারে, অন্যদিকে যেসব রুটে যাত্রীর চাপ বেশি সেসব রুটে আবারও গাড়ির ঘাটতি থেকে যেতে পারে।

তাই প্রয়োজন ডেটাভিত্তিক রুট সমীক্ষা। কোন এলাকায় দিনে কত যাত্রী চলাচল করেন, কোন সময়ে চাপ বেশি, বর্তমানে কতটি যানবাহন চলছে, কতগুলো গাড়ি কার্যত অচল এবং কোন রুটে নতুন গাড়ির প্রয়োজন—এসব তথ্য সংগ্রহ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে সংকটের টেকসই সমাধান সম্ভব।

 

জরুরি ভিত্তিতে রুট সমীক্ষার দাবি: 
পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মতে, চট্টগ্রাম নগরের বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় কয়েকটি পদক্ষেপ দ্রুত নেওয়া প্রয়োজন।

প্রথমত, নগরের বিভিন্ন রুটে যাত্রী চাহিদার জরুরি সমীক্ষা করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, সমীক্ষার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক নতুন অটো টেম্পুর রেজিস্ট্রেশন ও রুট পারমিট দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।

তৃতীয়ত, দীর্ঘদিন গ্যারেজে পড়ে থাকা বৈধ কাগজপত্রের গাড়িগুলোর অবস্থা যাচাই করে পুনরায় সচল করার সুযোগ তৈরি করতে হবে।

চতুর্থত, অতিরিক্ত জমা ও যাত্রীদের কাছ থেকে অননুমোদিত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

পঞ্চমত, নতুন আবাসিক এলাকা ও সম্প্রসারিত নগরাঞ্চলের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন গণপরিবহন রুট নির্ধারণ করতে হবে।

মালিকদের জন্য সহজ অর্থায়নের দাবি: 
দীর্ঘদিন অচল পড়ে থাকা গাড়ি সচল করতে মালিকদের বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন হতে পারে। ফলে বৈধ কাগজপত্র থাকা ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ির মালিকদের জন্য সহজ শর্তে পুনঃঅর্থায়ন বা স্বল্পসুদের ঋণের ব্যবস্থা করা যায় কি না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়ার দাবি উঠেছে।

এতে একদিকে অচল গাড়িগুলো পুনরায় রাস্তায় ফিরতে পারে, অন্যদিকে নতুন গাড়ি আমদানি বা কেনার ওপর চাপ কিছুটা কমতে পারে।

সমাধান না হলে সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা

চট্টগ্রামের গণপরিবহন ব্যবস্থায় অটো টেম্পু একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বল্পদূরত্বের বাহন। ফলে এই খাতে দীর্ঘদিন ধরে নতুন গাড়ির প্রবেশ বন্ধ বা সীমিত থাকলে পুরোনো গাড়ির ওপর চাপ বাড়বে—এটাই স্বাভাবিক।

একদিকে যাত্রীর সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে পুরোনো গাড়ির একটি অংশ নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বা যান্ত্রিক ত্রুটিতে রাস্তা থেকে উঠে যাচ্ছে। ফলে সরবরাহ ও চাহিদার ব্যবধান আরও বড় হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ অবস্থায় শুধু নতুন গাড়ির অনুমোদন নয়, কতটি গাড়ি প্রয়োজন, কোন রুটে প্রয়োজন, কী ধরনের গাড়ি চলবে এবং কীভাবে ভাড়া ও পরিচালনা নিয়ন্ত্রণ করা হবে—এসব বিষয়কে সমন্বিত পরিবহন পরিকল্পনার আওতায় আনা জরুরি।

 


নগরবাসীর দাবি—আশ্বাস নয়, কার্যকর সিদ্ধান্ত: 

চট্টগ্রামের গণপরিবহন সংকট এখন কেবল পরিবহন মালিক বা চালকদের সমস্যা নয়; এটি নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবন, কর্মঘণ্টা ও যাতায়াত ব্যয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

তাই সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয় করে দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ পরিবহন সমীক্ষা, রুট পুনর্মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক অটো টেম্পুর অনুমোদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

নগরবাসীর প্রত্যাশা—দীর্ঘসূত্রতার অবসান ঘটিয়ে জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে যাত্রীদের সাশ্রয়ী ও নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার পাশাপাশি বৈধ বিনিয়োগকারীদের অচল সম্পদ সচল করার পথও তৈরি করা হবে।

কারণ, গ্যারেজে পড়ে থাকা প্রতিটি অচল গাড়ি শুধু একজন মালিকের আর্থিক ক্ষতির প্রতীক নয়; একই সঙ্গে তা চট্টগ্রামের গণপরিবহন ব্যবস্থায় বিদ্যমান ঘাটতিরও একটি দৃশ্যমান চিত্র।