সাজানো তাক, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ আর পরিচিত ব্র্যান্ড— সুপারশপে এসব দেখেই পণ্যের নিরাপত্তা ও মান নিয়ে আস্থা রাখেন ক্রেতারা। তবে চট্টগ্রামের পরিচিত ‘উৎসব’ সুপারশপকে ঘিরে একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ ও অভিযানের ঘটনায় সেই আস্থাই এখন প্রশ্নের মুখে।

মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্যপণ্য সংরক্ষণ ও বিক্রি, নষ্ট মসলা ও চকোলেট, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মাংস সংরক্ষণ, যথাযথ লেবেল ও আমদানিকারকের তথ্য ছাড়া খাদ্যপণ্য বিক্রির মতো অনিয়মের পর এবার প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে উঠেছে নকশা বহির্ভূত নির্মাণ ও পর্যাপ্ত পার্কিং না রাখার অভিযোগ।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহর এক্সেস রোডে উৎসব সুপারমার্কেটের আউটলেটে অভিযান চালিয়ে নকশা বহির্ভূত স্থাপনায় কার্যক্রম পরিচালনার দায়ে প্রতিষ্ঠানটিকে ৮ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

সিডিএ’র অথরাইজড অফিসার-২ তানজিব হোসেন জানান, অভিযানের সময় উৎসব সুপার মার্কেট কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে অনুমোদিত নকশা দেখাতে পারেনি। পরিদর্শনে দেখা যায়, বাণিজ্যিক ভবন হলেও অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পার্কিং সুবিধা নেই।

তানজিব হোসেন বলেন, কর্তৃপক্ষ রাস্তার জায়গায় গাড়ি পার্কিং করার কথা জানিয়েছে। এসব অনিয়মের কারণে অভিযান পরিচালনাকারী ম্যাজিস্ট্রেট প্রতিষ্ঠানটিকে ৮ লাখ টাকা জরিমানা করেছেন।

তিনি আরও জানান, ভবন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অঙ্গীকারনামা নেওয়া হয়েছে। তারা অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী ব্যত্যয়কৃত অংশ সংশোধন এবং পর্যাপ্ত পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করবে বলে অঙ্গীকার করেছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা না নিলে বিধি অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে সিডিএ চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘উৎসব সুপার কোনো ধরনের নিয়মনীতি মানছে না। অভিযানকালে উৎসব সুপার মার্কেট কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে অনুমোদিত নকশা দেখাতে পারেনি। পরিদর্শনে দেখা যায়, এটি বাণিজ্যিক ভবন হলেও অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পার্কিং সুবিধা নেই। বরং কর্তৃপক্ষ রাস্তার জায়গায় গাড়ি পার্কিং করার কথা জানিয়েছে।’

প্রকাশিত আদালত-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, উৎসবে মেয়াদোত্তীর্ণ মোমোসসহ নষ্ট মরিচ, মসলা ও চকোলেট পাওয়া যায়। আমদানিকৃত খাদ্যপণ্যে লেবেল ও আমদানিকারকের তথ্য না থাকা এবং শিশুখাদ্য ও খাদ্য সম্পূরক বিক্রিতে প্রয়োজনীয় নিবন্ধন বা অনুমোদনের ঘাটতির বিষয়ও উঠে এসেছে।

আরও গুরুতর অভিযোগের মধ্যে রয়েছে একই সরঞ্জাম দিয়ে গরু ও খাসির মাংস প্রক্রিয়াকরণ। এতে খাদ্যদূষণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা। এছাড়া পণ্যের পুষ্টিতথ্য আড়াল করে নিজস্ব স্টিকার ব্যবহারের বিষয়টিও আদালতের কার্যক্রমে এসেছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এসব ঘটনায় ৮ লাখ টাকা জরিমানার পাশাপাশি আদালত আমদানিকৃত ফলমূলের ক্রয়মূল্য ও সংশ্লিষ্ট তথ্য উপস্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন। প্রয়োজনীয় পুষ্টিতথ্য ও অনুমোদন ছাড়া আচার এবং ‘হোমমেড’ পণ্য বিক্রিতেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। আগামী ৩০ আগস্ট এসব বিষয়ে আদালতে তথ্য উপস্থাপনের নির্দেশ রয়েছে।

এর আগে গত এপ্রিলে হালিশহরের বড়পোল এলাকায় উৎসবের একটি শাখায় বন্যপ্রাণী প্রদর্শনের অভিযোগে অভিযান চালিয়ে সাপ, বানর ও টিয়াসহ বিভিন্ন প্রাণী উদ্ধারের খবর প্রকাশিত হয়। তবে ওই ঘটনাটি খাদ্য নিরাপত্তা-সংক্রান্ত মামলার সঙ্গে পৃথক।

এদিকে বিনিয়োগের টাকা ও লভ্যাংশ ফেরত চাওয়া নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে একজন ব্যবসায়ীর অভিযোগের খবরও প্রকাশিত হয়েছে। তবে এটি একটি অভিযোগ; আইনগতভাবে নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এটিকে প্রতিষ্ঠিত অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

উৎসব সুপারশপের একের পর এক অভিযোগ ও অভিযানের বিষয়ে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, বারবার অভিযান পরিচালনা করে জরিমানা করা হলেও প্রতিষ্ঠানটি কোনো ধরনের নিয়মনীতি মানছে না। উৎসবের ক্ষেত্রে যেন আইন না মানার একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। তারা নিয়মনীতি কোনোভাবেই তোয়াক্কা করছে না।

তিনি বলেন, ভোক্তাদের স্বার্থে উৎসবের কার্যক্রম সামনে থেকে ফলোআপ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শুধু সুপারশপের চাকচিক্য দেখে পণ্য না কিনে কেনার আগে পণ্যের মেয়াদ (ডেট), লেবেলসহ প্রয়োজনীয় সব তথ্য যাচাই করে পণ্য কেনার আহ্বান জানান তিনি। এতে ভোক্তারা যেমন প্রতারিত হওয়ার ঝুঁকি থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে পারবেন, তেমনি সবার জন্যই বিষয়টি আরও ভালো হবে।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে উৎসব সুপারমার্কেটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শহিদুল আজাদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। পরে মুঠোফোনে কল রিসিভ করলেও তিনি নামাজে আছেন জানিয়ে ফোন কেটে দেন। ফলে এ প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তার বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।