মা ইলিশ সংরক্ষণে সরকারি নিষেধাজ্ঞা যথাযথভাবে প্রতিপালনের পাশাপাশি জেলে সম্প্রদায়ের জীবনমান উন্নয়ন, সন্তানদের শিক্ষায় সম্পৃক্ত করা এবং প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা অর্জনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
আজ সোমবার নগরীর উত্তর পতেঙ্গার মুসলিমাবাদ জেলেপাড়ায় মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত জনসচেতনতা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
জেলা প্রশাসক বলেন, ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ এবং এটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মৎস্য সম্পদ। ইলিশের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। এ সম্পদ রক্ষা করা শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়;জেলে, ব্যবসায়ী, ভোক্তা ও সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত দায়িত্ব। ইলিশের উৎপাদন ও প্রজনন স্বাভাবিক রাখতে মা ইলিশ সংরক্ষণে সবাইকে আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে। আগামী ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত মোট ২২ দিন ইলিশ আহরণ, পরিবহন, বিপণন, মজুদ, ক্রয়-বিক্রয় ও বিনিময় নিষিদ্ধ থাকবে। এসময়ে জেলেদের মাছ আহরণ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞার সময় জেলে পরিবারগুলো যে আর্থিক ও সামাজিক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়, তা সরকার অবগত। জেলেদের জন্য সরকারি সহায়তা ও প্রণোদনা কার্যক্রমের পাশাপাশি তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের বিষয়েও চিন্তা করতে হবে। জেলে সম্প্রদায়ের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শিক্ষিত করে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, শুধু বর্তমান প্রজন্মের পেশাগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখলেই হবে না, পরিবর্তিত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন দক্ষতা অর্জন করতে হবে। জেলে পরিবারের সন্তানদের নিয়মিত স্কুলে পাঠানোর জন্য তিনি অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানান এবং বলেন, একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করলেই হবে না, সেখানে জেলেদের সন্তানদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব সহযোগিতা করা হবে।
তিনি আরও বলেন, বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং মৎস্য আহরণে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। তাই ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জেলেদের আধুনিক প্রযুক্তি, নিরাপদ নৌযান পরিচালনা এবং মৎস্য আহরণের আধুনিক পদ্ধতি সম্পর্কে দক্ষতা অর্জন করতে হবে। সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়ার সময় জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তির সঙ্গে সংযুক্ত থাকার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।
জেলে পরিবারের জীবনমান উন্নয়নের বিষয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের উন্নয়ন নিশ্চিত না হলে সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। জেলে সম্প্রদায়ের উন্নয়নে সরকার কাজ করছে। তবে সরকারি সহায়তার পাশাপাশি নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনে জেলেদেরও উদ্যোগী হতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের জন্য কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায়, দক্ষতা অর্জন ও শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।
জেলেদের দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, জেলে পরিবারের জন্য সরকারের বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি রয়েছে। ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় সুবিধা নিশ্চিত করা এবং জেলেদের জন্য ভিজিএফের চালসহ সরকারি সহায়তা দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। এসময় জেলে পরিবারের সদস্যদের সরকারি সহায়তা যথাযথভাবে গ্রহণের পাশাপাশি নিজেদের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
জেলা প্রশাসক জেলেদের পারস্পরিক ঐক্য, সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের আহ্বান জানিয়ে বলেন, কোনো ধরনের ঝগড়া-বিবাদ বা মাদকের মত অন্যায় কর্মকাণ্ডে জড়ানো যাবে না। নিজেদের অধিকার ও উন্নয়নের বিষয়গুলো সম্মিলিতভাবে তুলে ধরতে হবে এবং ঐক্যবদ্ধভাবে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
সভায় চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম এর সভাপতিত্বে কোস্ট গার্ড, নৌবাহিনী, নৌ পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, জেলে সম্প্রদায়ের সদস্য এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
পরে জেলা প্রশাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, চট্টগ্রামের উদ্যোগে জেলেপাড়ায় দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ২০০টি জেলে পরিবারের মাঝে শুকনো ও অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়।