সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মদীনা মুনাওয়ারার বেসামরিক জনপদ ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতকারী 'তাইবাহ বিদ্যুৎকেন্দ্রে' ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের দ্বারা সংঘটিত বর্বরোচিত, কাপুরুষোচিত ও হীন ড্রোন হামলার বিরুদ্ধে গভীর ক্ষোভ, তীব্র নিন্দা ও জোরালো প্রতিবাদ জ্ঞাপন করিয়াছে বাংলাদেশ দরগাহ-মাজার জাতীয় সমন্বয় কমিটি - কেন্দ্রীয় পর্ষদ।

সংগঠনের মাননীয় চেয়ারম্যান, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সুফি গবেষক আলহাজ্ব শাহ মোহাম্মদ তৌহিদুল কাদের চৌধুরী এবং মাননীয় মহাসচিব আলহাজ্ব শাহ মোহাম্মদ জাকির হোসেন সোবহানীসহ কেন্দ্রীয় পর্ষদের সকল নেতৃবৃন্দ এবং দেশের সর্বস্তরের দরবার ও খানকাহ সমূহের পীর-মাশায়েখ ও সুফি সাধকবৃন্দের পক্ষে অদ্য এক যৌথ বিবৃতিতে এই কঠোর হুঁশিয়ারি ও নিন্দা প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। সংগঠনের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মুফতি মহিউদ্দিন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নীতি-অবস্থান ঘোষণা করা হইয়াছে।

রাসূলের (সা.) প্রতি সুফি ভাবাদর্শের পরম আনুগত্য ও মদীনার আধ্যাত্মিক গুরুত্ব:

নেতৃবৃন্দ সুগম্ভীর কণ্ঠে ব্যক্ত করেন যে, মদীনা মুনাওয়ারা কেবল কোনো সাধারণ ভৌগোলিক বা রাজনৈতিক ভূখণ্ড নহে; বরং ইহা বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ের স্পন্দন এবং ঈমানের প্রধানতম বাতিঘর। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ নেয়ামত, নূরে মুজাসসাম হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা আহমদ মুস্তফা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য, পরম মোহাব্বত ও রূহানী ভালোবাসার মহোত্তম কেন্দ্র হইল এই পবিত্র মদীনা পাক। রওজা মোবারক এবং মসজিদে নববীর এই শান্তিময় নগরীতে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করিয়া হামলা চালানো কেবল একটি ‘বেপরোয়া কার্যকলাপ’ নহে, বরং উহা বিশ্ব মুসলিমের ধর্মীয় অনুভূতিতে চরম আঘাত এবং বিশ্বনবীর (সা.) শানে ধৃষ্টতার শামিল। আশেকে রাসুল সুফি জনতা এই ধৃষ্টতা ও অবমাননা কোনোভাবেই বরদাশত করিবে না।

মদীনা পাকের অলৌকিক সুরক্ষায় আল্লাহর ঐশী অঙ্গীকার:

বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ দৃঢ়তার সহিত স্মরণ করাইয়া দেন যে, পবিত্র মদীনা শরিফের সার্বিক হেফাজত, স্থিতি ও সুরক্ষার মহতী দায়িত্ব স্বয়ং রাব্বুল আলামীন নিজ কুদরতি হস্তে গ্রহণ করিয়াছেন। ইসলামের শাশ্বত ইতিহাস সাক্ষী—যুগে যুগে যাহারাই এই পবিত্র নগরী এবং আল্লাহর রাসুলের প্রেমধন্য পুণ্যভূমির ক্ষতিসাধন বা অবমাননার অপচেষ্টা করিয়াছে, কুদরতি গজবে তারা ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হইয়াছে। আবরাহার হস্তীবাহিনীর ন্যায় মদীনার দিকে ধেয়ে আসা যেকোনো উগ্রপন্থী, কুচক্রী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর আস্ফালন ও অহংকার আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ধূলিসাৎ করিয়া দিবেন—ইহা সুনিশ্চিত।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশ সরকারের সংহতিকে অকুণ্ঠ সমর্থন:

বিজ্ঞপ্তিতে নেতৃবৃন্দ উল্লেখ করেন, সৌদি আরবের আঞ্চলিক নিরাপত্তা, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বাংলাদেশ সরকারের তাৎক্ষণিক ও দৃঢ় সংহতি প্রকাশের অবস্থান অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও দূরদর্শী। আঞ্চলিক শান্তি, শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতাকে বিঘ্নিত করে এমন যেকোনো ধরনের সন্ত্রাসী ও উগ্র আগ্রাসী কর্মকাণ্ডকে বাংলাদেশ সর্বদা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে। বাংলাদেশ দরগাহ-মাজার জাতীয় সমন্বয় কমিটি রাষ্ট্রের এই সময়োপযোগী পররাষ্ট্র নীতির প্রতি পূর্ণ একাত্মতা ঘোষণা করিতেছে।

অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপট: উগ্র মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদের উপদ্রব বনাম জাতীয় সার্বভৌমত্ব:

এই আন্তর্জাতিক সংকটের প্রেক্ষাপটকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতার সহিত সংযুক্ত করিয়া নেতৃদ্বয়—আলহাজ্ব শাহ মোহাম্মদ তৌহিদুল কাদের চৌধুরী ও আলহাজ্ব শাহ মোহাম্মদ জাকির হোসেন সোবহানী এক গভীর ও সূক্ষ্ম কৌশলগত বিশ্লেষণ উপস্থাপন করিয়াছেন। তাঁহারা অত্যন্ত উদ্বেগের সহিত সতর্ক করিয়া বলেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের হুথিদের ন্যায় উগ্র ও হঠকারী আদর্শের সমান্তরালে বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও এক শ্রেণীর উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠী ও তক্ষকসদৃশ জঙ্গি চক্র মাথাচাড়া দিয়া উঠিবার অপচেষ্টা করিতেছে।

জাতীয় জীবনের চলমান রূপান্তর ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ লইয়া এই সুপ্ত ও নিষিদ্ধ ঘোষিত উগ্রবাদী চক্রসমূহ পুনরায় সুসংগঠিত হইবার চেষ্টা করিতেছে, যাহা এদেশের কষ্টে অর্জিত স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং সামাজিক সম্প্রীতির প্রতি এক চরম অস্তিত্ব সংকটের বার্তা বহন করে।

সামাজিক নিরাপত্তা ও জনজীবনের উপর চরম আঘাত:

বিজ্ঞপ্তিতে অত্যন্ত জোরালোভাবে ব্যাখ্যা করা হয় যে, এই অভ্যন্তরীণ উগ্র ধর্মান্ধতার বিস্তার সাধারণ মানুষের সার্বিক পরিস্থিতি ও সামাজিক নিরাপত্তাকে কোন রূপ গভীর সংকটের মুখে ঠেলিয়া দিতেছে:

 

* সাংস্কৃতিক সম্প্রীতি বিনষ্টের ষড়যন্ত্র: শত শত বছর ধরিয়া বহমান এদেশের ঐতিহ্যবাহী, অসাম্প্রদায়িক ও সুফি ভাবাদর্শের যে উদার ইসলামিক সংস্কৃতি, এই উগ্রবাদীরা তাহা ধ্বংস করিয়া এক চরমপন্থী ও উগ্র ধর্মীয় মেরুকরণ চাপাইয়া দিতে চায়।

* জননিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়: জঙ্গি ও মৌলবাদী তৎপরতা সমাজের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ব্যাহত করে, বিনিয়োগের পরিবেশ বিনষ্ট করে এবং সার্বিক জনজীবনে এক চিরস্থায়ী মনস্তাত্ত্বিক ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে।

* স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের অবমাননা: একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা—সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারকে বুড়ো আঙুল দেখাইয়া এই উগ্র গোষ্ঠীসমূহ দেশকে একটি অন্ধকার ও অরাজক পরিস্থিতির দিকে ধাবিত করিতে চায়, যাহা কোনো দেশপ্রেমিক নাগরিকের নিকট কাম্য হইতে পারে না।

 

উপসংহার ও কার্যকর পদক্ষেপের উদাত্ত আহ্বান:

বাংলাদেশ দরগাহ-মাজার জাতীয় সমন্বয় কমিটি একদিকে ওআইসি (OIC) ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে হারামাইন শরিফাইনের স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাইতেছে; অপরদিকে রাষ্ট্রের সকল জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সচেতন দেশপ্রেমিক সুফি জনতাকে দেশের অভ্যন্তরে ঘাপটি মারিয়া থাকা উগ্র মৌলবাদী ও জঙ্গি চক্রের আর্থিক উৎস, ডিজিটাল প্রচার মাধ্যম ও গোপন আস্তানা সমূহে একযোগে আপসহীন ও কঠোর গোয়েন্দা অভিযান পরিচালনার জোর আহ্বান জানাইতেছে।

পরিশেষে, পবিত্র মদীনা মুনাওয়ারার চিরস্থায়ী শান্তি, বাংলাদেশের সার্বভৌম অক্ষুণ্ণতা এবং এই দেশের সর্বস্তরের মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতি কামনায় মহান আল্লাহর দরবারে বিশেষ দোয়া ও প্রার্থনা করা হয়।