চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) আড়াই হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক প্রকৌশলী মো. গোলাম ইয়াজদানীকে মারধরের ঘটনায় চার অসংগতি চিহ্নিত করেছে তদন্ত কমিটি। এর মধ্যে মূল্যায়ন কার্যক্রম শেষে হওয়ার আগেই টেন্ডার প্রক্রিয়ার গোপনীয় বিষয় ফাঁস হওয়ায় চসিকের প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামসহ ছয়জন ‘দায়বদ্ধ’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে রিপোর্টে।

গতকাল বুধবার চসিক মেয়র মো. রেজাউল করিম চৌধুরীর দপ্তরে এ রিপোর্ট জমা দিয়েছে চসিকের গঠিত তদন্ত কমিটি। তবে এ বিষয়ে সরাসরি মুখ খুলতে রাজি হননি কর্মকর্তারা। এর আগে গত ২৯ জানুয়ারি নগর ভবনের চতুর্থ তলায় ৪১০ নম্বর রুমে প্রকল্প পরিচালককে মারধর করা হয়। এরপর চসিকের রাজস্ব কর্মকর্তা সৈয়দ শামসুল তাবরীজকে প্রধান করে তিন সদস্যর কমিটি গঠন করা হয়। ঘটনার কদিন পরেই জড়িত ১২ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করার পাশাপাশি চসিকের মামলায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

রিপোর্ট জমা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে চসিক সচিব খালেদ মাহমুদ  বলেন, ‘রিপোর্টটি মেয়রের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে এর বেশি কিছু আমার জানা নেই।’


চসিক সূত্রে জানা গেছে, চসিকের প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামসহ প্রকৌশলী বিভাগ ও সচিবালয় শাখার ২৮ জনের কাছ থেকে সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়।

রিপোর্টে যে চারটি অসঙ্গতি তুলে ধরা হয়েছে সেগুলো হলো—হামলার সময় পিডি গোলাম ইয়াজদানীকে রক্ষায় চসিকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এগিয়ে না আসা, প্রকল্পের সহকারী প্রকৌশলী হওয়া সত্ত্বেও শুনানি চলাকালে চসিক কর্মকর্তা তাসমিয়া জাহান ছুটিতে থাকায় হতাশ হয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তারা এবং ঘটনা তদন্তের মেয়াদ দুই দফা বাড়ানো হলেও প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরের অসহযোগিতার কারণে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানা সম্ভব হয়নি। তা ছাড়া মূল্যায়ন কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার আগেই টেন্ডারের গোপনীয় বিষয় ঠিকাদারের কাছে প্রকাশ হওয়ায় প্রকল্প পরিচালক, উপ-প্রকল্প পরিচালক, প্রধান প্রকৌশলী, সহকারী প্রকৌশলী, উপ-সহকারী প্রকৌশলী, কম্পিউটার অপারেটর কাম অফিস সহকারী সম্পূর্ণভাবে দায়বদ্ধ বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঘটনার কারণ

ঠিকাদারদের দাবি অনুযায়ী কাজ না পাওয়া এবং তাৎক্ষণিক সেই টেন্ডারের এবং ওই টেন্ডারগুলো ড্রপিংয়ের সময় জমা দেওয়া অর্থ ফেরত চাওয়া, তা ছাড়া অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ পাওয়ায় ব্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করেন হামলাকারীরা। এসব ঘটনার কারণেই হামলা হয়েছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। যদিও উল্লিখিত টেন্ডারগুলোর মূল্যায়ন কমিটির অনুমোদন তখনো সম্পন্ন হয়নি। এ অবস্থায় তদন্ত চলাকালে চসিকের প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারী জানান যে, ‘চূড়ান্ত মূল্যায়ন রিপোর্ট অনুমোদনের পূর্বেই ঠিকাদাররা এ গোপনীয় বিষয় জেনে ফেলার কোনো সুযোগ নেই। যদি না প্রকৌশল দপ্তর থেকে কেউ এ গোপনীয় বিষয় তাদের সরবরাহ না করে।’

সুপারিশগুলো

নগর ভবনে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ১০ দফা এবং টেন্ডারের গোপনীয়তা রক্ষায় চার দফা সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি।

গোপনীয়তা রক্ষায় প্রকল্পের টেন্ডার কার্যক্রমের প্রত্যেক ফাইল নিয়মতান্ত্রিক এবং স্বচ্ছতা রক্ষা, অভ্যন্তরীণ তথ্য ফাঁস রোধে যত্মবান হওয়া, টেন্ডার প্রক্রিয়া চলাকালে ঠিকাদার বা তাদের লোকজনের অপ্রয়োজনীয় অনুপ্রবেশ সংরক্ষিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

তা ছাড়া নগর ভবনে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে কর্মকর্তাদের রুমে ইমার্জেন্সি অ্যালার্ম সিস্টেম, গেটে রেজিস্ট্রার সিস্টেম, প্রত্যেক ফ্লোরে কমপক্ষে দুজন করে নিরাপত্তা প্রহরী, সিসি ক্যামেরা স্থাপন, অফিস টাইমে বহিরাগতদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ, চসিকের নিরাপত্তা বিভাগে কর্মরতদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, সহকর্মীদের সঙ্গে পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বৃদ্ধিসহ ১০টি বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছে।

এই বিষয়ে জানতে চসিকের প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামকে ফোন করলে তিনি ফোন ধরেননি।