নগরের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে ৭৬ দশমিক ২৫ শতাংশ। ১৫টি খালের কাজ পুরোপুরি শেষ হয়েছে। বাকি খালের মধ্যে ব্রিজ, কালভার্ট ও রোড সাইড ড্রেন ও নতুন ড্রেনের কাজ শেষ হয়েছে শতভাগ। এ অবস্থায় চলতি বর্ষায় জলাবদ্ধতা থেকে অনেকাংশে মুক্তি মিলবে বলে মনে করছে বাস্তবায়নকারী সংস্থা। তবে প্রকল্পের বাইরে থাকা ২১টি খাল নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা ৩৪ কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের কার্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে এ তথ্য জানান প্রকল্পটির পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. শাহ আলী। অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষ ও ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার মাসুদুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।অনুষ্ঠানে প্রকল্পের কাজে সন্তোষ প্রকাশ করা হলেও প্রকল্পের বাইরে থাকা ২১টি খাল পরিষ্কার না হওয়াতে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়। এসব খালের মধ্যে ৫৯টি পয়েন্টকে চিহ্নিত করা হয়েছে। যে পয়েন্টগুলোতে ময়লা-আবর্জনা জমে যায় এবং ইউটিলিটি লাইনের কারণে পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়ে দ্রæত পানি জমে যায়। এসব খালের তদারক সংস্থা যথাযথ পদক্ষেপ নিবে বলে আশা করা হয়।
অনুষ্ঠানে ব্রিগেডিয়ার মাসুদুর রহমান বলেন, আমাদের ব্রিগেড থেকে এ পর্যন্ত ৪১টি প্রকল্প শেষ করেছি। এবছর ৪টি প্রকল্প সফলভাবে শেষ করেছি। এতোগুলো কাজ করতে গিয়ে আমাদের অনেক চ্যালেঞ্জ ছিলো। কিন্তু জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের মতো জটিল ছিল না। এ প্রকল্পটি আসলে অনেক চ্যালেঞ্জিং। কারণ আমরা বছরে ৬ মাস কাজ করতে পারি। বাকি ছয়মাস কাজ বন্ধ রাখতে হয়। আবার কাজ করতে খালের মধ্যে বাঁধ দিতে হয়। জনদুর্ভোগের কথা চিন্তা করে বর্ষার আগে বাঁধ অপসারণ করতে হয়। যেন বৃষ্টি হলে জনদুর্ভোগ না বাড়ে। তাই ঈদের আগেই আমরা কাজ বন্ধ করে দিয়েছি।
তিনি বলেন, কাজ করতে গিয়ে আমাদের প্রচুর চ্যালেঞ্জ আছে। মুরাদপুরে কালভার্টের কাজ করেছি দেড়মাসে। কিন্তু সেটার জন্য ইউটিলিটি সরাতে আমাদের ৬ মাস সময় লেগেছে। মাসুদুর রহমান বলেন, এবার বর্ষায় আগের মতো পানি উঠবে না। ৫৭টি খালের মধ্যে ২১টি বাদে ৩৬টি খালের দায়িত্ব আমাদের দেয়া হয়েছে। এসব খালে পানি আটকে থাকবে না। বাকি ২১টি খালের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থা ব্যবস্থা নিবে। প্রচুর ময়লা খালে পড়ছে, মানুষ সচেতন না হলে সুফল সম্ভব নয়। সিডিএ চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষ বলেন, আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন সংস্থার সাথে সমন্বয় সভা করে জলাবদ্ধতা প্রকল্পের মূল কাজ শুরু হয়। তিন বছরে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে যে কাজ হয়েছে, অন্য কোনো সংস্থার করলে সেটা ১৩ বছর লাগতো। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সিডিএ’র অন্য একটি প্রকল্পের অধীনেও জলাবদ্ধতার কিছু কাজ হচ্ছে। সবগুলো কাজ শেষ হলে আমরা জলাবদ্ধতার অভিশাপ মুক্ত হবো। তিনি বলেন, ময়লা ফেললে সেটা সিটি কর্পোরেশন আইনে শাস্তির বিধান আছে। সে অনুসারে শাস্তির ব্যবস্থা নিতে পারে। আমাদের সচেতন হতে হবে। যেখানে সেখানে ময়লা ফেলা থেকে বিরত থাকতে হবে। যে বাঁধগুলো ছিলো সেগুলো সরিয়ে ফেলা হয়েছে। বর্ষায় পানি উঠবে না
অনুষ্ঠানে বাস্তবায়নকারী সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়, ৪৫টি ব্রিজ, ৬টি কালভার্ট, ১০.৭৭ কিলোমিটার নতুন ড্রেন নির্মাণ ও ১৫.৫ কিলোমিটার রোড সাইড ড্রেনের কাজ শতভাগ শেষ হয়েছে। খালের মুখে রেগুলেটর বসানোর কাজ শেষ হয়েছে ৯৮ শতাংশ। এছাড়া ১৭৬ কিলোমিটার রিটানিং ওয়ালের কাজের মধ্যে ১১৮ কিলোমিটার শেষ হয়ে অগ্রগতি ৬৭.০৫ শতাংশ, ৪২টি সিল্ট ট্রেপের মধ্যে ১৩টির কাজ শেষ করে অগ্রগতি ৩০.৯৫ শতাংশ, ৮৫.৬৮ কিলোমিটার খাল পাড়ের রাস্তা নির্মাণ ১৮.৯০ শতাংশ এবং ৫০ কিলোমিটার ফুটপাত নির্মাণের কাজ ১১ শতাংশ শেষ হয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. শাহ আলী বলেন, এখন পর্যন্ত প্রকল্পের ৭৬ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। গত বছরগুলোতে নগরে যেভাবে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছিল তা এবার আরও কমে আসবে। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার পাশে যেসব খাল বা নালা রয়েছে তার কাজ শতাভাগ শেষ করা হয়েছে। শুধু খাল বা নালা প্রশস্ত করলে হবে না, নগরবাসীকে আরও সচেতন হতে হবে। বাসাবাড়ির বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য বিশেষ করে পলিথিন জাতীয় বস্তু যেখানে সেখানে ফেলা যাবে না। কারণ এ ধরনের বস্তুগুলো পানি চলাচলের পথে বাধা সৃষ্টি করে। তাই এ ব্যাপারে সচেতন থাকা উচিত।
তিনি বলেন, শহরের ১৮ শতাংশ এলাকায় জোয়ারের পানি প্রবেশ করে। রেগুলেটর বসানোর ফলে এখন পানি প্রবেশ করতে পারবে না। এখন পর্যন্ত আমরা ১৫টি খালের কাজ শেষ করেছি। জুনের মধ্যে ২০ থেকে ২২টি খালের কাজ শেষ হবে। ভ‚মি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাকি কাজ শেষ হবে। আমাদের প্রকল্পের বাইরে আরো ২১টি খাল রয়েছে। ১৬শ কিলোমিটার ড্রেন রয়েছে। প্রকল্পের বাইরের খালে পানি জমলে সেটার দায় আমাদের উপর বর্তায় না।
প্রসঙ্গত, ৯ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে নগরের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প। সর্বশেষ চার হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হয় এ প্রকল্পের ব্যয়। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) এ প্রকল্পের বাস্তবায়নকারী সংস্থা হলেও নির্মাণকাজ করছে সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড। ২০১৮ সালের ৯ এপ্রিল সিডিএ ও ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ওই মাসের ২৮ তারিখ থেকে ড্রেনেজ সংস্কার ও পরিচ্ছন্নতার কাজ শুরু করে সেনাবাহিনী।