বারই রবিউল আউয়াল বিশ্বের মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য আনন্দ-বেদনার একটি পবিত্র দিন।আমাদের প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শুভ জন্মদিন।মহানবী(সা.)-এর আবির্ভাব দিবসটি মুসলিম বিশ্বের জন্য অত্যন্ত পবিত্রতম,আনন্দময় ও তাৎপর্যপূর্ণ।

বিশ্বের মুসলিম ধর্মাবলম্বীগণ এই দিবসে অনেকে জশনে জুলুছ বা শোভাযাত্রা করে থাকেন।আবার এই তারিখেই নবীজি পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে আল্লাহতালার সান্নিধ্যে চলে যান। তদনুযায়ী এ দিনটিকে ওফাত দিবস হিসেবেও গণ্য করা হয়। তাই মুসলমানদের জন্য আজকের দিনটি বেদনার দিনও বটে।
     হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা (স.) সকল নবী ও রাসুলগণের মধ্যে সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ এবং বিশ্বের বিস্ময় একজন মহামানব।তিনি মানবতার মুক্তির দূত।ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরাও মহানবীকে মহা-সত্যবাদী বা পরম বিশ্বাসী বলে আখ্যায়িত করে থাকেন।তাঁর শুভাগমনে জগতের সকল মুর্তি,কিসরার ও কাইজারের গগনচুম্বী রাজপ্রাসাদ ভেঙ্গে চুরমার এবং পারস্যের অনির্বাণ অগ্নিকুল চির নির্বাপিত হয়েছিল।শুধুমাত্র ইবলিস শয়তান ব্যতিত সমগ্র বিশ্বজগত আনন্দে আত্মহারা হয়ে স্বাগতম জানিয়েছিল।যদি সারা বছর প্রতিদিনই মহানবীর জন্ম স্মরণ করা হয়,তথাপি রোজ কিয়ামত পর্যন্ত এর অপরিসীম গুরুত্বের বিন্দু পরিমাণও হ্রাস পাবে না। 
    অত্যাচার,পাপাচার,অনাচার ও নানা অনৈতিক কাজে পরিপূর্ণ এবং অন্ধকারে নিমজ্জিত এই পৃথিবীকে আলোকিত করে সত্যের ধর্ম এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও রাস্ট্র ব্যবস্হা প্রবর্তনের জন্যই মহান আল্লাহপাক ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের ১২ই রবিউল আউয়াল,সোমবার নবীজীকে পৃথিবীতে প্রেরণ করেন। সম্ভবত প্রায় ৬২ বৎসর বয়সে একাদশ হিজরির ১২ই রবিউল আউয়াল,সোমবার,       ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে তিনি পৃথিবী ছেড়ে  আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যান। তিনি স্বল্প জীবনকালের মধ্যে মানব জাতিকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম ও ন্যায়ভিত্তিক সুন্দর জীবন ব্যবস্হা উপহার দিয়েছেন। আল্লাহতালার দীক্ষা ও পবিত্র কোরআনের শিক্ষায় তিনি সমস্ত পৃথিবীকে আলোকিত করেছেন। হযরত মুহম্মদ(স.)এর উদারতা, মানবিকতা, সত্য ও ন্যায়ের প্রতি অবিচল আস্থা, ব্যক্তিত্ব ও কর্মতৎপরতা দেশ-কাল-সম্প্রদায় ও জাতি-ধর্মকে অতিক্রম করে বিশ্বমানবিকতার স্তরে উত্তীর্ণ হয়েছে। তিনি মানব জাতির জন্য নির্বিরোধ শান্তির এক জ্যোতির্ময় পথ প্রদর্শক। আধ্যাত্মিক ও জাগতিক উভয় জগতেই তিনি চূড়ান্ত সফলতা অর্জন করেছেন।তিনি হিংসা,বিদ্বেষ ও অহংকারকে পরিত্যাগ এবং সততা,
স্বচ্ছতা,ন্যায়নীতি,ন্যায় বিচার,ন্যায় পরায়নতাকে ধারন করেই অন্যায়,
অসুন্দর,পাপিষ্ঠ ও অত্যাচারীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। সকল প্রকার অনাচার,পাপাচার বিদূরিত করে মানব জাতির জন্য অসাধারণ রাস্ট্র ব্যবস্থার প্রবর্তন করেছেন। তিনি এমন একটি জাতির নেতৃত্ব দিয়েছেন যে জাতিটি পৃথিবীতে একটি শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।
     তিনি সর্বকালের সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মনীষী। নবুয়্যতের তেইশ বৎসরের প্রচেষ্টায় একটি অসভ্য, বর্বর আরব জাতিকে সভ্য ও সুশৃঙ্খল জাতিতে পরিণত করেছিলেন।উদ্দেশ্যের মহত্ত্ব,সাধ্যের স্বল্পতা এবং উল্লেখযোগ্য সফলতায় তিনি শ্রেষ্ঠতম। শুধু একখানি আসমানী কিতাব ছিল তাঁর সম্বল।উক্ত কিতাবের ভিত্তিতে তিনি সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে বর্ণ-গোত্র-সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকল মানুষকে ঐক্যবদ্ধ ও সুসংহত করেছেন।এই পবিত্র গ্রন্থটি একাধারে নৈসর্গিক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ,ঐতিহাসিক ঘটনাসমূহের পর্যালোচনা এবং মানব জীবনের সুষ্ঠু ও সঙ্গত নিয়ন্ত্রণের আদেশনামা।এই পবিত্র কিতাবটি মানবের আধার পথের ধ্রুবতারা।আল-কোরআন সৃষ্টির রহস্য উদঘাটনে এক উদাত্ত আহ্বানের বাণী,একটা চিরন্তন সৃষ্টিধর্মী প্রেরণা।নবীজীর জীবন পবিত্র কোরআনের এক অখন্ড ও নিরবচ্ছিন্ন বৈজ্ঞানিক ও আধ্যাত্মিক সাধনার ফল্গুধারার।
        কল্পকথা ভারাক্রান্ত প্রচলিত ধর্মতত্ত্বের ধ্বংসস্তূপের উপর দাঁড়িয়ে তিনি ঘোষণা করেছিলেন আল্লাহর একত্ববাদ।আল্লাহ এক, তাঁর কোন শরিক নেই। পৃথিবী,চন্দ্র,সূর্য,গ্রহ,
নক্ষত্র,সাগর-মহাসাগর,মানবজাতি,পশুপাখি সব কিছুই আল্লাহর সৃষ্টি,যা তাঁর মুখ দিয়ে ঘোষিত হওয়া মাত্রই জগতের সকল কুসংস্কার, বর্ণবাদ,  মূর্তিবাদ, মিথ্যার সমুদয় দুর্গ ধূলিসাৎ হয়ে যায়।তিনি আমূল পরিবর্তন ঘটিয়েছেন ধর্মের, মতবাদের ও বিশ্বাসের। এ জন্য 'ইসলাম' বিশ্বের সর্বশেষ ধর্ম হওয়া সত্বেও দ্রুত বিস্তার লাভকারী শ্রেষ্ঠতম ধর্মে পরিণত হয়।
    সকল  বিপথগামী মানবের বিরুদ্ধে মাত্র একজন মানুষ।সবসময় তিনি আল্লাহর উপর নির্ভরশীল ছিলেন।মহান আল্লাহপাক কখনো তাঁর বন্ধুকে পরিত্যাগ করেননি।তিনি ছিলেন আল্লাহর প্রেরিত রাসুল।জীবনের শেষ মুহুর্তেও তিনি নিজের এই পরিচয় ভুলে যাননি।নবীজীর হাতে একটি  মাত্র তলোয়ার ছিল যা হলো ক্ষমার, করুণার,বন্ধুত্ব ও মার্জনার।এ তলোয়ারই তাঁকে শত্রুদের উপর বিজয়ী করেছে, তাঁদের মনকে করেছে পরিশুদ্ধ। মহানবীর জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা,কোরআন ও সুন্নাহ আঁকড়ে ধরা,ফরজ ও ওয়াজিব আদায় করা,ইসলামের পাঁচস্তম্ব-
ইমান,নামাজ,রোজা,যাকাত ও হজ্জ যথাযথভাবে প্রতিপালন করা এবং দূর্নীতি,ঘুষ,মিথ্যা,লোভ- লালসা,   হিংসা,পাপাচার ও ধ্বংসাত্বক কার্যকলাপ সম্পূর্ণভাবে বর্জন করে একমাত্র ইসলামকে ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তির অনন্য পথ হিসেবে গণ্য করতে হবে।নবীজি যা যা করেছেন বা করতে বলেছেন,তা করতে হবে।যা করেননি বা করতে বারন করেছেন,তা বর্জন করতে হবে।তাহলেই নবীজির জন্ম ও ওফাত দিবসে আমাদের  আনন্দ-বেদনা উভয় সার্থক হবে।মহানবী(সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা ঈমানের পূর্বশর্ত।আর এই ভালোবাসা তাঁর নির্দেশ পালন ও অনুকরণের মধ্যেই প্রতিফলিত হতে হবে।আমাদের স্মরণ রাখতে হবে যে,
মহানবী(সা.) পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত উম্মতের কল্যাণে এবং গুনাহ মাফের জন্য মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নিকট কান্নাকাটি ও প্রার্থনায় নিমগ্ন ছিলেন।আজকের এই পবিত্র দিনে আমাদের একমাত্র করনীয় হবে নবীজির নির্দেশিত পথে ও ইসলামের অনুশাসনমালা মেনে চলার এবং ইসলামের  পাঁচ স্তম্ব যথাযথভাবে প্রতিপালনের অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়া।মহানবীর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও কোটি কোটি সালাম।
 (লেখক একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ও কলামিস্ট)।