-মোহাম্মদ আইয়ুব চৌধুরী-
বিপ্লব,গণঅভ্যুত্থান,সামরিক অভ্যূত্থান শব্দগুলো সকলের পরিচিত এবং এ সম্পর্কে কমবেশি সবাই মোটামুটি অবহিত।অতীতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে বিপ্লব,সামরিক অভ্যূত্থান,
গণঅভ্যূত্থান সংঘটিত হয়েছে।যারফলে অনেক শাসক,রাজা-বাদশা ক্ষমতা হারিয়েছেন। পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেই রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সংবিধান বা শাসনতন্ত্র রয়েছে।রাষ্ট্রপতি,প্রধানমন্ত্রী ও রাজা-বাদশাগণ(যে নামেই অভিহিত হোক) নিজ দেশের প্রচলিত শাসনতন্ত্রের ভিত্তিতে দেশ শাসন করেন।শাসনতন্ত্র বহাল থাকা অবস্থায় সংঘটিত বিপ্লবের কারনে অনেক শাসককে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বা গণঅভ্যূত্থানে জনরোষের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করতে দেখা গেছে।জনরোষ বা অন্য কোন কারনে কোন শাসক স্বেচ্ছায় ক্ষমতা হস্তান্তর করলে তখন সংবিধানের আলোকে বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়।যেমন- আমাদের দেশে ১৯৯০ সালে সাবেক
রাষ্ট্রপতি জনাব হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত গণঅভ্যূত্থানে তিনি সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় পদত্যাগ করে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিলেন।তখন তিনি জনরোষ থেকে বাঁচবার জন্য দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাননি।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যেমন-মোস্তফা কামাল পাশার নেতৃত্বে সংঘটিত সামরিক অভ্যূত্থানে অটোমান সাম্রাজ্যের পতন,জেনারেল নজিবের নেতৃত্বে সংঘটিত সামরিক অভ্যূত্থানে মিশরের রাজা ফারুক,ইরানে ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে সম্রাট রেজে শাহ পাহলভি,ইরাক,লিবিয়া,
আফগানিস্তান,শ্রীলঙ্কা,নেপালসহ অনেক দেশের অনেক শাসক ক্ষমতাচূত হয়ে মৃত্যুবরন করেন বা পালিয়ে ভিন্ন দেশে আশ্রয় গ্রহণ করেন।পরবর্তীতে শ্রীলঙ্কা ব্যতিত অন্যান্যরা কেউ ক্ষমতায় ফিরিয়ে আসতে দেখা যায়নি। প্রত্যেক দেশে শাসনতন্ত্র বা সংবিধান থাকলেও সংঘটিত গণবিপ্লব/অভ্যূত্থানের কারনে সংবিধান তাঁদেরকে সুরক্ষা দিতে পারেনি। এসব দেশে সংবিধান তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে অকার্যকর হয়ে যায়।অনেক দেশে বিপ্লব পরবর্তী সংবিধান সংশোধন,পরিমার্জন অথবা নতুনভাবে প্রণয়ন করতেও দেখা যায়।
গত ০৫ আগস্ট আমাদের দেশে ছাত্র- জনতার সংঘটিত গণঅভ্যূত্থানে তৎকালীন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে প্রতিবেশী দেশ ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেন।এখনও তিনি সেখানেই অবস্থান করছেন। তাঁর এই পদত্যাগ ছিল জনরোষ থেকে বাঁচবার জন্য দেশত্যাগ করা।কারন তিনি দেশে থাকলে জনতার হাতে নির্মম ও করুনভাবে আক্রমণের সম্মুখীন হতেন।সম্প্রতি তিনি দাবী করেন যে,তিনি পদত্যাগ করেননি এবং সাংবিধানিকভাবে এখনো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বহাল আছেন।উল্লেখ্য,সংবিধান অনুসারে মহামান্য রাষ্ট্রপতি হলেন প্রধানমন্ত্রী(সরকার প্রধান)-এর নিয়োগকর্তা।রাষ্ট্র প্রধান হিসেবে মহামান্য রাষ্ট্রপতি জাতির উদ্দেশ্যে প্রদত্ত ভাষনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ এবং পদত্যাগপত্রটি গ্রহণের বিষয়টি জনগণকে নিশ্চিত করেছেন।তিনি পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেই সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে গেজেট নোটিফিকেশন করেছেন।নিশ্চয় মহামান্য রাষ্ট্রপতি বিষয়টি নিশ্চিত হয়েই উক্তরুপ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন।কাজেই এ বিষয়ে বিতর্ক উত্থাপনের কোন সুযোগ নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি মহামান্য রাষ্ট্রপতির হাতে পদত্যাগপত্র দাখিল করতে হবে এ ধরণের কোন শর্ত বা বাধ্যবাদকতা সংবিধান বা রুলস অফ বিজনেস-এ উল্লেখ আছে মর্মে প্রতীয়মান হয় না। তিনি উহা রাষ্ট্রপতির বরাবরে যে কোনভাবে দাখিল করতে পারেন।তাছাড়া প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগপত্রটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ডকুমেন্টস।এটি জনসমক্ষে বা পত্রিকায় ছাপানোর কোন নিয়ম নেই। আমাদের সংবিধানে তত্বাবধায়ক বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কোন ব্যবস্থা না থাকায় প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ ও দেশত্যাগ করা এবং সংসদ ভেঙ্গে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট শূন্যতায় সরকার গঠণের বিষয়ে সম্ভবত মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের আপীল বিভাগের মতামত চাওয়া হয়।তদপ্রেক্ষিতে উক্ত বিভাগ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠণের পক্ষে মতামত প্রদান করে বলে জানা যায়।তদনুযায়ী মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বৈধতা লাভ করে।কাজেই এ সরকারকে অবৈধ বলার কিংবা দেশত্যাগের মাস খানেক পর মাননীয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী নিজেকে বৈধ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দাবী করার আইনগত আর কোন সুযোগ থাকে না।মাননীয় সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রেক্ষিতে প্রশ্ন আসতে পারে যে,তিনি মন্ত্রী সভার সাথে আলোচনা/পরামর্শ না করে কিংবা সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে দেশত্যাগ করলেন কেন?তিনি বলেছেন জনগণের জীবন রক্ষায় ফায়ার ওপেন চাননি।এতেই প্রমানিত হয় যে,তিনি জনরোষ থেকে বাঁচার জন্যই দেশ ও জনগণকে অরক্ষিত অবস্থায় রেখে দেশত্যাগ করেছেন। সংবিধান মোতাবেক পদত্যাগ না করে অনির্দিষ্টকালের জন্য তিনি দেশত্যাগ করতে পারেন না। জনগণের জানমাল রক্ষা এবং উদ্ভব পরিস্থিতি বিবেচনায় তিনি সময়মতো সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ক্ষমতা হস্তান্তরের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারতেন।কিন্তু তা না করে জানমালের অনেক ক্ষয়-ক্ষতির পর নিজেকে রক্ষার জন্য স্বেচ্ছায় দেশত্যাগ করে চলে যান।এ ক্ষেত্রে কি সংবিধান লঙ্ঘিত হয়নি?তাঁর দাম্ভিকতা ও সিদ্ধান্ত প্রদানে বিলম্ব জনিত কারনে সহস্রাধিক মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে এ দায়ভার থেকে তিনি কিভাবে মুক্ত থাকবেন।
(লেখক-একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ও কলামিস্ট)