অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্রের কতিপয় সেক্টর সংস্কারের জন্য ইতোমধ্যে কয়েকটি কমিশন গঠন করেছে।জনপ্রশাসন সংস্কারের জন্যও সাবেক সচিব জনাব আবদুল মুয়িদ চৌধুরী নেতৃত্বে গঠিত একটি কমিশন কাজ করছে।এটা একটা শুভ উদ্যোগ।আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দূর্নীতি ও অনিয়মে ভরে গেছে।নূন্যতম সেবা প্রাপ্তির জন্য জনগণকে দিনের পর দিন দপ্তরে দপ্তরে দৌড়াদৌড়ি করতে হয়।অফিস সহায়ক থেকে উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা পর্যন্ত দূর্নীতি ও অনিয়মে নিমজ্জিত।সরকারী দপ্তরসমূূহ এমন এক পর্যায়ে পৌছেছে যেখানে নিয়মের পরিবর্তে অনিয়মের রাজত্ব। সেখানে কর্মকর্তা-কর্মচারী রাজা, সেবাগ্রহীতা প্রজা। কার্যকর জবাবদিহিতা ও মনিটারিং ব্যবস্থার অভাবে সরকারের প্রতিটি সেক্টরে চরম দুর্দশা ও করুন অবস্থা বিরাজমান।
আমাদের দেশে 'প্রশাসন' শব্দটি ইতোমধ্যে কর্তৃত্ববাদী ও প্রতিপত্তিমূলক শব্দ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। প্রশাসন ক্যাডারের কিছু কর্মকর্তা 'প্রশাসন' শব্দটি ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দবোধ করেন। তাঁরা জনগণের প্রভু কিংবা প্রশাসক হিসেবে আচরণ করতে অভ্যস্ত। তাঁরা যে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী এটা অনেকের মনে থাকে না।একটি গণতান্ত্রিক দেশে কেবল গুটিকয়েক ক্যাডার সদস্য জনগণের উপর ছড়ি ঘুরাবে এটাতো কাম্য হতে পারে না। সাধারণ নাগরিকগণ সহকারী কমিশনার,ম্যাজিস্ট্রেট,উপজেলা নির্বাহী
অফিসার,জেলা প্রশাসক কিংবা উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তার ধারকাছেও যেতে সাহস পান না।তাছাড়া সব সেক্টরে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও খবরদারি করার প্রবনতাও লক্ষ্যণীয়।বিগত সরকারের সময়ে পদোন্নতির সুযোগ সৃষ্টির জন্য নিজস্ব অধিক্ষেত্রের বাইরে সংযুক্ত দপ্তর/অধিদপ্তর ও সংস্হার পদকে আপ গ্রেডের মাধ্যমে পদায়িত করে সংশ্লিষ্ট দপ্তর বা সংস্থার কর্মকর্তাদের সাথে বিদ্বেষ বা কলহ তৈরি করা হয়েছে।এতে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে চরম ক্ষোভ,হতাশা ও দলাদলি সৃষ্টি হয়ে স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হতে দেখা যায়। 'প্রশাসন' শব্দটি ব্যবহার করে নতুন নতুন বলয় সৃষ্টি হয়েছে।যেমন-জেলা প্রশাসন,উপজেলা প্রশাসন ইত্যাদি।উপসচিব থেকে সিনিয়র সচিবগণ "সরকারের সচিব" হিসেবে প্রকাশ করতে ভালোবাসেন। কিন্তু তাঁরা মন্ত্রণালয়ের বাইরেও একাধিক দপ্তরের বিভিন্ন পদে কাজ করে থাকেন। অপরদিকে অন্যান্য ক্যাডারের সদস্যগণ এ সুযোগ থেকে বঞ্চিত। বৈষম্য নিরসনের জন্য গণ অভ্যূত্থান হয়েছে।রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে বা সেক্টরে এসব বৈষম্য ও আন্ত:ক্যাডার বৈষম্য নিরসন করা আবশ্যক।রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও রাষ্ট্রীয় কার্যাদি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার স্বার্থে ন্যায্যতা অপরিহার্য। আমাদের মনে রাখতে হবে জনগণের কর-এর টাকায় লালিত প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী কখনোই জনগনের শাসক/প্রশাসক হতে পারেন না।এধরণের চিন্তা চেতনা মন থেকে মুছে ফেলে তাঁদেরকে জনগণের আদর্শ সেবক হিসেবে পরিচিত লাভ করতে হবে। তাঁরা যে কেবল জনগণের সেবার জন্যই নিয়োজিত এটা তাঁদেরকে মনে প্রাণে বাধ্যতামূলকভাবে ধারণ করতে হবে।সংবিধান অনুসারে প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ। জনগণের অভিপ্রায়কে সম্মান প্রদর্শন করতে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেবা গ্রহীতাকে মালিক হিসেবে গণ্য করে যথাযথ সম্মান প্রদর্শনসহ সর্বতোভাবে সার্বিক সহযোগিতা করাই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের অন্যতম দায়িত্ব।
জনপ্রশাসন সংস্কারের জন্য নিম্নবর্ণিত প্রস্তাবসমূহ বিবেচনা করা যেতে পারে:-
(১) 'বিসিএস(প্রশাসন)' ক্যাডারের নাম পরিবর্তন করে 'বিসিএস(জনসেবা বা মানবসেবা)' নামকরণ ;
(২) 'জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়'-এর নাম পরিবর্তন করে 'জনসেবা বা মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়' নামকরণ;
(৩) 'জেলা প্রশাসক' পদবী পরিবর্তন করে 'জেলা নির্বাহী কর্মকর্তা' নামকরণ;
(৪) 'জেলা প্রশাসন' পরিবর্তন করে 'জেলা জনসেবা কার্যালয়' নামকরণ ;
(৫) 'উপজেলা প্রশাসন' পরিবর্তন করে 'উপজেলা জনসেবা কার্যালয়' নামকরণ ;
(৬) সিনিয়র সচিব,সচিব,অতিরিক্ত সচিব,যুগ্ম সচিব,উপসচিব ইত্যাদি পদের কর্মকর্তাগণ নিজেদেরকে সরকারে সিনিয়র সচিব,সচিব,
অতিরিক্ত সচিব,যুগ্ম সচিব,উপসচিব হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন যা বন্ধ করে মন্ত্রণালয় বা বিভাগের সংশ্লিষ্ট পদের কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় প্রদান করা বান্চণীয়। কেননা প্রত্যেকে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। কোন ক্যাডার বা গোষ্ঠীকে বিশেষ সুবিধা প্রদান করা যৌক্তিক নয়;
(৭) আন্ত:ক্যাডার বৈষম্য নিরসন করে ন্যায্যতার ভিত্তিতে সকল ক্যাডার কর্মকর্তাদের জন্য সম সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করণ;
(৮) প্রশাসন,পুলিশ, পররাষ্ট্র ও কর ক্যাডার কর্মকর্তাগণ চাকরির নির্দিষ্ট সময়কাল শেষ করার পর পদোন্নতির সুযোগ পেয়ে থাকেন কিন্তু অন্যান্য ক্যাডারের সদস্যগণ এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
পদোন্নতির ক্ষেত্রে প্রত্যেক ক্যাডার সদস্যদের সম সুযোগ নিশ্চিত করণ;
(৯) জনসেবা ও জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করার মানসিকতা সৃষ্টি করতে হবে।এ লক্ষে সকল কর্মকর্তা/কর্মচারীকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদানের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে এবং
(১০) প্রত্যেক সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে সেবা প্রার্থীদের হয়রানি নিরসন,সেবার জন্য আগত সেবাগ্রহীতার সাথে সুআচরণ,যথাযথ মর্যাদা প্রদান নিশ্চিত করণ।প্রয়োজনে আইন প্রণয়ন করে এ ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে।
একটি সুন্দর ও বৈষম্যহীন আদর্শ রাষ্ট্র বিনির্মানের প্রতিটি ক্ষেত্রে জবাবদিহির ব্যবস্থা ও নিয়ম নীতি প্রতিষ্ঠিত হোক। হয়রানিমুক্ত নাগরিক সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করা হোক। রাষ্ট্র পরিচালনায় উপনিবেশিক ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে জবাবদিহিমূলক প্রশাসন ও পরিচালন ব্যবস্থা গড়ে উঠুক। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নিকট এটাই জনগণের প্রত্যাশা।
(লেখক-একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ও কলামিস্ট)
"জনপ্রশাসন সংস্কার ও কতিপয় প্রস্তাবনা"
-মোহাম্মদ আইয়ুব চৌধুরী-
লেখক-একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ও কলামিস্ট