বিগত স্বৈরাচারী সরকারের শাসনামলে পুলিশ ও প্রশাসন ক্যাডারকে অনেকেই পতিত সরকারের অন্যতম দোসর হিসেবে গণ্য করে।কেননা মাঠ প্রশাসন এবং আইন শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে উক্ত দু'টো ক্যাডারের কর্মকর্তাগণ দায়িত্ব পালন করেন।উল্লিখিত কর্মকর্তাদের সহায়তায় স্থানীয় সংসদ সদস্য নিজ নিজ সংসদীয় আসনে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন।তাঁরা দূর্নীতি,স্বজনপ্রীতি, চাঁদাবাজি,জমি দখল,মাদক ব্যবসা, সরকারি খাঁস জমি দখল, এলাকায় ব্যবসা বাণিজ্য ও স্কুল-কলেজ নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি কাজে মাঠ প্রশাসনকে ব্যবহার করেছেন।ব্যক্তিগত স্বার্থে নিজের পছন্দনীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান,পৌর চেয়ারম্যান ও উপজেলা চেয়ারম্যানকে অবৈধ ও অনৈতিক কাজে সম্পৃক্ত করেছেন। মূলতঃ সংসদ সদস্য ছিলেন তাঁর সংসদীয় আসনের সম্রাট। তাঁর অবৈধ ও বেআইনী কাজকর্মে বাঁধা দেওয়ার ক্ষমতা মাঠ প্রশাসনের ছিল না।
বরং তাঁরা প্রজাতন্রের কর্মচারী হওয়া সত্বেও স্থানীয় সংসদ সদস্য/মন্ত্রীর অবৈধ নির্দেশ পালনে তৎপর থাকতেন এবং হুকুম অবৈধ হলেও তামিল করতেন। এক্ষেত্রে জনগণের স্বার্থ ক্ষুন্ন হলেও তাঁরা কোন প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।এভাবে সংসদ সদস্যগণ বিগত পনের বছর প্রশাসনের সহযোগিতায় জনগণের উপর নির্মম অত্যাচার ও অপশাসন চালিয়েছেন।
প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীগণ ক্ষমতাসীন সরকারের দলীয় ভাবাদর্শে কাজ করার কারনে রাষ্ট্রের বিভিন্ন সেক্টরে সংস্কারের আবশ্যকতা দেখা দেয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার একাধিক সংস্কার কমিশন গঠন করে।এর ধারাবাহিকতায় সাবেক সচিব জনাব আবদুল মূয়িদ চৌধুরীর নেতৃত্বে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠিত হয়। ইতোমধ্যে কমিশনের কিছু প্রাথমিক সুপারিশ নিয়ে গত কয়েকদিন যাবত প্রশাসন ক্যাডার বনাম অন্যান্য ২৫ ক্যাডারের মধ্যে চরম দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে।মূলত উপসচিব পদে পদোন্নতির পদ্ধতি/কোটা নিয়ে এই কলহের সৃষ্টি। প্রশাসন ক্যাডারের দাবী সচিবালয়ের উপসচিব বা তদূর্ধ্ব পদসমূহের শতভাগ তাঁদেরকে দিতে হবে।অন্যান্য ক্যাডারও উক্ত পদ সমভাবে দাবী করছে। প্রশাসন ক্যাডারের দাবী মাঠ প্রশাসনের অভিজ্ঞতায় সরকারের নীতি নির্ধারণে তাঁদের বিকল্প নেই। কিন্তু বিদ্যমান পদ্ধতিতে ২৫% কোটায় অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তাগণ সচিবালয়ে সফলভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।তাঁদের কোন অযোগ্যতা বা ব্যর্থতার পরিসংখ্যান এ যাবত প্রশাসন ক্যাডার উত্থাপন করতে পারেনি।১৯৯২ সালের পূর্বে বিসিএস (সচিবালয়) নামে একটি ক্যাডার ছিল।এই ক্যাডারের কর্মকর্তাগণ শুধু সচিবালয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/বিভাগে দায়িত্ব পালন করতেন।সচিবালয় ক্যাডারভুক্ত কর্মকর্তাগণের পক্ষে মাঠ প্রশাসনে নিয়োজিত হওয়ার সুযোগ ছিল না।অন্যদিকে সচিবালয় ক্যাডারের কারনে প্রশাসন ক্যাডারভুক্ত কর্মকর্তাগণের পক্ষে সচিবালয়ে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করা সম্ভব হতো না।ফলে উক্ত দু'টো ক্যাডারের মধ্যে আন্ত: দ্বন্দ্ব ও বিদ্বেষ লেগেই থাকতো।এতে সচিবালয়ের কাজকর্মে অন্তরায় সৃষ্টি হলে তৎকালীন সরকার উল্লিখিত সচিবালয় ক্যাডারকে প্রশাসন ক্যাডারের সাথে একীভূত করে। যদিও সচিবালয় ক্যাডারের কর্মকর্তাগণ আইন,বিধি বিধান এবং সচিবালয়ের কাজে পারদর্শী ছিলেন। গত ০৫ আগস্টে সংঘটিত রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের পর প্রজাতন্ত্রের কিছু কর্মচারী,গোষ্ঠী ও বিভিন্ন সংগঠন দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ না করে স্বার্থ সিদ্ধির দাবী-দাওয়া আদায়ের আন্দোলনে লিপ্ত হয় যা এখনো বিদ্যমান। মত প্রকাশের স্বাধীনতায় সরকারের নমনীয়তার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন গোষ্ঠী নানা তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। বিগত স্বৈরাচারী সরকারকে টিকিয়ে রাখার পিছনে পুলিশ ও জনপ্রশাসন অগ্রণী ভুমিকা পালন করেছিল। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নৃশংসতার প্রতিবাদে ছাত্র জনতার আন্দেলনের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত সচিবালয় বা মাঠ প্রশাসনের কোন কর্মকর্তাকে রাস্তায় নেমে আসতে দেখা যায়নি।দেশের ভয়াবহ পরিস্থিতিতে অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা ব্যতীত অবসরপ্রাপ্ত বেসামরিক কর্মকর্তা এমনকি পদোন্নতি বঞ্চিত কর্মকর্তাগণও রাজপথে নেমে আসেনি।সামরিক বাহিনী সময়মতো হস্তক্ষেপ না করলে দেশে রক্তের বন্যা বয়ে যেতো,দেশ গৃহ যুদ্ধে ধাবিত হতো এবং সার্বভৌমত্ব ঝুঁকিপূর্ণ হতো।
স্বৈরাচারী সরকারের দলীয় কর্মীদের মতো প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা- কর্মচারীদের ভুমিকা ও আচরণ বন্ধ করার জন্যই সংস্কারের অপরিহার্যতা রয়েছে। সরকার গঠিত জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সভাপতিসহ বেশির ভাগ সদস্যই প্রশাসন ক্যাডারের সাবেক দক্ষ ও মেধাবী কর্মকর্তা।তাঁরা প্রত্যেকেই কর্মক্ষেত্রে সততা,নিষ্ঠা, কর্ম দক্ষতার জন্য সুপরিচিত। তাঁরা নিশ্চয় মেধা ও দীর্ঘদিনের কর্ম অভিজ্ঞতার আলোকে বাস্তবতার নিরিখে নিরপেক্ষভাবে কাজ করছেন।কমিশনের কতিপয় প্রাথমিক সুপারিশ নিয়ে ক্যাডারসমূহ বিক্ষুদ্ধ মনোভাব প্রকাশ করে অনেকেই ইতোমধ্যে সংস্কারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন । সরকার বা কমিশনের উচিত হবে রাষ্ট্রের আবশ্যকতা বিবেচনায় ন্যায্যতার স্বার্থে সকল পক্ষের স্বার্থ যৌক্তিকভাবে মূল্যায়নপূর্বক জনগনের সেবার বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে নিরপেক্ষভাবে প্রয়োজনীয় সংস্কার কাজ এগিয়ে নেওয়া।এখানে কোন ক্যাডারের পদোন্নতি বা কোটা নির্ধারণ মূখ্য বিষয় হতে পারে না।কিভাবে বা কোন্ পদ্ধতি অবলম্বন করলে ঘুষ,দূর্ণীতি,অনিয়ম বন্ধ হবে এবং হয়রানিমুক্ত নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা যাবে সেটা কমিশনের বিবেচনায় নেয়া সমীচীন হবে। সংস্কার হতে হবে জনগণের স্বার্থে,কোন গোষ্ঠীর পদোন্নতি সুবিধা ও আমলাতন্ত্রের ক্ষমতায়নের জন্য নয়।জনগণের করের টাকায় জনগণের জন্য শাসক বা প্রভু সৃষ্টির যৌক্তিকতা আছে বলে প্রতীয়মান হয় না।
(লেখক একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ও কলামিস্ট)