সরকারি বা বেসরকারি চাকরিতে পদোন্নতি অতি পরিচিত একটি শব্দ।পদোন্নতি হলো- নিয়োজিত পদ থেকে উচ্চতর পদে অধিষ্ঠিত হওয়া।
যদিও পদোন্নতিতে বড় ধরণের কোন আর্থিক সুবিধা থাকে না। এতে সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।মন,মানসিকতা উজ্জীবিত হয়। সকল কর্মকর্তা/কর্মচারীর পদোন্নতির স্বপ্ন থাকে।কর্মজীবনে প্রত্যেকের আশা, আকাঙ্খা ও লক্ষ্য থাকে পরবর্তী পদে পদোন্নতি। নানা প্রক্রিয়া ও আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্নের মাধ্যমে পদোন্নতি প্রদান করা হয়।আইনগতভাবে পদোন্নতিকে অধিকার হিসেবে দাবী করা যায় না।তবে উপযুক্ত বিবেচনায় এটিকে বৈধ প্রাপ্য হিসেবে প্রত্যাশা করা যায়। বিভিন্ন নিয়ম,পদ্ধতি অনুসরণ করে পদোন্নতি প্রদান করা হয়ে থাকে।পদোন্নতি প্রদানের অন্যতম শর্ত হলো চাকরি জ্যেষ্ঠতা, দক্ষতা,যোগ্যতা,অভিজ্ঞতা এবং সন্তোষজনক চাকরি রেকর্ডস।নির্ধারিত চাকরির মেয়াদ পূর্ণ হলেই পদোন্নতি পাওয়ার সুযোগ নেই।এর জন্য পদ খালি থাকতে হবে এবং পদোন্নতির সকল শর্ত পূরণ হতে হবে।পদোন্নতি প্রদানের সুপারিশ প্রণয়নের জন্য সকল মন্ত্রণালয়/বিভাগ/দপ্তরে বিভাগীয় নির্বাচন কমিটি এবং সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড রয়েছে।সরকার গঠিত বিভাগীয় নির্বাচন কমিটি প্রতিটি মন্ত্রণালয়/অধিদপ্তরের নিম্ন গ্রেডের পদে এবং উপ-সচিব বা তদূর্ধ্ব গ্রেডের পদে সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড প্রার্থী বাছাই করে সুপারিশ প্রদান করে।
১৯৯১ সালের পূর্ব পর্যন্ত উচ্চতর পদে পদোন্নতি প্রদানের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও শাসক দলের হস্তক্ষেপ ছিল খুবই সীমিত।ঐ সময়ে সকল বিধিগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই কেবল শূণ্য পদের বিপরীতে পদোন্নতি দেওয়া হতো।তখন অনুমোদিত পদের বাইরে পদোন্নতি প্রদানের কোন নজীর ছিল না এবং এব্যাপারে কখনো কোনো প্রশ্নও উত্থাপিত হয়নি।১৯৯১ সালের পর থেকে পদোন্নতি প্রদানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ শুরু হয় যা পরবর্তী পর্যায়ে ব্যাপক আকার ধারণ করে।পদোন্নতি প্রদানের ক্ষেত্রে ফিডার পদধারীর রাজনৈতিক পরিচয় যাচাই,তাঁর দলীয় আনুগত্য ও বিরোধী দলের সাথে কোনো সম্পৃক্তা আছে কিনা তা গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করার প্রক্রিয়া শুরু হয়।তাছাড়া পদ শূণ্য না থাকা,পদোন্নতির জন্য প্রযোজ্য শর্তাবলী পূরণ হয়েছে কিনা তা যাচাই না করা এবং জ্যােষ্ঠতা খর্ব করে দলীয় বিবেচনায় কনিষ্ঠদের পদোন্নতি প্রদানে প্রাধান্য দেখা যায়।এতে প্রশাসনে বিশৃঙ্খলা শুরু হয় এবং অসন্তোষ দেখা দেয় যা আজও বিরাজমান রয়েছে বলে অনেকে মনে করে।
বিগত কয়েক বছর যাবত দলীয় বিবেচনায় পদোন্নতি প্রদানের ব্যাপকতা বেড়ে যায়।পদ শূণ্য না থাকা সত্বেও উচ্চতর পদে সংখ্যাতিরিক্ত পদোন্নতি প্রদান করা হয়।পদোন্নতির জন্য কর্মকর্তাদের মধ্য অনাকাঙ্ক্ষিত দৌঁড়ঝাপ ও এক ধরনের অনৈতিক তদবির ও প্রতিযোগিতা শুরু হয়।এতে জ্যেষ্ঠ,দক্ষ, যোগ্য ও সৎ কর্মকর্তা পিছিয়ে পড়ে।ফলশ্রুতিতে প্রশাসনে মেধা শূণ্যতা ও যোগ্য কর্মকর্তার অভাব পরিলক্ষিত হয়।রাজনৈতিক ও অন্যান্য তদবিরে জোরে উচ্চতর পদে কনিষ্ঠতম কর্মকর্তা অধিষ্ঠিত হওয়ায় চেইন অব কমান্ড ভেঙ্গে যায়।তদুপরি এসব কর্মকর্তাদের মধ্যে আইন,বিধি-বিধানের উপেক্ষা ও জবাবদিহিতায় অবজ্ঞা প্রদর্শন করতে দেখা যায়।রাজনৈতিক খুঁটি শক্ত হওয়ার কারনে অনেকেই বেআইনি ও অবৈধ কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হয়ে দূর্নীতি ও জনস্বার্থ বিরোধী কাজেও জড়িত হয়ে পড়েন।বিএনপির শাসনামলে জ্যেষ্ঠতা তালিকাভুক্ত অনেককে "জয় বাংলার" সমর্থক হিসেবে আখ্যায়িত করে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করা হয়।অনুরূপভাবে আওয়ামী লীগের সূদীর্ঘ শাসনকালে শত শত কর্মকর্তাকে "রাজাকার" বা ভিন্ন মতাদর্শ গণ্য করে পদোন্নতির অধিকার হরণ করা হয়।এভাবে সৎ,যোগ্য,দক্ষ,অভিজ্ঞ ও মেধাবী কর্মকর্তাকে বৈধ প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত করে জনপ্রশাসনে ব্যাপক অনিয়ম ও দূর্নীতির মাধ্যমে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তুলতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়।কর্মজীবনের অভিজ্ঞতায় এসব অহরহ দেখার সুযোগ হয়েছে।অধিকন্তু অনুরূপভাবে বঞ্চিত অনেক সিনিয়র কর্মকর্তার সাথে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। একসাথে কাজ করেছি এমনএকজন কলিগ যিনি একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা,অত্যন্ত সৎ,ন্যায়-নিষ্ঠাবান কর্মকর্তা ছিলেন।তিনি দূ:খ করে আমাকে বলেছিলেন- "ভাই, মনে করেছিলাম স্বাধীনতার স্বপক্ষ শক্তি ক্ষমতায় এসেছে এবার পদোন্নতির ক্ষেত্রে ন্যায় বিচার নিশ্চিত হবে।কিন্তু এ সরকারের আমলেও পরপর দু'বার পদোন্নতি বঞ্চিত হলাম।এটার জন্য কোনো আপসোস নেই। কিন্তু এবার সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেলাম মুক্তিযোদ্ধা হওয়া সত্বেও পদোন্নতি তালিকায় নামের পাশে পেন্সিল দিয়ে 'আর' লেখা। তখন তাঁর দু-চোখ পানিতে টলটলায়মান"। অফসোস হয় একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাকে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করার জন্য "রাজাকার" করা হলো।এ অপমান সহ্য করতে না পেরে তিনি চাকরি থেকে অব্যাহতি নেওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। অতঃপর বিষয়টি তৎকালীন মন্ত্রীপরিষদ সচিব'কে অবহিত করলে পরবর্তীতে তাঁকে পদোন্নতি প্রদানের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।এভাবে দুষ্টচক্র সুপরিকল্পিতভাবে সৎ,নিষ্ঠাবান ও দক্ষ কর্মকর্তাকে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে প্রশাসনে অসৎ,অদক্ষ তৈলবাজ ও দূর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বলয় সৃষ্টি করে।যার ফলে রাষ্ট্রের প্রতিটি সেক্টর অনিয়ম ও দূর্নীতিতে নিমজ্জিত হয়।
আমাদের সংবিধান অনুসারে বাংলাদেশের যেকোন নাগরিকের যোগ্যতানুযায়ী প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ লাভের অধিকার রয়েছে। তদনুযায়ী নিয়োগ বিধিমালায় বর্ণিত শর্তানুসারে কোন বিদেশি নাগরিকের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ এবং ফৌজদারি অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত না হলে যোগ্যতার মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ প্রাপ্তিতে কোনো বাঁধা নেই। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত প্রার্থীর প্রাক-পরিচয় পুলিশ, এনএসআই,এসবি'র মাধ্যমে যাচাইপূর্বক তাদের প্রতিবেদনে বিরূপ মন্তব্য না থাকলে(সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রুজু না থাকলে এবং তার সম্পর্কিত তথ্যাদি সঠিক পাওয়া গেলে) চাকুরির নিয়োগপত্র প্রদান করা হয়।নিয়োগ পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রার্থীর এবং তার পরিবারের সদস্যদের রাজনৈতিক সংম্পৃক্তা বাঁধা হিসেবে গণ্য করার বিধিগত কোন সুযোগ নেই ।কারন দেশে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ না থাকায় যেকোন ছাত্র শিক্ষা জীবনে রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হতে পারেন।তবে চাকরিতে যোগদানের পর তিনি কোনো রাজনৈতিক কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত হবেন না।এটাই হলো আইনের বিধান।কোনো প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা মতাদর্শ ক্ষমতাসীন দলের বিপরীত হলে নিয়োগ আটকে দেওয়া হয়।আবার প্রতিটি পদোন্নতির পূর্বে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং তাঁর পরিবার পরিজন,পিতা-মাতা,ভাই-বোন,শশুর-
শাশুড়ী,চাচা-চাচী,মামা-মামী সকলের রাজনৈতিক মতাদর্শ গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে যাচাইয়ের রীতি চালু করা হয়েছে যাতে গোয়েন্দা প্রতিবেদনের দোহাই দিয়ে পদোন্নতি বঞ্চিত করা যায়।পদোন্নতির জন্য এধরণের ভেরিফিকেশন করার বিধান সংবিধান ও নিয়োগ বিধিমালায় নেই। সঙ্গত কারনে প্রথম চাকরিতে যোগদানের পর পরবর্তীতে আলোচ্য ভেরিফিকেশনের আবশ্যকতা ও যৌক্তিকতা দেখা যায় না। কোনো কর্মকর্তার গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বিরুপ মন্তব্যের কারনে পদোন্নতি দেওয়া না হলে তাঁকে চাকরিতে বহাল রাখাও যৌক্তিক হতে পারে না।গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় ভিন্ন মত থাকবেই।কোন কর্মকর্তা ক্ষমতাসীন দলের মতাদর্শী নাও হতে পারে সেজন্য তাঁকে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করা ন্যায় সম্মত নয়।দেশে গণতন্ত্র থাকলে ভিন্ন মত থাকবেই।ভিন্ন মতাদর্শ গণতন্ত্রের পূর্ব শর্ত।কাজেই ভিন্ন মত না থাকলে গণতন্ত্র টেকসই হতে পারে না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার পরিবারের কেউ বা আত্মীয় স্বজন বিরোধী বা অন্য কোন দলের অনুসারী হলে তাঁদের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে বৈধ অধিকার থেকে বঞ্চিত করা এটাও গুরুতর অন্যায় ও অযৌক্তিক। স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, সকল কর্মচারী সরকারি দলের অনুসারী হলে দেশে স্বৈরশাসনের সুযোগ সৃষ্টি হবে যা ইতোমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। নিরপেক্ষ ও সুশাসনের স্বার্থে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীকে দলীয় দৃষ্টি কোনে মূল্যায়ন করা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।
আমলারা অনেক বুদ্ধিমান। তাঁরা সহজেই পরিবর্তিত পরিস্থিতি সামলিয়ে নতুন সরকারের সাথে দ্রুত সুসম্পর্ক স্থাপন করতে পারে। প্রশাসনে তাঁদের ভুমিকা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। মন্ত্রীগণ আইন,বিধি,বিধানে তত দক্ষ নন।ফলে তাঁদেরকে আমলা নির্ভর হতে হয় এবং আমলার প্রদত্ত প্রস্তাবে দ্বিমত পোষন করার কোনো সুযোগ থাকে না। মূলত: সরকারের নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে আমলারাই মূখ্য ভুমিকা পালন করেন।কাজেই জনস্বার্থ বিবেচনায় সঠিক ও যৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে দক্ষ, অভিজ্ঞ,সৎ কর্মকর্তার আবশ্যকতা একান্ত অপরিহার্য।
রাজনৈতিক সরকারের শাসনামলে অনেক সৎ,মেধাবী,দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে নানা কৌশলে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।যার পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ে মেধা শূণ্যতা বিরাজ করছে। সকালে প্রদত্ত সিদ্ধান্ত বিকেলে রহিত হচ্ছে এগুলো সুশাসনের জন্য শুভ নয়। জনগণ প্রত্যাশা করে সদাসয় সরকার প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করণে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ এবং রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা যাচাইয়ের নামে প্রচলিত অযৌক্তিক রীতি বাতিলের বিষয়টি বিবেচনা করবে।প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাদের দলাদলি ও রেষারেষি পরিহার করে জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করতে হবে। তাহলেই সুশৃঙ্খল প্রশাসনিক পরিবেশ গড়ে উঠবে।
(লেখক:একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা)।