ন্যায্যতা বাক স্বাধীনতা,আইনের শাসন ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা কায়েমের জন্য গত বছরের ০৫ আগস্টে সংঘটিত হয় এক অভূতপূর্ব গণ-অভ্যূত্থান ।ঐদিন স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য ছাত্রছাত্রী ও জনগণ সকল বাঁধা বিপত্তি অতিক্রম করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নেমে আসে।তারা নানা অত্যাচার,নির্যাতন, নিপীড়ন সহ্য করে এবং বুকের তাজা রক্ত দিয়ে স্বৈরাচারের অবসান ঘটায়। আন্দোলনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে বৈষম্যের অবসান ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করা।দীর্ঘদিনের স্বেচ্ছাচারিতা ও স্বৈরতন্ত্রের জন্য দেশের মানুষ বাক স্বাধীনতা ও সাংবিধানিক অধিকার হারিয়ে ফেলেছিল।হৃত অধিকার  ফিরিয়ে পাওয়ার আন্দোলনে জনগনের অংশগ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। 
        সাধারণত যে কোন দেশে গণ-অভ্যুত্থানের পর আইন শৃঙ্খলাসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা বিরাজ করে।ছাত্র, নাগরিক সমাজ এবং গণকর্মচারী সকলের আন্তরিক প্রচেষ্টায় সকল প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে কাঙ্খিত লক্ষে পৌঁছতে হয়।আমাদের দেশে সংঘটিত গণ-অভ্যুত্থানের পরপরই দেশের শান্তি শৃংখলা ফিরিয়ে আনতে আমাদের ছাত্রসমাজ অগ্রণী ভুমিকা পালন করেছে। স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে রাস্তায় যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, চুরি,ডাকাতি, সন্ত্রাসী কর্মকান্ড প্রতিরোধ ও নাগরিকদের জানমাল রক্ষায় তাদের ভুমিকা ছিল অনস্বীকার্য।তবে এখনো পর্যন্ত অনেক সেক্টরে কাঙ্খিত শৃঙ্খলা ফিরে আসেনি এবং আশানুরূপ উন্নতিও হয়নি।সরকার পরিবর্তনের পরপরই কতিপয়  স্বার্থান্বেষী মহল অযৌক্তিক দাবী-দাওয়া উত্থাপনপূর্বক রাজপথে অবস্থান ও ঘেরাও কর্মসূচি দিয়ে সাধারণ মানুষকে হতবাক ও বিস্মিত করেছে।আমরা জাতি হিসেবে পুরোপুরি সুবিধাবাদী তা ইতোমধ্যে কাজকর্মের মাধ্যমে প্রমাণ করেছি।একটি অস্থায়ী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের সাথে সাথে চাকরি স্থায়ী করণ,পদোন্নতি,  অন্যান্য সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি, কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রুপান্তরের মতো অন্যায় ও অযৌক্তিক দাবীতে রাস্তা অবরোধ করে সরকারকে বিব্রত করা,জনগণের চলাচল ও স্বাভাবিক কাজকর্ম  ব্যাহত করার অপচেষ্টা  চালানো ইত্যাদি। বিভিন্ন পক্ষ থেকে এখনো নিত্য নতুন দাবী উত্থাপিত হচ্ছে । দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত সমস্যা রাতারাতি সমাধান করা সম্ভব নয়।এর জন্য প্রয়োজন ধৈর্য ও সহনশীলতা। যে কোনো দাবী দাওয়া যথাযথ নিয়মে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট পেশ করা যেতে পারে।এতে রাস্তা অবরোধ ও জন দুর্ভোগ সৃষ্টি করা কিছুতেই  সমর্থনযোগ্য নয়।
        জুলাই বিপ্লবের সময়ে গুলি করে পাখির মতো মানুষ মারা শুরু হলে তখন ছাত্র সমাজের পক্ষ থেকে   সরকারি কর্মচারীদেরকে রাজপথে নেমে আসার  আহ্বান করা হয়েছিল।কিন্তু কোনো কর্মকর্তা /কর্মচারীকে সরকারের পক্ষ ত্যাগ করে রাস্তায় নেমে আসতে দেখা যায়নি।বিধিগত বাঁধা থাকায় সরকারি কর্মচারী কোনো রাজনৈতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে পারে না।কিন্তু সরকার পতনের পরপরই অচলাবস্থা নিরসনে ভুমিকা না রেখে  নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য বিভিন্ন দাবী দাওয়া উত্থাপন করতে দেখা যায়।চাকরি শৃঙ্খলার পরিপন্থীমূলক এসব কাজে যারা জড়িত ছিল তাদের বিরুদ্ধে  কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত ছিল।কিছু কিছু  দাবী দাওয়া মেনে নেওয়ার কারনে অন্যান্যরাও দাবী আদায়ে উজ্জীবিত হয়।এতে সরকারের উপর নিদারুণ চাপ সৃষ্টি অব্যাহত থাকে।সম্প্রতি দেখা গেল কয়েকটি কলেজের ছাত্র তাদের কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণা করার জন্য আন্দোলনে নেমেছে। কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণার পিছনে কি যুক্তি কাজ করছে তা বোধগম্য নয়।এরুপ চলতে থাকলে নিত্য নতুন আবদার ও দাবী উত্থাপিত হতে থাকবে এবং সরকারকে শুধু দাবী মিটানোর কাজে ব্যস্ত থাকতে হবে।
       জনগণের বাক স্বাধীনতা ও ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনার লক্ষে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বিগত পনের বছর আন্দোলন করে চরম নির্যাতন,নিপীড়ন,গুম,খুনের শিকার হতে  হয়েছে।তাদের হাজার হাজার নেতা কর্মীকে কারাগারে অন্তরীণ রাখা হয়েছিল। সকল বিরোধী দল ও ছাত্রদের যৌথ আন্দোলনে মুখে স্বৈরাচার পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পরপরই মাঠ দখলের চিরাচরিত দৃশ্য জাতি অবলোকন করেছে।বিভিন্ন স্থানে পূর্বের মতো চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চলমান রয়েছে যা কখনোই কাম্য ছিল না।অবশ্য রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তাদের কিছু কিছু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করায় পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হয় এবং মানুষ এটাকে সাধুবাদ জ্ঞাপন করে।যাদেরকে আন্দোলনের সময় মাঠে দেখা যায়নি তারাই সরকার পতনের সাথে সাথে মাঠ দখলের খেলায় মেতে উঠে।ক্ষমতাচ্যূত রাজনৈতিক দলের অনেক সুবিধাভোগী কথিত নেতা-কর্মী রাতারাতি মতাদর্শ ও দল পরিবর্তনের মাধ্যমে পূর্বের ন্যায় দখলদারিত্ব,চাঁদাবাজি  ও নিয়ম বহির্ভূত কাজকর্ম চালাতে থাকে।পাড়া মহল্লায় নেতারা সভা করে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠিন বক্তব্য রাখলেও বাস্তবে তেমন কোন পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়নি।সত্যিকারের ত্যাগী নেতা-কর্মীর লক্ষ্য থাকে জনসেবা বা জনকল্যাণ। তাঁরা কখনো সমাজ বিরোধী ও শৃঙ্খলা পরিপন্থীমূলক কার্যক্রমে লিপ্ত হতে পারেন না।    
    পাড়া,মহল্লা,গ্রাম,ইউনিয়ন,উপজেলা ভিত্তিক শান্তি শৃংখলা রক্ষা কমিটি গঠন করে নিজ নিজ এলাকায় চাঁদা ও সমাজ বিরোধী কাজ নিয়ন্ত্রণে কঠোরতা অবলম্বন করলে দলীয় চাঁদাবাজি বন্ধ করা সহজেই সম্ভব।কিছু কিছু নেতা কর্মীর ধারণা তারা ক্ষমতায় চলে এসেছে।তাদের এসব কর্মকান্ড দলের ভাবমূর্তিকে দারুনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং দলকে জনগণের নিকট প্রশ্নের সম্মুখীন করছে। সাধারণ নাগরিকদের মনে প্রশ্ন আসতে পারে পরিস্থিতির পরিবর্তন নাহলে আগে খারাপ কি ছিল?আগামীতে জনগণ নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগ করার সুযোগ পেলে এসব বিষয় নিশ্চয় মূল্যায়ন করবে।অতীতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী যেভাবে আচরণ ও পেশি শক্তি প্রদর্শন করেছে বর্তমানেও কতিপয় রাজনৈতিক দলের কিছু নেতা কর্মী অনুরূপভাবে তা অনুসরণ করছে।এতে জনগণের কাছে তাদের চরিত্রগত কোন পার্থক্য পরিলক্ষিত হচ্ছে না।জনগণের আস্থা অর্জন করতে হলে নেতা-কর্মীকে জনগণের কাছেই যেতে হবে এবং জনগণের পাশেই দাঁড়াতে  হবে।চাঁদাবাজি ও শৃঙ্খলা  পরিপন্থীমূলক কাজকর্ম থেকে অবশ্যই সরে আসতে হবে।দলের নাম ভাঙ্গিয়ে যারা এসব কাজকর্মে জড়িত  
হয়ে দলের সুনাম ক্ষুন্ন করছে, দলের উচিত হবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।গুটিকয়েক ব্যক্তির দলীয় শৃঙ্খলার পরিপন্থীমূলক কাজকর্মের দায়ভার দলের নিকট গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
     সরকারি দায়িত্বে থাকাকালীন অনেকে ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করে থাকেন।বিশেষ করে সরকারি গাড়ির অপব্যবহার।কর্মকালীন অনেক সৎ,নিষ্ঠাবান কর্মকর্তাকে দেখেছি যাঁরা ঘুষ,দূর্নীতি ও অনিয়মের ধারে কাছেও ছিলেন না কিন্তু দপ্তরের একাধিক গাড়ি ব্যবহার করতেন। সম্প্রতি মিডিয়ার মাধ্যমে জানা যায় যে, সরকারের উচ্চ পর্যায়ের অনেকেই একাধিক গাড়ি ব্যবহার করছেন।খবরটা সঠিক হলে উহা প্রচলিত বিধি বিধানের পরিপন্থী। সততা,স্বচ্ছতা ও নিয়মের মধ্যে থাকতে হলে অবশ্যই বৈধ প্রাপ্য ব্যতীত অতিরিক্ত কিছুই ব্যবহার বা ভোগ করা অনুচিত। চাকরি জীবনের প্রথমার্ধে একজন সাবেক সিএসএস কর্মকর্তার সাথে দীর্ঘ দিন কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী,সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তা। অফিসের কাগজ,কলম ইত্যাদি কোন আইটেম বাসার কাজে ব্যবহার করতেন না।সরকারি অর্থে আপ্যায়নের সুবিধাও গ্রহণ করতেন না। নিজের জন্য বরাদ্দকৃত গাড়ি ব্যতীত কখনো অন্য কোনো গাড়ি ব্যবহার করতে দেখিনি।তিনি সব সময় বলতেন এগুলো বায়তুল মাল।আমরা রক্ষক, ভক্ষক হতে পারি না।বহু গুনের অধিকারী এই মেধাবী কর্মকর্তার কাছ থেকে দাপ্তরিক কাজকর্ম ছাড়াও অনেক কিছু শিখেছি যা আমার সমগ্র কর্মজীবনকে প্রভাবিত করেছে।বিগত সরকার অনিয়ম ও দূর্নীতির জন্য জনরোষের শিকার হয়েছে। বর্তমান সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কোন ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধেও অনুরূপ কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হোক সেটা কিছুতেই কাম্য নয়।।দূর্নীতি,অনিয়ম রোধ ও ন্যায্যতার জন্য ছাত্র জনতা রক্ত দিয়েছে।তাদের রক্তের ঋণ শোধ করতে হলে অবশ্যই সকল অনিয়ম,দূর্নীতি ও অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। ছাত্র,জনতার প্রত্যাশা দেশে থেকে সকল অনিয়ম ও দুর্নীতি দূর হোক,বাক স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হোক,প্রতিটি ক্ষেত্রে ন্যায্যতা,ন্যায় বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক।
       অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতা দেশ ও জাতির জন্য খুবই ক্ষতিকর। সহিষ্ণুতার অভাবে লক্ষ্য অর্জনে  প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হওয়া অমূলক নয়। এ মুহুর্তে প্রয়োজন ধৈর্য্য ও সহনশীলতা। ঈপ্সিত লক্ষে পৌঁছতে হলে ধৈর্য্যের বিকল্প নেই। মব সন্ত্রাস অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।যে প্রত্যাশায় ছেলে মেয়েরা রক্ত দিয়েছে সে প্রত্যাশা পূরণ না হলে তাদের রক্তের ঋণ শোধ হবে না। আবশ্যকীয় সংস্কার কাজ শেষ করে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় ফিরে যেতে হবে।জনগণের অধিকার,  বাক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতেই হবে। যে কোনো বিশৃঙ্খলা এবং অরাজকতা দেশ ও জাতির জন্য মঙ্গলজনক নয়। আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে অবশ্যই সকলকে একযোগে কাজ করতে হবে।তাহলেই জুলাই বিপ্লবে আত্মাহুতি দেওয়া শহীদদের রক্ত বৃথা যাবে না।
(লেখক: অব: সরকারি কর্মকর্তা)।