আমাদের দেশে জাতীয় দিবসগুলো মন্ত্রীপরিষদ বিভাগের প্রদত্ত নির্দেশনা অনুসারে রাষ্ট্রীয়ভাবে উপজেলা থেকে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত  নানা অনুষ্ঠানদি পালনের  মাধ্যমে উদযাপন করা হয়ে থাকে।এসব অনুষ্ঠান উদযাপনের জন্য সরকার কর্তৃক প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ প্রদান করা হয়।মাঠ পর্যায়ের সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের অর্থ বরাদ্দের স্বল্পতা ও আর্থিক সংকটের অজুহাত দেখিয়ে 'সহায়তার' নামে চাঁদা উঠানোর প্রবনতা দেখা যায়। বিশেষ করে উন্নয়ন প্রকল্পের কাজে নিয়োজিত  ঠিকাদার, পরিবহন মালিক সমিতি, জেলা/উপজেলার বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সংগঠন,শিল্প কারখানা থেকে চাঁদা উঠানোর প্রবনতা বিদ্যমান।পাশাপাশি বেসরকারি  সংস্থা/সংগঠনসমূহও অনুরূপভাবে চাঁদাবাজি করে থাকে।
    সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে কিছু দিন কাজ করেছি। ঐ সময়ে স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের জন্য উপজেলা নির্বাহী অফিসারের স্বাক্ষরযুক্ত পত্রের মাধ্যমে 'সহায়তা' চাওয়া হয়।ইউএনও সাহেবের কাছে কি ধরণের সহায়তা জানতে চাইলে বলেন আলোচ্য দিবসের অনুষ্ঠানাদি জাঁকজমকভাবে উদযাপন করে উর্ধতন কর্তৃপক্ষ ও জনসাধারণের নিকট দৃশ্যমান করতে হবে কিন্তু প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান নেই ।তাই এমপি সাহেবের নির্দেশেই "সহায়তা" অর্থ্যাৎ আর্থিক সহায়তা চাওয়া হয়েছে।তাহলে কত দিতে  হবে জানতে চাইলে বলেন অন্ততঃ দশ হাজার,বড় প্রতিষ্ঠান হিসেবে আপনারা আরো বেশি দেবেন।সংশ্লিষ্ট এলাকায় বড়-ছোট শতাধিক শিল্প- কারখানা  রয়েছে।এভাবে একেকটি দিবসকে উপলক্ষ করে অর্ধ কোটি টাকার নিরব বাণিজ্য হয়ে থাকে। একইভাবে পৌরসভার পক্ষ থেকেও অনুরূপভাবে সহায়তার নামে চাঁদা চাওয়া হয়। আর্থিক বিধানাবলীতে সরকারের সিদ্ধান্ত ব্যতীত জনগণের কাছ থেকে একটি টাকাও আদায় করার কোন নিয়ম নেই। আর্থিক বিধি-বিধান অনুযায়ী  জনগণের নিকট থেকে আদায়কৃত যে কোনো অর্থ  সরাসরি সরকারি কোষাগারে জমা করতে হয় এবং খরচ করতে হলে সরকারি আদেশের প্রয়োজন হয়।বিভিন্ন দিবসকে কেন্দ্র করে  জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান আয়োজনের অজুহাতে "সহায়তার" নামে চাঁদাবাজির মাধ্যমে এভাবে অনৈতিক কাজে লিপ্ত হওয়ার যৌক্তিকতা আছে কিনা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভেবে দেখার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে আলোচ্য প্রবনতা কিছুটা কমে এসেছে। অনেক বছর পূর্ব থেকেই কেবলমাত্র ডি,সি অফিসে একটি ফান্ড পরিচালিত হয়ে আসছে। সম্ভবত এটি "এল আর ফান্ড" নামে পরিচিত। জেলার বিভিন্ন উৎস থেকে এ ফান্ডে অর্থ জমা হয়।জমাকৃত অর্থ থেকে আপত্কালিন ব্যয়,দুস্থ ও সুবিধা বঞ্চিত মানুষকে সহায়তা, জরুরি প্রয়োজন মিটানোর ব্যয় এবং উর্ধতন কর্তৃপক্ষের পরিদর্শন ও রাষ্ট্রাচারের ব্যয় ইত্যাদি মিটানো হয়।জানা যায় যে, এ ফান্ডের অর্থের উৎস ও ব্যয় সংক্রান্ত বিষয়াদি নিরীক্ষা বিভাগের মাধ্যমে নিরীক্ষণ করা হয় না।সম্ভবত এ ফান্ডের অর্থ সরকারের বরাদ্দকৃত অর্থ  না হওয়ায় অডিট বিভাগের আওতায় নিরীক্ষণযোগ্য নয়। তারপরও এ ফান্ড নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে। অনেকেই মনে করেন এ ফান্ডে টাকার উৎসের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ব্যবস্থা নেই। বিশেষ করে জেলার সকল ভুমি অফিস ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ  সংগ্রহ করা হয়ে থাকে যা পরোক্ষভাবে জনগণের উপর বর্তায়।অর্থের উৎস ও খরচের স্বচ্ছতা নিয়ে এ ব্যাপারে অতীতে গণমাধ্যমে একাধিকবার প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এ ফান্ডের অর্থের উৎসের স্বচ্ছতা ও খরচের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং অনৈতিকভাবে অর্থ সংগ্রহ বন্ধ করা আবশ্যক।
       বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে বিশেষ করে পবিত্র ঈদুল ফিতর ও আযহার সময়েও থানা পুলিশ,শিল্প পুলিশ, পৌরসভা,ইউনিয়ন পরিষদ এবং ক্ষমতাসীন দলের নানা সংগঠনের পক্ষ থেকে  নিরব চাঁদাবাজি হয়ে থাকে। এসব অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব যাঁদের উপর ন্যস্ত, তাঁরা নিজেরাই এ কাজে লিপ্ত হলে অন্যান্যরাও ঢালাওভাবে লিপ্ত হবে এটাই স্বাভাবিক। সমাজ বা রাষ্ট্র থেকে দূর্ণীতি, অনিয়ম, অনাচার দূর করতে হলে প্রতিটি সেক্টরকে দূর্নীতিমুক্ত করতে হবে।সর্বস্তরে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হলে অনেক অনিয়ম দূর হবে।সরকারি চাকরির  নিয়োগ কার্যক্রমে টাকার লেনদেন, স্বজনপ্রীতি ও তদবির বন্ধ করে শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হলে চাকরি প্রার্থীগণের পক্ষে নিরপেক্ষভাবে মেধাভিত্তিক চাকরি  লাভ করা সম্ভব হবে। এতে দূর্নীতি ও অনিয়মের মাত্রা অনেকাংশ হ্রাস পাবে।কোনো প্রার্থী টাকার বিনিময়ে চাকরি লাভ করলে পরবর্তীতে চাকরিতে যোগদানের পর দূর্নীতির মাধ্যমে উক্ত অর্থ উপার্জনে সচেষ্ট থাকে।এতে সংশ্লিষ্ট কর্মচারী অর্থ লিপ্সু হয়ে নৈতিক অধ:পতনের মাধ্যমে সমগ্র চাকরি জীবনে দূর্নীতি ও অনিয়মে লিপ্ত হয়।এভাবে প্রতিটি সরকারি সেক্টর দূর্নীতিতে নিমজ্জিত হচ্ছে।দূর্নীতি দেশের উন্নয়নও নাগরিক সেবাকে বাঁধা গ্রস্ত করছে।ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর মাত্র কয়েকদিন ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেলেও এখন আবারো পূর্ব অবস্থা ফিরে এসেছে। সম্প্রতি টি আই বি'র প্রতিবেদনেও এটাই প্রমাণিত হয়।সরকারি কর্মচারীদের নিকট থেকে সংগ্রহকৃত সম্পদের হিসাব নথি বন্ধী করে ফেলে না রেখে যথাযথভাবে যাচাই বাছাই করা অত্যাবশ্যক। কর্মচারীগণ সঠিক হিসাব বা তথ্যাদি প্রদান করেছে কিনা কিংবা জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ আছে কিনা তা যাচাই করে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে তাঁরা দূর্নীতিতে আরো বেশি উজ্জীবিত হবে। এ বিষয়ে দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গের মাধ্যমে যথা-সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে দূদক,কর বিভাগ,সিআইডি -এর প্রতিনিধির সমন্বয়ে কমিটি গঠণপূর্বক যাচাইয়ের কাজ সম্পন্ন করা যেতে পারে। একটি  সুষ্ঠু ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন কায়েমের জন্য সকল অনিয়ম অবশ্যই দূর করার আবশ্যকতা রয়েছে।দেশের উম্নয়ন ও অগ্রগতি এবং হয়রানিমুক্ত নাগরিক সেবা নিশ্চিতকরনের লক্ষে দূর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ ব্যতীত বিকল্প কোনো পথ খোলা আছে মর্মে প্রতীয়মান হয় না। 
(লেখক অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা)