ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মালিক,দাদন ব্যবসায়ী,অর্থ বিনিয়োগকারীকে আমরা কথায় কথায় সুদখোর হিসেবে আখ্যায়িত করি।কিন্তু নিজেদের অবস্থান একবারও চিন্তা করি না।ইসলামের দৃষ্টিতে ব্যবসা ব্যতীত বিনা শ্রমে ঋণ বা বিনিয়োগের বিপরীতে লোকসানের ঝুঁকি গ্রহণ ব্যতিরেকে মাসিক/বার্ষিক নির্ধারিত হারে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করাই সুদ যা মুসলমানদের জন্য সম্পূর্ণ হারাম।ব্যাংকে আমানত থাকলে,কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অর্থ লগ্নি করলে, সঞ্চয়পত্র, এফডিআর,ভবিষ্য তহবিল ইত্যাদিতে বিনিয়োগের বিনিময়ে নির্ধারিত হারে প্রাপ্ত অতিরিক্ত অর্থ সুদ/মুনাফা হিসেবে গ্রহণ করা হয়।আজকাল সিংহভাগ মানুষের ব্যাংকে হিসাব রয়েছে।হিসাবধারীর হিসাবে জমাকৃত অর্থের উপর ব্যাংক কর্তৃক নির্দিষ্ট হারে সুদ প্রদান করা হয়।অনেকেই বলে থাকেন প্রাপ্ত সুদের টাকা গরীব মানুষকে দান হিসেবে দিয়ে দেন।আল্লাহ পাক হালাল আয়ের অর্থ থেকে দান করতে বলেছেন।গৃহীত সুদের অর্থ হারাম।কাজেই নিজ নামের হিসাবে জমাকৃত সুদের টাকা দান করলে উহা যথাযথ দান হিসেবে গণ্য হবে কিনা এ ব্যাপারে প্রশ্ন থেকে যায়।
       ভবিষ্য তহবিল আইন ও বিধিমালা (জিপিএফ ও সিপিএফ) অনুসারে বিধিমালার আওতাভুক্ত প্রত্যেক কর্মচারীকে মূল বেতনের নির্ধারিত হারে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ উক্ত তহবিলে বাধ্যতামূলকভাবে চাঁদা প্রদান করতে হয়।সরকার বা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ  উক্ত জমাকৃত অর্থের উপর স্লাব ভিত্তিক বার্ষিক ১১,১২ ও১৩% হারে মুনাফা দিয়ে থাকে।এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় যে,মুসলমানদের জন্য সুদ হারাম হওয়ায় তদানিন্তন ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক প্রণীত আইনে মুসলিমদের জন্য একটি অপশন রাখা হয়।কোনো মুসলিম কর্মচারী ভবিষ্য তহবিলে তাঁর জমাকৃত অর্থের উপর সুদ গ্রহণ করতে ইচ্ছুক না হলে তিনি তা সংশ্লিষ্ট হিসাব রক্ষণ অফিসকে লিখিতভাবে অবহিত করবেন।আমি কর্মজীবনে অনেক কর্মকর্তা/কর্মচারীকে দেখেছি তাঁরা উক্তরুপভাবে জমাকৃত অর্থের উপর সুদ/মুনাফা গ্রহণ না করে কেবল মূল অর্থ গ্রহণ করেছেন।স্বাধীনতার পর সরকার বিষয়টি পর্যালোচনাপূর্বক আলোচ্য তহবিলে জমাকৃত অর্থের উপর নিরূপিত "সুদ"কে "মুনাফা" হিসেবে গণ্য করে পরিপত্র জারী করে।যার পরিপ্রেক্ষিতে অনেকেই ভবিষ্য তহবিলে জমাকৃত অর্থের উপর প্রদত্ত অতিরিক্ত অর্থ  মুনাফা হিসেবে গ্রহণ করছেন আবার অনেকই পূর্ব সিদ্ধান্তে অটুট থাকছেন।তাঁদের ব্যাখ্যা হলো সরকার আইন করে "সুদকে" "মুনাফা " হিসেবে গণ্য করলেও ইসলামের দৃষ্টিতে উহা সুদ হিসেবেই বিবেচিত হবে।কারন এতে শ্রমের সম্পৃক্ততা এবং লোকসানের কোনো ঝুঁকি নেই। অনুরূপভাবে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকৃত অর্থের বিপরীত নির্ধারিত হারে পরিশোধিত অতিরিক্ত অর্থকে পূর্বে সুদ বলা হলেও বর্তমানে মুনাফা হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে।কর্মজীবন শেষে অনেকেই আনুতোষিক বাবদ প্রাপ্ত অর্থ সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে সংসারের ব্যয় নির্বাহ করে থাকেন।আবার অনেক পরিবার সন্চয়পত্রের আয়ের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল।যদিও এক্ষেত্রেও সুদ এবং মুনাফাকে নিয়ে যথেষ্ট  বিতর্ক বিদ্যমান রয়েছে।
    উপরোক্ত অবস্থার প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে দেখা যায় দেশের সিংহভাগ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কম/বেশি সুদের সাথে সম্পৃক্ত। কারন ব্যাংকে হিসাব থাকলে,ভবিষ্য তহবিলে চাঁদা প্রদান করলে,এফডিআর বা কোনো প্রোডাক্টে অর্থ বিনিয়োগ করলে,আর্থিক প্রতিষ্ঠান কিংবা দাদন ব্যবসায়ীর সাথে লেনদেন করলে কোনো না কোনোভাবে সুদের প্রশ্ন আসবে এটাই স্বাভাবিক। সুদের এক টাকা খাওয়া বা হাজার টাকা খাওয়া সমান পাপ।
     আমাদের দেশে  তালিকাভুক্ত বাংকের সংখ্যা ৬২টি।তন্মধ্যে  বেসরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকের সংখ্যা ৪৪টি।অ-তালিকাভুক্ত (বিশেষ আইনবলে প্রতিষ্ঠিত) ব্যাংকের সংখ্যা ০৫টি। বেসরকারি  ব্যাংকগুলোর মালিক/উদ্যোক্তা দেশের সনামধন্য শীর্ষ  ব্যবসায়ী/শিল্পপতিগণ।অ-তালিকাভুক্ত  ব্যাংকসমূহের মধ্যে গ্রামীন ব্যাংক একটি বিশেষায়িত ব্যাংক যার সিংহভাগ মালিকানা দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ভাগ্য উন্নয়নের লক্ষে এ ব্যাংকটি মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড.মুহাম্মদ ইউনুস কর্তৃক  প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।ব্যাংকটি হত দরিদ্র ও সুবিধা বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জীবন যাত্রার মান উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখার জন্য ইতিপূর্বে নোবেল পুরস্কার লাভ করে।মাননীয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী এবং দলীয় নেতা-কর্মীগণ ইচ্ছাকৃতভাবে উক্ত ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড.মুহাম্মদ ইউনুস মহোদয়কে কথায় কথায় সুদখোর  আখ্যায়িত করে অপবাদ দিয়ে থাকেন।তিনি কখনো এর জন্য কোনো প্রকার বিরূপ মন্তব্য/বক্তব্য বা অভিব্যক্তি প্রকাশ করেননি।তবে দেশের ৪৪টি বেসরকারি  ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা/মালিককে কখনো সুদখোর বলতে শোনা যায়নি।এমনকি বেসরকারি ব্যাংকসমূহের মালিকগণ মাননীয় সাবেক প্রধানমন্ত্রীর খুবই আস্থাভাজন ছিলেন।বেসরকারি ব্যাংক মালিক সমিতির সদস্যগণ সর্বদাই সাবেক প্রধানমন্ত্রীর তৈল মর্দনেও ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে।কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকে জনগণের জমাকৃত আমানতের অর্থ মালিক কর্তৃক কথিত ঋণের নামে তুলে নেওয়ায় সংশ্লিষ্ট  ব্যাংকগুলো দেউলিয়ার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে।অথচ তাঁদেরকে মাননীয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বা তাঁর সমর্থনকারীরা কখনো সুদখোর বা ব্যাংক খাদক বলে আখ্যায়িত করেননি।উপরন্তু জনগণের আমানত আত্মসাৎকারীর বিরুদ্ধে কেনো আইনী পদক্ষেপও গ্রহণ করা হয়নি।ভূতপূর্ব সরকারের আমলে কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকের আমানত খাদক হিসেবে পরিচিত একটি শীর্ষ ব্যবসায়ী গ্রুপের বিরুদ্ধে মামলা হলে, সেটার কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।আলোচ্য ক্ষেত্রে  নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ ব্যাংক নির্বাক দর্শকের ভুমিকা পালন করেছিল।
       এখনো অনেকেই বিদ্বেষপ্রসূত মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা  প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনুস মহোদয়কে সুদখোর আখ্যায়িত করে অপবাদ দিয়ে যাচ্ছেন। যাঁরা উনাকে সুদখোর বলছেন তাঁরা কি কখনো চিন্তা করে দেখেছেন নিজেরা কোনো না কোনোভাবে সুদের সাথে সম্পৃক্ত। নিজে সুদখোর হয়ে অন্যকে সুদখোরের অপবাদ দেওয়া স্ববিরোধিতার সামিল নয় কি?শুধুমাত্র হিংসায় বশবর্তী হয়ে একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন,বরণীয় ও সম্মানিত  ব্যক্তিকে এধরনের অপবাদ দিয়ে  নিজেদের অবস্থানকে বিতর্কিত করা  যুক্তিযুক্ত হতে পারে না।  
( লেখক একজন প্রাবন্ধিক)