চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের আওতাধীন পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত (সি-বিচ) সংলগ্ন দক্ষিণ পাশে অস্থায়ী দোকান বরাদ্দে ব্যাপক অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব অনিয়মের সঙ্গে খোদ জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের একটি প্রভাবশালী চক্র জড়িত, যারা আবেদনকারীদের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে এক লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ আদায় করছে।

‘সকালের চট্টগ্রাম’-এর হাতে আসা একাধিক আবেদনপত্র ও সংশ্লিষ্ট নথি বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট একই ফরম্যাটে ভিন্ন ভিন্ন নাম ব্যবহার করে দোকান বরাদ্দ পাওয়ার জন্য দীর্ঘদিন ধরে তদবির চালিয়ে আসছে।

নথি অনুযায়ী, গত ১৭ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসক বরাবর দোকান বরাদ্দের আবেদন করেন ফারছি আহমেদের দুই পুত্র মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন ও মো. মহিউদ্দিন, মরহুম নুরুল ইসলামের পুত্র রেজাউল করিম, মো. সাইফুল ইসলামের স্ত্রী রুজি আক্তার, ফয়েজ উল্লাহর পুত্র মো. ইসমাইল এবং মো. ইসমাইলের পুত্র মো. সাইফুল ইসলাম। এসব আবেদনে তৎকালীন জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমের স্বাক্ষরও দেখা গেছে।

আবেদনগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রায় হুবহু একই ভাষায় প্রত্যেক আবেদনকারী দাবি করেছেন তারা দীর্ঘদিন ধরে পতেঙ্গা সি-বিচ এলাকায় খাবার ও পানির দোকান পরিচালনা করতেন এবং ২০১৮ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিনা নোটিশে উচ্ছেদের শিকার হন।

আবেদনে আরও বলা হয়, আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত না থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে প্রায় অর্ধশত মামলা দেওয়া হয় যা তাদের ভাষায় ছিল “হয়রানিমূলক”।

তবে স্থানীয় সূত্র ও নথি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কেউ একটি, কেউ তিনটি করে দোকানের মালিকানা দাবি করলেও বাস্তবে দোকান পরিচালনা ও মালিকানার বিষয়ে অসঙ্গতি রয়েছে, যা পুরো বিষয়টিকে সন্দেহজনক করে তুলেছে। আবার কেউ কেউ একই পরিবারের সদস্য ও স্বজন বলেও দেখা যায়।

এ বিষয়ে আবেদনকারী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনের সঙ্গে এই প্রতিবেদক আরেক আবেদনকারী সেজে যোগাযোগ করলে তিনি ৫০ হাজার টাকা দিয়ে দোকান বরাদ্দ নিচ্ছেন বলে স্বীকার করেছেন। তার আরেক ছোট ভাই সব দেখাশোনা করছেন। তার বক্তব্য ঘিরে বিষয়টি আরও গুরুতর রূপ নিয়েছে।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের রাজস্ব বিভাগে যোগাযোগ করা হলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা সকালের চট্টগ্রামকে জানান, “পতেঙ্গা এলাকায় অস্থায়ী দোকান বরাদ্দের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ঘুষ লেনদেনের সুযোগ নেই। নির্ধারিত কমিটির মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করে বরাদ্দ দেওয়া হবে। যদি কেউ ঘুষ নেওয়ার প্রমাণ দেয়, তাহলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তবে একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, “একই ঠিকানা ও ভাষায় একাধিক আবেদন এলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।”

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের সকল অবৈধ দোকান আমরা শিগগিরই উচ্ছেদে যাব। এর আগেও আমরা বেশ কয়েকবার উচ্ছেদ ও মৌখিক সতর্ক করে এসেছি। ডিসি অফিস থেকে যদি অনিয়মের মাধ্যমে বরাদ্দ দেওয়া হয়, প্রমাণ পেলে আমরাও প্রতিবাদ করবো।

আইনজ্ঞদের মতে, সরকারি সম্পত্তি বা জায়গা বরাদ্দে ঘুষ গ্রহণ ও দেওয়া উভয়ই দণ্ডবিধি ও দুর্নীতি দমন কমিশন আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা ও ফৌজদারি মামলার সুযোগ রয়েছে।

এত গুরুতর অভিযোগ ওঠার পরও জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা না আসায় সচেতন মহল প্রশ্ন তুলেছে পতেঙ্গা সি-বিচ কি সিন্ডিকেট ও ঘুষ বাণিজ্যের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে?

দুর্নীতি দমন কমিশনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে এ বিষয়টি নিয়ে কথা হলে তিনি বলেন, “সরকারি জায়গা বা সম্পদ বরাদ্দে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। লিখিত অভিযোগ ও প্রাথমিক প্রমাণ পেলে দুদক নিজ উদ্যোগেও অনুসন্ধান শুরু করতে পারে।”

তিনি বলেন, “যদি প্রমাণিত হয় যে কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী দোকান বরাদ্দের বিনিময়ে অর্থ গ্রহণ করেছে, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন অনুযায়ী মামলা ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

এ বিষয়ে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম  বলেন, “পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের মতো পর্যটন এলাকায় খাবারের দোকান পরিচালনার ক্ষেত্রে জনস্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যথাযথ অনুমোদন ছাড়া এবং স্বাস্থ্যবিধি না মেনে কোনো দোকান পরিচালনার সুযোগ নেই।”

তিনি আরও বলেন, “যদি অনিয়মের মাধ্যমে দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়ে থাকে এবং সেখানে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত না হয়, তাহলে স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান চালানো হবে এবং প্রয়োজনে লাইসেন্স বাতিলসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”