বর্তমান সমাজে দাম্পত্য সম্পর্কের ভেতরে একটি নীরব সংকট ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে পরকীয়া। একসময় এটি ছিল লজ্জা ও গোপনীয়তার বিষয়, কিন্তু এখন সামাজিক বাস্তবতার আলোচনায় এটি ক্রমেই সামনে আসছে। নানা সামাজিক পরিবর্তন, কর্মব্যস্ততা, ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং পারিবারিক সম্পর্কের অবহেলা সব মিলিয়ে দাম্পত্য সম্পর্কে এমন এক শূন্যতার জন্ম দিচ্ছে, যা অনেক সময় মানুষকে অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়তে প্রলুব্ধ করছে।
এই সমস্যার জন্য সাধারণত একপক্ষকে দোষারোপ করার প্রবণতা দেখা যায়। কেউ বলেন পুরুষদের কারণেই পরকীয়া বাড়ছে, আবার কেউ মনে করেন আধুনিক নারীর জীবনধারা এই পরিস্থিতির জন্ম দিচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো দাম্পত্য সম্পর্কে যখন পারস্পরিক বোঝাপড়া, সময় ও আবেগের ঘাটতি তৈরি হয়, তখনই সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ে। আর সেই দুর্বলতার সুযোগেই তৃতীয় কারও প্রবেশ সহজ হয়ে যায়।
আধুনিক সময়ে নারীরা আগের তুলনায় অনেক বেশি স্বাধীন ও আত্মনির্ভর। তারা নিজেদের ক্যারিয়ার গড়ছেন, ব্যক্তিগত উন্নতির জন্য কাজ করছেন এবং নিজের শারীরিক সৌন্দর্য ও ব্যক্তিত্বের যত্ন নিচ্ছেন। এটি নিঃসন্দেহে সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, এই ব্যস্ততার ভিড়ে দাম্পত্য সম্পর্কের জন্য সময় কমে যায়। স্বামীর আবেগ, চাহিদা বা আগ্রহকে অনেক সময় গুরুত্ব দেওয়া হয় না এমন অভিযোগ অনেক পুরুষই করেন।
অন্যদিকে পুরুষদের জীবনেও একই চিত্র দেখা যায়। আধুনিক সমাজে সফলতা অর্জনের প্রতিযোগিতা পুরুষদের ওপরও ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে। তারা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কর্মক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ব্যয় করেন, আর্থিক স্থিতিশীলতা অর্জনের চেষ্টা করেন এবং সামাজিক অবস্থান শক্ত করতে ব্যস্ত থাকেন। এই ব্যস্ততার কারণে অনেক সময় তারা স্ত্রীর মানসিক চাহিদা বা অনুভূতির দিকে পর্যাপ্ত মনোযোগ দিতে পারেন না।
এই পারস্পরিক অবহেলা ধীরে ধীরে সম্পর্কের ভেতরে দূরত্ব তৈরি করে। যখন একজন মানুষ অনুভব করেন যে তার অনুভূতি, আগ্রহ বা ভালোবাসা তার জীবনসঙ্গীর কাছে গুরুত্ব পাচ্ছে না, তখন তার ভেতরে এক ধরনের একাকিত্ব জন্ম নেয়। আর মানুষ স্বভাবতই সেই একাকিত্ব দূর করার জন্য এমন কাউকে খোঁজে, যে তাকে বুঝবে, শুনবে এবং গুরুত্ব দেবে।
এই প্রেক্ষাপটে কর্মক্ষেত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বর্তমানে নারী ও পুরুষ একসঙ্গে দীর্ঘ সময় কাজ করেন। একসঙ্গে কাজ করতে করতে ব্যক্তিগত সমস্যা বা অনুভূতির কথাও অনেক সময় ভাগাভাগি হয়। ধীরে ধীরে সেই সম্পর্ক বন্ধুত্বের সীমা অতিক্রম করে আবেগঘন সম্পর্কে রূপ নিতে পারে। শুরুটা হয় সহমর্মিতা থেকে, কিন্তু পরে তা অন্য দিকে মোড় নিতে পারে।
এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও সম্পর্কের গতিপথ বদলে দিয়েছে। পুরনো বন্ধু, সহপাঠী বা পরিচিতদের সঙ্গে সহজেই যোগাযোগ করা যায়। অনেক সময় সেই যোগাযোগ আবার নতুন আবেগের জন্ম দেয়। ফলে বাস্তব জীবনের দূরত্ব ডিজিটাল জগতে অন্য এক ঘনিষ্ঠতায় রূপ নিতে পারে।
তবে এই বাস্তবতার মধ্যে একটি বিষয় স্পষ্ট পরকীয়া কখনোই হঠাৎ করে শুরু হয় না। এটি সাধারণত দীর্ঘদিনের অসন্তোষ, অবহেলা এবং মানসিক দূরত্বের ফল। যখন স্বামী–স্ত্রী একে অপরের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেন না, একে অপরের অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করেন না, তখন সম্পর্কের ভেতরে ধীরে ধীরে ফাটল তৈরি হয়।
দাম্পত্য সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক সম্মান, বিশ্বাস এবং সময়। একজন মানুষ যতই ব্যস্ত থাকুন না কেন, তার প্রিয় মানুষের জন্য কিছু সময় রাখা অত্যন্ত জরুরি। কারণ সম্পর্ক শুধু দায়িত্বের বিষয় নয়; এটি আবেগ ও বন্ধুত্বের একটি দীর্ঘ যাত্রা।
অনেক সময় দেখা যায়, স্বামী–স্ত্রী একসঙ্গে বসে নিজেদের সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করেন না। তারা মনে করেন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমস্যা নিজে থেকেই মিটে যাবে। কিন্তু বাস্তবে সমস্যা জমতে জমতে একসময় বড় সংকটে পরিণত হয়। তাই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে নিয়মিত যোগাযোগ এবং একে অপরকে বোঝার চেষ্টা অপরিহার্য।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পারস্পরিক আগ্রহকে মূল্য দেওয়া। একজন মানুষের পছন্দ, স্বপ্ন, কষ্ট বা উদ্বেগ এই বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিলে সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়। কিন্তু যখন কেউ অনুভব করেন যে তার কথা কেউ শুনছে না বা তার অনুভূতির কোনো মূল্য নেই, তখন তিনি মানসিকভাবে দূরে সরে যেতে শুরু করেন।
পরকীয়ার প্রভাব শুধু দাম্পত্য সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি পুরো পরিবারের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে সন্তানদের মানসিক বিকাশে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই এই সমস্যাকে শুধু নৈতিকতার দৃষ্টিতে না দেখে সামাজিক ও মানসিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
সমাজে সুস্থ পারিবারিক পরিবেশ বজায় রাখতে হলে দাম্পত্য সম্পর্ককে গুরুত্ব দিতে হবে। স্বামী–স্ত্রী উভয়েরই উচিত একে অপরের প্রতি সহমর্মী হওয়া, সময় দেওয়া এবং সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেওয়া। কারণ একটি সুখী পরিবারই একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি।
শেষ পর্যন্ত বলা যায়, পরকীয়ার সমস্যা কেবল ব্যক্তিগত দুর্বলতার ফল নয়; বরং এটি অনেক সময় আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, মানসিক দূরত্ব এবং সম্পর্কের অবহেলার প্রতিফলন। যদি স্বামী–স্ত্রী দুজনেই নিজেদের সম্পর্কের প্রতি সচেতন হন, একে অপরের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেন এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রাখেন, তাহলে অনেক সমস্যাই এড়ানো সম্ভব। তখন দাম্পত্য জীবন আবারও হয়ে উঠতে পারে আস্থা, ভালোবাসা এবং নিরাপত্তার এক দৃঢ় আশ্রয়।
লেখক; সংবাদকর্মী, কলামিস্ট ও সমাজকর্মী