রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য পাচার ও মিথ্যাচারের অভিযোগ, বিতর্কে রেক্টর সলিমুল্লাহ বাহার
রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য পাচার, মিথ্যাচার, দায়িত্বে অবহেলা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো গুরুতর অভিযোগে বিতর্কে জড়িয়েছেন বাংলাদেশ রেলওয়ে ট্রেনিং একাডেমির রেক্টর সলিমুল্লাহ বাহার। বিভিন্ন সময়ে জারি হওয়া রেলওয়ের অফিস আদেশ ও নোটিশে তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ উঠে এসেছে এবং এসব ঘটনায় তাকে বারবার কৈফিয়তও তলব করা হয়েছে।
রেলওয়ের নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৪ মার্চ থেকে তিনি চট্টগ্রামের হালিশহর রেলওয়ে ট্রেনিং একাডেমির রেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তার কর্মকাণ্ড নিয়ে বিভিন্ন অফিস আদেশ ও নোটিশে অসন্তোষের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, তিনি নিয়মিত একাডেমিতে অবস্থান করেন না এবং নিজের ইচ্ছামতো ট্রেনিং একাডেমিতে যাতায়াত করেন। এমনকি হেডকোয়ার্টারেও তার উপস্থিতি নিয়মিত নয়।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিবের চট্টগ্রাম সফর ও বিভিন্ন মতবিনিময় সভাতেও তাকে অনুপস্থিত থাকতে দেখা গেছে বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
গোপন বৈঠক ও রাষ্ট্রীয় তথ্য পাচারের অভিযোগ
একই নোটিশে আরও গুরুতর অভিযোগ তুলে বলা হয়, দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে সলিমুল্লাহ বাহার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে চক্রান্তমূলক বৈঠক করছেন। ঢাকা থেকে প্রায়ই সংবাদকর্মীদের আমন্ত্রণ জানিয়ে বিভিন্ন ধরনের মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য সরবরাহ করা হচ্ছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
নথিতে বলা হয়, এর আগে তিনি রেলভবনে প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এমএন্ডসিপি) পদে কর্মরত থাকাকালেও বিভিন্ন মিডিয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে গোপন বৈঠক করতেন। ওই সময় প্রকল্পসংক্রান্ত তথ্য ও রাষ্ট্রীয় গোপন নথি বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার কাছে পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে।
জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (NSI) এ বিষয়ে তদন্ত করে এবং তার নিয়ন্ত্রণাধীন এক কর্মচারী সুনব বড়ুয়াকে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসহ আটক করে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনায় সলিমুল্লাহ বাহারের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও তোলা হয়েছে।
কক্সবাজারে অবস্থান করে মিথ্যাচারের অভিযোগ
২০২৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর জারি করা আরেকটি নোটিশে বলা হয়, তিনি ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন এবং অনুমতি ছাড়াই কর্মদিবসে কর্মস্থল ত্যাগ করেন।
রেক্টর কার্যালয়ে খোঁজ নেওয়ার পর তার সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, তিনি দোহাজারীতে সঞ্জীবনী কোর্সে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের কর্মচারীদের সঙ্গে অবস্থান করছেন।
কিন্তু ভিডিও কলে দেখা যায়, তিনি একটি টি-শার্ট পরে কক্সবাজারের কলাতলী এলাকায় অবস্থান করছেন। পরে জানা যায়, তিনি কক্সবাজারে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের রেস্ট হাউস “ফ্যালকন”-এ অবস্থান করছিলেন।
অন্যদিকে ওই সময় সঞ্জীবনী কোর্সের অংশগ্রহণকারীরা রাঙ্গামাটিতে অবস্থান করছিলেন। ভিডিও কলে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এমএন্ডসিপি) ও অন্যান্য কর্মকর্তারা তার এই মিথ্যাচার প্রত্যক্ষ করেছেন বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
নোটিশে আরও বলা হয়, সৈয়দপুর সফরের ঘটনায় এর আগেও তাকে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছিল, তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি তার জবাব দাখিল করেননি।
অনুমতি ছাড়া সফর
২০২৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর জারি করা এক নোটিশে বলা হয়, সলিমুল্লাহ বাহার একই বছরের ৩০ আগস্ট থেকে ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই সৈয়দপুরে অবস্থান করেন। প্রবেশনার কর্মকর্তাদের ওয়ার্কশপ ট্রেনিং কার্যক্রম তদারকির কথা বলে তিনি দুইজন কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে বিমানযোগে এই সফর করেন।
কর্তৃপক্ষের মতে, এই সফরের কোনো প্রয়োজন ছিল না এবং ভ্রমণের আগে তিনি কোনো ধরনের অনুমতিও নেননি।
এখতিয়ার বহির্ভূত প্রশিক্ষণের আয়োজন
২০২৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর জারি করা আরেক নোটিশে অভিযোগ করা হয়, একটি বিচারাধীন মামলার সূত্র উল্লেখ করে সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূতভাবে ডিপার্টমেন্টাল কোটায় পরিবহন ও বাণিজ্যিক বিভাগের বিভিন্ন পদ থেকে ৪০ জনকে গার্ডশিপ মৌলিক প্রশিক্ষণে পাঠানোর জন্য তিনি সিসিএম (পূর্ব ও পশ্চিম) এবং সিওপিএস (পূর্ব ও পশ্চিম) বরাবর পত্র পাঠান।
এর ভিত্তিতে ২০২৬ সালের ১২ জানুয়ারি থেকে প্রশিক্ষণের আয়োজনও করা হয়।
কর্তৃপক্ষের দাবি, ওই মামলায় সচিব, রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং মহাপরিচালকসহ রেলওয়ের পাঁচজন কর্মকর্তাকে বিবাদী করা হলেও রেক্টরকে পক্ষভুক্ত করা হয়নি এবং এ বিষয়ে তাকে কোনো নির্দেশনাও দেওয়া হয়নি।
এছাড়া তার পাঠানো পত্রে ৫০ শতাংশ ডিপার্টমেন্টাল কোটা এবং ১৯৮৫ সালের নিয়োগবিধির উল্লেখ করা হয়, যদিও ওই বিধিমালা আদালত আগেই বাতিল করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ে নিয়োগ বিধিমালা-২০২০ কার্যকর রয়েছে, যেখানে ডিপার্টমেন্টাল কোটায় ২০ শতাংশ পদ সংরক্ষিত ছিল এবং তা ইতোমধ্যে পূরণ হয়েছে।
নতুন মামলার ঝুঁকি ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা
নোটিশে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলে গার্ড-২ পদে পদোন্নতির জন্য জ্যেষ্ঠতার তালিকা থেকে ৬৩ জনকে পদোন্নতি দেওয়ার পর ২৬ জন জ্যেষ্ঠ কর্মচারী ক্ষুব্ধ হয়ে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করেন। মামলার নম্বর ১৩৬/২০২৫ এবং এটি বর্তমানে বিচারাধীন।
কর্তৃপক্ষের মতে, নতুন করে গার্ডশিপ প্রশিক্ষণের আয়োজনের ফলে বিষয়টি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। এসব কর্মকাণ্ডকে সম্পূর্ণ এখতিয়ার বহির্ভূত এবং ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, এতে প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে।
কৈফিয়তের জবাব ‘গ্রহণযোগ্য নয়’
২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর জারি করা আরেক নোটিশে জানানো হয়, কৈফিয়ত তলবের প্রেক্ষিতে সলিমুল্লাহ বাহার যে জবাব দিয়েছেন তা গ্রহণযোগ্য নয়।
কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ইচ্ছামতো কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন এবং বিনা অনুমতিতে ও বিনা প্রয়োজনে সরকারি অর্থ ব্যয় করে ভ্রমণ করেছেন। সৈয়দপুর ও কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানায় প্রশিক্ষণার্থীদের সঙ্গে বিমান ভ্রমণের ক্ষেত্রেও পূর্বানুমতি নেননি।
নোটিশে বলা হয়, ওই ধরনের সফরের কোনো প্রয়োজন ছিল না। কারণ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কর্তৃপক্ষই প্রশিক্ষণ দেওয়ার এখতিয়ার রাখেন এবং রেক্টরের এ বিষয়ে কোনো অভিজ্ঞতা বা দক্ষতা নেই।
এছাড়া ফিল্ড ট্রেনিং পরিদর্শনের নামে দুই কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে বিমান ভ্রমণের ব্যাখ্যাও গ্রহণযোগ্য নয় বলে নোটিশে জানানো হয়।
কর্তৃপক্ষ আরও জানায়, বিভিন্ন মিডিয়ার সঙ্গে চক্রান্তমূলক বৈঠক এবং প্রকল্পসংক্রান্ত তথ্য ও রাষ্ট্রীয় গোপন নথি পাচারের অভিযোগের সন্তোষজনক জবাব তিনি দিতে পারেননি।
এ ধরনের কর্মকাণ্ড সরকারি গোপন আইন ১৯২৩ (Official Secrets Act 1923) এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া তার কৈফিয়তের জবাবে ব্যবহৃত ভাষা অসম্মানজনক, অশোভন ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ বলে মন্তব্য করা হয়েছে, যা সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ২০১৮ এর পরিপন্থী।
পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ২২ জানুয়ারি ‘গোপনীয়’ হিসেবে জারি করা আরেকটি নোটিশেও একই অভিযোগ পুনরায় উল্লেখ করে তাকে সাত দিনের মধ্যে ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
রেলওয়ের একাধিক নথিতে ধারাবাহিকভাবে উত্থাপিত এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে সলিমুল্লাহ বাহারের বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ২০১৮ অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে বাংলাদেশ রেলওয়ে ট্রেনিং একাডেমির রেক্টর সলিমুল্লাহ বাহারের মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা ও হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।