“নিম্ন মধ্যবিত্ত” শ্রেণিটি সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। তারা না পারে খোলাখুলিভাবে সাহায্য চাইতে, না পারে নিজের অভাব প্রকাশ করতে। অথচ তাদের কষ্ট অনেক সময় দরিদ্র মানুষের চেয়েও বেশি। তাই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। শুধু পরিচিত দরিদ্রদের নয়, বরং নীরবে কষ্ট করা মানুষগুলোর প্রতিও আমাদের নজর দিতে হবে।
নতুন পোশাকের উল্লাসে হারিয়ে যায় কারও না পাওয়া গল্প। ঈদের বাজার জমজমাট, শূন্য অনেক ঘরের হাঁড়ি।দায়িত্ববোধের আয়নায় আমাদের সমাজ।
ঈদ একটি আনন্দের নাম, ভ্রাতৃত্বের প্রতীক, ভাগাভাগি আর সহমর্মিতার এক অপূর্ব উৎসব। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ঈদ কেবল ইবাদতের পুরস্কার নয়, এটি মানুষের মাঝে ভালোবাসা, সহানুভূতি ও সামাজিক সমতা প্রতিষ্ঠার এক অনন্য সুযোগ। কিন্তু বাস্তবতা হলো “ঈদ সবার, তবে সবার ঘরে ঈদ হয় না।” এই একটি বাক্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের সমাজের গভীর বৈষম্য ও অব্যক্ত বেদনার গল্প।
শহরের অভিজাত শপিংমলগুলোতে যখন ঈদের কেনাকাটার ভিড় উপচে পড়ে, নতুন পোশাকের রঙিন ছটায় চারপাশ আলোকিত হয়ে ওঠে, তখন একই শহরের গলির ভেতরে, কিংবা গ্রামের কোনো ভাঙা ঘরে বসে থাকা এক পরিবার হয়তো হিসাব মেলাতে ব্যস্ত কীভাবে অন্তত একদিনের জন্য একটু ভালো খাবার জোগাড় করা যায়। তাদের কাছে ঈদের আনন্দ মানে হয়তো শুধু অন্যদের আনন্দ দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ।
আমাদের সমাজে এমন অসংখ্য পরিবার রয়েছে, যাদের জন্য ঈদের নতুন জামা-কাপড় তো দূরের কথা, এক প্যাকেট সেমাই কেনাও বিলাসিতা। এই মানুষগুলোই আমাদের চারপাশে রিকশাচালক, দিনমজুর, গৃহকর্মী, ক্ষুদ্র দোকানি কিংবা নিম্ন মধ্যবিত্তের লড়াই করা পরিবার। তারা কারও কাছে হাত পাততে চায় না, আবার নিজেদের অভাবও সহজে প্রকাশ করতে পারে না। ফলে তারা থাকে আমাদের চোখের আড়ালে, কিন্তু তাদের কষ্ট আমাদের অজানা নয়, আমরা শুধু তা দেখেও না দেখার ভান করি।
বর্তমান সময়ে ঈদকে কেন্দ্র করে দান-সদকার একটি প্রবণতা দেখা যায়, যা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এর একটি বড় অংশই হয়ে উঠেছে লোকদেখানো। ফেসবুকে ছবি পোস্ট, সংবাদমাধ্যমে প্রচার কিংবা সামাজিক স্বীকৃতি পাওয়ার উদ্দেশ্যে আমরা অনেক সময় সাহায্য করি। সাহায্য করার এই প্রবণতা পুরোপুরি ভুল নয়, কিন্তু যখন এর মূল উদ্দেশ্য মানবিকতা নয়, বরং নিজের প্রচার, তখন সেটি তার আসল মূল্য হারিয়ে ফেলে।
সত্যিকারের সহমর্মিতা হলো নিঃশব্দে পাশে দাঁড়ানো। এমনভাবে সাহায্য করা, যাতে প্রাপক লজ্জিত না হন, বরং সম্মানবোধ নিয়ে তা গ্রহণ করতে পারেন। ইসলামও আমাদের এই শিক্ষাই দেয়, ডান হাত যা দেয়, বাম হাত যেন তা না জানে। কিন্তু আমরা অনেক সময় এই মূল শিক্ষাটিই ভুলে যাই।
ঈদের প্রকৃত শিক্ষা হচ্ছে ভাগাভাগি করা। আমাদের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা অন্যের মাঝেও ছড়িয়ে দেওয়া যায়। একজন সামর্থ্যবান ব্যক্তি যদি নিজের পরিবারের জন্য পাঁচ সেট পোশাক কেনার বদলে চার সেট কিনে একটি সেট অন্য কারও জন্য রাখেন, তবে সেটিই হতে পারে কারও জীবনের সবচেয়ে বড় ঈদের উপহার। তেমনি, অপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে যদি আমরা কিছু অর্থ দরিদ্র মানুষের জন্য ব্যয় করি, তাহলে সমাজে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
বিশেষ করে “নিম্ন মধ্যবিত্ত” শ্রেণিটি সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। তারা না পারে খোলাখুলিভাবে সাহায্য চাইতে, না পারে নিজের অভাব প্রকাশ করতে। অথচ তাদের কষ্ট অনেক সময় দরিদ্র মানুষের চেয়েও বেশি। তাই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। শুধু পরিচিত দরিদ্রদের নয়, বরং নীরবে কষ্ট করা মানুষগুলোর প্রতিও আমাদের নজর দিতে হবে।
এক্ষেত্রে সমাজের বিত্তবানদের পাশাপাশি মধ্যবিত্তদেরও ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সহমর্মিতা শুধুমাত্র অর্থের উপর নির্ভর করে না; এটি নির্ভর করে মন ও মানসিকতার উপর। একজন মানুষ তার সামর্থ্য অনুযায়ী ছোট কিছু দিয়েও বড় পরিবর্তন আনতে পারেন।
সরকার ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনও এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পরিকল্পিতভাবে যদি দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ঈদ সহায়তা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়, তবে তা আরও কার্যকর হবে। একইসঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক উদ্যোগগুলোকে উৎসাহিত করতে হবে, যাতে সাহায্য প্রকৃত প্রাপকের কাছে পৌঁছায়।
ঈদ কেবল ব্যক্তিগত আনন্দের উৎসব নয়; এটি সামাজিক বন্ধনেরও একটি পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় আমরা কতটা উত্তীর্ণ হচ্ছি, সেটিই এখন প্রশ্ন। আমরা কি সত্যিই আমাদের আশেপাশের অসহায় মানুষগুলোর কথা ভাবছি? নাকি নিজেদের আনন্দেই ডুবে থেকে তাদের দুঃখকে উপেক্ষা করছি?
সময় এসেছে আত্মসমালোচনার। আমরা যদি চাই, তবে খুব সহজেই এই বৈষম্য কিছুটা হলেও কমাতে পারি। প্রয়োজন শুধু আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা। একটি ছোট উদ্যোগ, একটি সহানুভূতির হাত কারও ঈদকে সত্যিকারের আনন্দময় করে তুলতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে মানুষের মাঝে ভালোবাসা ছড়িয়ে দেওয়ার মধ্যে। “ঈদ সবার” এই কথাটি তখনই সত্য হবে, যখন “সবার ঘরেই ঈদ” পৌঁছে যাবে। আর সেই দায়িত্ব আমাদের সবার,ব্যক্তিগতভাবে এবং সামাজিকভাবে।
লেখক: সংবাদকর্মী, কলামিস্ট এবং সমাজকর্মী।
ঈদের অন্তরালে বাস্তবতা: ঈদ সবার, তবে সবার ঘরে ঈদ হয় না
---মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী---