চট্টগ্রাম নগরীর দক্ষিণ আগ্রাবাদ সিডিএ ২৩ নম্বর সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে আছে কাঁচঘেরা তিন তলা বিশিষ্ট একটি দৃষ্টিনন্দন ভবন। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে এটি কোনো আধুনিক কর্পোরেট অফিস। কিন্তু বাস্তবে সেখানে চলছে একটি গার্মেন্টস কারখানা। বিস্ময়ের বিষয় হলো ভবনের বাইরে কারখানাটির কোনো সাইনবোর্ডও নেই। আর এই ভবনটি নিয়েই উঠেছে নানা প্রশ্ন।
এই ভবনটির মালিক চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নির্মিত এই মাল্টিস্টোরিড কমার্শিয়াল কমপ্লেক্সটি বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য ভাড়া দেওয়া হলেও সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে গার্মেন্টস কারখানা। ফলে ভবনটির ব্যবহার ও চুক্তির শর্ত নিয়ে দেখা দিয়েছে বিতর্ক।

বিশ্বব্যাংকের অর্থে নির্মাণ
জানা গেছে, বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ মিউনিসিপ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (বিএমডিএফ)-এর মাধ্যমে এই বহুতল বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণে ৪৩ কোটি ১৬ লাখ টাকা সহায়তা দেয়। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকার আধুনিকায়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং কর্পোরেশনের নিজস্ব আয় বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়।
২০১৯ সালে প্রকল্পের কাজ শুরু হয় এবং ৩২ শতক জমির ওপর নির্মিত বেইসমেন্ট ও গ্রাউন্ড ফ্লোরসহ তিন তলা বিশিষ্ট কমপ্লেক্সটি ২০২১ সালের ২৭ জুন উদ্বোধন করা হয়।

উদ্বোধনের পর ভবনটিতে প্রথমে দক্ষিণ আগ্রাবাদ ২৭ নম্বর ওয়ার্ড কার্যালয় স্থাপন করা হয়। তবে প্রায় দুই বছর পর সেই কার্যালয়টি আগ্রাবাদ এক্সেস রোডের বেপারিপাড়া সিটি কর্পোরেশন মার্কেটে স্থানান্তর করা হয়।
এরপর ভবনটি ‘ফারজানা ফ্যাশন ওয়ার্ল্ড লিমিটেড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে ভাড়া দেয় চসিক।
প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে চুক্তি করেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ সেলিম, যিনি পাহাড়তলী গ্রিনভিউ আবাসিক এলাকায় বসবাস করেন।

বাণিজ্যিক ভবনে গার্মেন্টস কারখানা
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কাগজে-কলমে বাণিজ্যিক ব্যবহারের কথা থাকলেও ভবনটিতে গড়ে তোলা হয়েছে ‘দি শাহাজালাল গ্লোবাল এ্যাপারেলস লিমিটেড’ নামে একটি গার্মেন্টস কারখানা।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চসিকের কোনো চুক্তি নেই। চুক্তি হয়েছে ফারজানা ফ্যাশন ওয়ার্ল্ড লিমিটেডের সঙ্গে।
চুক্তিপত্রে স্পষ্টভাবে বলা আছে, কর্পোরেশনের অনুমতি ছাড়া ভবনটি কোনো তৃতীয় পক্ষের কাছে হস্তান্তর করা যাবে না। কিন্তু বাস্তবে অন্য প্রতিষ্ঠানের নামে সেখানে কারখানা পরিচালনা করে চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সরেজমিনে যা দেখা গেল
গত ২৭ জানুয়ারি ভবনটি সরেজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ‘দি শাহাজালাল গ্লোবাল এ্যাপারেলস লিমিটেড’ নামে একটি নিট গার্মেন্টস কারখানা চালু রয়েছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে চালু হওয়া এই কারখানায় প্রায় ৩০০ শ্রমিক কাজ করছেন।
দুপুরে লাঞ্চ বিরতির সময় শ্রমিকদের বাইরে বের হতে দেখা যায়।
কারখানার একজন সুইং অপারেটর জানান, তিনি ২০২৫ সালের ৪ অক্টোবর এই প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন।


প্রতিবেদনের সময় কারখানায় প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার মোহাম্মদ সেলিমকে পাওয়া যায়নি। পরে দেওয়ানহাট আসকারাবাদ এলাকায় তার আরেক প্রতিষ্ঠান ফারজানা ফ্যাশন ওয়ার্ল্ড লিমিটেডের কার্যালয়ে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া যায়।

তবে প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক ইকবাল হোসেন বলেন,“সিটি কর্পোরেশনের এস্টেট বিভাগের কর্মকর্তারা যখন ভাড়া নিতে আসেন, তখন কি তারা দেখেন না যে এখানে গার্মেন্টস কারখানা চলছে? তারা তো কিছু বলেন না। তাহলে আপনি কেন বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন?”

চসিকের অবস্থান
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের এস্টেট কর্মকর্তা অভিষেক দাশ বলেন,
“এ বিষয়ে আমি বিস্তারিত জানি না। একজন সহকারী কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হবে। তদন্ত প্রতিবেদন মেয়রের কাছে উপস্থাপন করা হবে। এরপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

প্রশ্নের মুখে চসিকের নজরদারি
বিশ্বব্যাংকের অর্থে নির্মিত ৪৩ কোটি টাকার এই বাণিজ্যিক ভবনে চুক্তির বাইরে গার্মেন্টস কারখানা চালু থাকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে চসিকের তদারকি ও জবাবদিহিতা নিয়ে। মাসের পর মাস ভাড়া আদায় করতে গিয়েও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিষয়টি নজরে আনেননি এমন অভিযোগও উঠেছে।

ফলে নগরবাসীর প্রশ্ন বিশ্বব্যাংকের অর্থে নির্মিত এই বাণিজ্যিক ভবন কি ব্যক্তিগত ব্যবসার কেন্দ্র হয়ে উঠছে? নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো অদৃশ্য সমঝোতা?

তথ্যসূত্র: রাজনীতি সংবাদ