বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি পুরোনো কিন্তু ক্রমশ জটিল হয়ে ওঠা সংস্কৃতির নাম"তোষামোদ:। ক্ষমতার কাছাকাছি যেতে বা প্রভাব অর্জনের সহজ পথ হিসেবে বহু মানুষ রাজনীতির ভেতরে এই সংস্কৃতিকে বেছে নেয়। এতে সাময়িকভাবে ব্যক্তিগত সুবিধা পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব নেতিবাচক এবং কখনো কখনো বিপজ্জনক হয়ে ওঠে নেতৃত্বের জন্যও, দলীয় রাজনীতির জন্যও। সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকেই মনে করেন, অতিরঞ্জিত প্রশংসা ও তেলবাজির এই সংস্কৃতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে বারবার একই ধরনের সংকট তৈরি করেছে এবং ভবিষ্যতেও তা নতুন রূপে ফিরে আসার ঝুঁকি রয়েছে।
শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়কে ঘিরে গত দেড় দশকের অভিজ্ঞতা নিয়ে অনেকের মধ্যে এমন আলোচনা শোনা যায়। অনেকেই মনে করেন, একসময় জয়কে তুলনামূলকভাবে সংযত ও বাস্তবধর্মী একজন মানুষ হিসেবেই দেখা হতো। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে আওয়ামী লীগের একটি তোষামোদপ্রিয় গোষ্ঠী তাকে এমন এক অবাস্তব প্রশংসার বলয়ে আবদ্ধ করে ফেলে, যা ধীরে ধীরে তাকে ঘিরে একটি কৃত্রিম ভাবমূর্তি তৈরি করে।
এই প্রশংসা কখনো কখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে বাস্তবতার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্কই থাকে না। বিভিন্ন সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিংবা দলীয় প্রচারণায় এমন দাবিও দেখা গেছে যেখানে তাকে ফেসবুক, গুগল বা ইউটিউবের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের আবিষ্কারের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। বাস্তবে এসব দাবির কোনো ভিত্তি নেই; কিন্তু রাজনৈতিক তোষামোদের সংস্কৃতিতে এমন অতিরঞ্জন নতুন কিছু নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রেই নেতাকে খুশি করা বা নিজেদের অবস্থান শক্ত করার জন্য কিছু মানুষ এই ধরনের অবাস্তব প্রচারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে।
কিন্তু এই সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় নেতৃত্বের জন্য। কারণ, যখন একজন নেতাকে ঘিরে বাস্তবতার বদলে অতিরঞ্জিত প্রশংসা ও তোষামোদের দেয়াল তৈরি হয়, তখন তিনি ধীরে ধীরে বাস্তব পরিস্থিতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়েন। সত্য কথা বলার মানুষ কমে যায়, সমালোচনা গ্রহণের পরিবেশ নষ্ট হয়, আর সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াও ধীরে ধীরে সংকীর্ণ হয়ে পড়ে।
এটি শুধু একটি ব্যক্তি বা একটি দলের অভিজ্ঞতা নয়; বরং প্রায় সব রাজনৈতিক ব্যবস্থাতেই দেখা যায় ক্ষমতার কাছাকাছি গেলে তোষামোদকারীদের ভিড় বাড়তে থাকে। এরা সাধারণত বাস্তব কাজের চেয়ে নেতার আশপাশে অবস্থান করা, উপস্থিতি দেখানো এবং প্রশংসার বন্যা বইয়ে দেওয়ার মধ্যেই নিজেদের ভূমিকা খুঁজে পায়। ফলে প্রকৃত কর্মী, চিন্তাশীল নেতা বা নীতিনিষ্ঠ রাজনীতিকরা অনেক সময় পেছনের সারিতে চলে যান।
এই বাস্তবতা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি শুধু আওয়ামী লীগের জন্য নয়; বরং বাংলাদেশের অন্য সব রাজনৈতিক দলের জন্যও। বিশেষ করে ভবিষ্যতের নেতৃত্বকে ঘিরে যদি একই ধরনের তোষামোদের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, তাহলে একই ধরনের সমস্যা পুনরায় সৃষ্টি হওয়া অস্বাভাবিক হবে না।
রাজনৈতিক আলোচনায় প্রায়ই একটি কাল্পনিক উদাহরণ দেওয়া হয়,যদি ভবিষ্যতে বিএনপির নেতৃত্বে থাকা  পরিবারের নতুন প্রজন্ম জাইমা রহমানকে ঘিরে এখন থেকেই অযৌক্তিক প্রশংসা ও অতিরঞ্জিত প্রচারের প্রতিযোগিতা শুরু হয়, তাহলে কয়েক বছর পরে তার ফলাফলও হয়তো খুব সুখকর হবে না। রাজনীতিতে নেতৃত্বের বিকাশের জন্য প্রয়োজন বাস্তব অভিজ্ঞতা, সমালোচনা গ্রহণের ক্ষমতা এবং জনমানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ। কিন্তু তোষামোদী সংস্কৃতি এই তিনটি বিষয়কেই দুর্বল করে দেয়।
তবে অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তুলনামূলকভাবে এই বিষয়গুলো নিয়ে কিছুটা বেশি সতর্ক থাকার চেষ্টা করেন। অন্তত প্রকাশ্যে এমন কিছু ঘটনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যা থেকে বোঝা যায় তিনি তোষামোদের সংস্কৃতিকে খুব স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেন না।
সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, কোথাও যাওয়ার পথে তিনি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কিছু নেতাকর্মীকে দেখে পাশের একজনকে প্রশ্ন করেন“এদের কোনো কাজ নাই? এখানে দাঁড়িয়ে আছে কেন?”
এই ছোট্ট প্রশ্নটি রাজনীতির একটি বড় বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে আসে। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, রাজনৈতিক দলের আশপাশে এমন একদল মানুষ থাকে যাদের মূল আগ্রহ জনগণের সঙ্গে কাজ করা বা সংগঠনকে শক্তিশালী করা নয়; বরং নেতার কাছে দৃশ্যমান থাকা এবং আনুগত্য প্রদর্শনের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করা।
রাজনীতির জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যখন প্রকৃত কর্মীর জায়গা দখল করে নেয় তোষামোদকারী গোষ্ঠী, তখন দলের সাংগঠনিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। মাঠপর্যায়ের বাস্তব সমস্যাগুলো নেতৃত্বের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছায় না। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয় এবং জনগণের সঙ্গে দলের দূরত্বও বাড়তে থাকে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এই তোষামোদকারীদের বড় একটি অংশ প্রকৃত অর্থে রাজনৈতিক কর্মী নয়। তারা মূলত সুযোগসন্ধানী। ক্ষমতার কাছে থাকার মধ্যেই তাদের প্রধান স্বার্থ নিহিত থাকে। তাই ক্ষমতার পালাবদল ঘটলে এদের অবস্থানও দ্রুত বদলে যায়। ইতিহাসে দেখা গেছে, রাজনৈতিক সংকটের মুহূর্তে এদের অনেকেই প্রথমেই সরে যায় বা অন্য দিকে ভিড়ে যায়।
এ কারণেই সুস্থ রাজনীতির জন্য প্রয়োজন এমন একটি সংস্কৃতি, যেখানে নেতৃত্বের চারপাশে থাকবে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা, যুক্তিনির্ভর আলোচনা এবং বাস্তবতার প্রতি শ্রদ্ধা। একজন নেতার জন্য সবচেয়ে মূল্যবান মানুষ তারা, যারা প্রয়োজন হলে সত্য কথা বলার সাহস রাখে যদিও সেই সত্য কখনো কখনো অস্বস্তিকর হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অনেক সময় নেতারাও এই বাস্তবতাটি বুঝতে পারেন। তারা উপলব্ধি করেন, কারা প্রকৃত কর্মী আর কারা শুধুই তোষামোদকারী। কিন্তু সাংগঠনিক কাঠামো, রাজনৈতিক বাস্তবতা বা পরিস্থিতির কারণে অনেক সময় এই সমস্যাকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না।
তবুও রাজনীতির ভবিষ্যৎ সুস্থ রাখতে হলে এই সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি। নেতৃত্বকে বাস্তবতার সঙ্গে সংযুক্ত রাখা, মাঠপর্যায়ের কর্মীদের মূল্যায়ন করা এবং তোষামোদের বদলে যোগ্যতা ও কাজের ভিত্তিতে রাজনীতিকে এগিয়ে নেওয়াই হতে পারে এ সমস্যার সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।
কারণ শেষ পর্যন্ত রাজনীতির শক্তি নির্ভর করে জনগণের ওপর তোষামোদকারীদের ওপর নয়। আর যে নেতৃত্ব বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তার জন্য রাজনীতির পথ কখনোই দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

সুস্থ রাজনীতির জন্য তাই সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো নেতৃত্বের চারপাশে এমন মানুষ থাকা, যারা প্রয়োজনে কঠিন সত্য বলার সাহস রাখে। কারণ চাটুকাররা নেতাকে খুশি করতে পারে, কিন্তু সত্যিকারের কর্মীরাই নেতৃত্বকে টিকিয়ে রাখে।
লেখক: সংবাদকর্মী, কলামিষ্ট ও সমাজকর্মী