বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মজুদ ও সরবরাহ নিয়ে প্রায়ই নানা প্রশ্ন উঠতে দেখা যায়। সরকারিভাবে বলা হয়, দেশের জ্বালানি তেলের মজুদ সীমিত, আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করেই দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা অনেকটা পরিচালিত হয়। কিন্তু বাস্তবতার দিকে তাকালে দেখা যায় এক ভিন্ন চিত্র যেখানে সরকারি মজুদের সক্ষমতা সীমিত হলেও বেসরকারি পর্যায়ে অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল মজুদ করার সক্ষমতা যেন অবাক করার মতো শক্তিশালী।
এ এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। রাষ্ট্র যেখানে কোটি কোটি মানুষের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হিমশিম খায়, সেখানে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বা চক্র অবলীলায় বিপুল পরিমাণ তেল মজুদ করে বাজারকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়। ফলে প্রশ্ন ওঠে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কি সত্যিই দুর্বল, নাকি কোথাও কোনো অদৃশ্য শক্তির আশ্রয়ে এসব অবৈধ মজুদের সাম্রাজ্য গড়ে উঠছে?
জ্বালানি তেল শুধু একটি পণ্য নয়; এটি অর্থনীতি, পরিবহন, শিল্প এবং কৃষির চালিকাশক্তি। একটি দেশের জ্বালানি সরবরাহে সামান্য অস্থিরতাও পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে নড়বড়ে করে দিতে পারে। তাই উন্নত দেশগুলো জ্বালানি মজুদের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে এবং কঠোর নজরদারি বজায় রাখে। কিন্তু আমাদের বাস্তবতায় প্রায়ই দেখা যায়, বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়, দাম বাড়ে, তারপর হঠাৎ কোথা থেকে যেন বিপুল পরিমাণ তেল বের হয়ে আসে।
এই অবস্থার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো অবৈধ মজুদ ও সিন্ডিকেটের প্রভাব। অনেক সময় কিছু ব্যবসায়ী বা মধ্যস্বত্বভোগী ভবিষ্যতে দাম বাড়ার আশায় বা কৃত্রিম সংকট তৈরির উদ্দেশ্যে গোপনে তেল মজুদ করে রাখে। যখন বাজারে সরবরাহ কমে যায়, তখন তারা উচ্চমূল্যে সেই তেল বিক্রি করে বিপুল মুনাফা লুটে নেয়।
এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ। পরিবহন খরচ বেড়ে যায়, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ে, কৃষককে বেশি দামে সেচের ডিজেল কিনতে হয়। অর্থাৎ একটি অবৈধ মজুদ চক্রের লাভের বোঝা শেষ পর্যন্ত বহন করতে হয় দেশের কোটি মানুষের।
প্রশ্ন হলো এই অবৈধ মজুদ কি একদিনে তৈরি হয়েছে? নিশ্চয়ই নয়। বছরের পর বছর ধরে প্রশাসনিক দুর্বলতা, নজরদারির ঘাটতি এবং কখনো কখনো প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় এসব কর্মকাণ্ড বিস্তার লাভ করেছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, অভিযানের খবর আগে থেকেই ফাঁস হয়ে যায়, ফলে অবৈধ মজুদের বড় অংশই ধরা পড়ে না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সরকারি সংস্থাগুলোর সক্ষমতা। অনেক সময় বলা হয়, রাষ্ট্রের কাছে পর্যাপ্ত সংরক্ষণাগার নেই, নতুন ডিপো বা ট্যাংক নির্মাণে সময় ও অর্থের প্রয়োজন। কিন্তু একই দেশে যদি কিছু বেসরকারি ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ তেল মজুদ করতে পারে, তাহলে প্রশ্ন জাগে রাষ্ট্র কেন সেই সক্ষমতা অর্জন করতে পারছে না?
এখানেই আসে পরিকল্পনা ও শাসনব্যবস্থার প্রশ্ন। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে শুধু আমদানি বাড়ালেই হবে না; প্রয়োজন শক্তিশালী সংরক্ষণ ব্যবস্থা, কঠোর নজরদারি এবং স্বচ্ছ বাজারব্যবস্থা।
প্রথমত, অবৈধ মজুদ রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কৃত্রিম সংকট তৈরির উদ্দেশ্যে তেল মজুদ করে, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বাজার পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করতে হবে। ডিজিটাল ট্র্যাকিং, সরবরাহ চেইনের স্বচ্ছতা এবং নিয়মিত মনিটরিংয়ের মাধ্যমে কোথায় কত তেল যাচ্ছে এবং কোথায় আটকে আছে তা সহজেই নির্ণয় করা সম্ভব।
তৃতীয়ত, সরকারি মজুদ সক্ষমতা বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ জরুরি। নতুন সংরক্ষণাগার নির্মাণ, আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং জরুরি পরিস্থিতির জন্য কৌশলগত মজুদ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সুশাসন। আইন যদি সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য না হয়, তাহলে কোনো ব্যবস্থাই কার্যকর হবে না। অবৈধ মজুদকারীরা যদি রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক আশ্রয়ে নিরাপদ থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব নয়।
আজকের বাস্তবতা তাই এক অদ্ভুত প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে আমাদের রাষ্ট্র যেখানে সীমাবদ্ধতার কথা বলে, সেখানে অবৈধ চক্র কীভাবে এত শক্তিশালী হয়ে ওঠে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা শুধু প্রশাসনের দায়িত্ব নয়; এটি পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য একটি সতর্কবার্তা। কারণ জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু অর্থনীতির বিষয় নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তারও অংশ।
তাই এখনই সময় বাস্তবতাকে স্বীকার করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার। অন্যথায় সরকারি সীমাবদ্ধতা আর বেসরকারি অবৈধ প্রাচুর্যের এই বৈপরীত্য ভবিষ্যতেও আমাদের সামনে “আজব দেশের গজব কাহিনি” হিসেবেই থেকে
লেখক: সংবাদকর্মী, কলামিষ্ট ও সমাজকর্মী