- চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) রাজস্ব বিভাগকে ঘিরে একের পর এক বিস্ফোরক অভিযোগে নতুন করে তোলপাড় শুরু হয়েছে প্রশাসনিক মহলে। কোটি টাকার আর্থিক কেলেঙ্কারি, সুসংগঠিত চাঁদাবাজি, সাংবাদিক হেনস্তা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং টাকার বিনিময়ে জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদ বাগিয়ে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগে ফের আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন চসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা এস. এম. সরওয়ার কামাল।
- স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে ৮ কোটি টাকার বিনিময়ে কুমিল্লার জেলা প্রশাসক পদে পদায়নের লক্ষ্যে অঙ্গীকারনামা ও চুক্তিপত্রে স্বাক্ষরের অভিযোগে সরওয়ার কামালকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে। গত বুধবার (১৩ মে) স্থানীয় সরকার বিভাগের সিটি কর্পোরেশন-২ শাখা থেকে জারি করা ওই নোটিশে তাকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।
- নোটিশে বলা হয়, চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় কমিশনারকে উদ্দেশ্য করে সরওয়ার কামাল একটি অঙ্গীকারনামা ও সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করেছেন, যেখানে ৮ কোটি টাকার বিনিময়ে ডিসি পদে পদায়নের প্রতিশ্রুতির বিষয়টি উঠে এসেছে। বিভিন্ন সূত্রে এ সংক্রান্ত তথ্য-প্রমাণ পাওয়ার দাবি করে মন্ত্রণালয় জানতে চেয়েছে কেন তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না।
- চসিকজুড়ে চলমান নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন মেয়র শাহাদাত হোসেনও। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আট কোটি টাকার চুক্তির বিষয়টি আমিও শুনেছি। যেহেতু মন্ত্রণালয় বিষয়টি দেখছে, তাই আমি হস্তক্ষেপ করছি না। তবে সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।’
- অভিযোগ রয়েছে, চসিকের রাজস্ব বিভাগে সরওয়ার কামাল যেন অঘোষিত একচ্ছত্র ক্ষমতার কেন্দ্র। একের পর এক গুরুতর অভিযোগ উঠলেও রহস্যজনকভাবে বারবার পার পেয়ে যাচ্ছেন তিনি। সর্বশেষ সাংবাদিক হেনস্তার অভিযোগের মধ্যেই টাকার বিনিময়ে ডিসি হওয়ার সম্মতিপত্র প্রকাশ্যে আসায় নতুন করে ক্ষোভ ও বিতর্ক ছড়িয়ে পড়েছে প্রশাসনিক মহলে।
- অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৭ মে নিউজ পোর্টাল ‘বাংলাধারা’র প্রতিবেদক ওমর ফারুক চসিকের রাজস্ব বিভাগের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে বক্তব্য নিতে চসিক ভবনে যান। পরে প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা সরওয়ার কামালের কক্ষে গেলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
- ভুক্তভোগী সাংবাদিকের অভিযোগ, তাকে প্রায় ৪৫ মিনিট আটকে রাখা হয়। এ সময় তার মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে ব্যক্তিগত তথ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চ্যাট ও গ্যালারি তল্লাশি করা হয়। পরিবারের সদস্যদের নম্বর সংগ্রহ করে ভয়ভীতি প্রদর্শন, পুলিশে সোপর্দ এবং মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
- সাংবাদিক ওমর ফারুক বলেন, ‘পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এ ধরনের আচরণ সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
- ঘটনার পর সাংবাদিক মহলে তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, তথ্য অধিকার আইনের আওতায় তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে একজন সাংবাদিককে এভাবে আটকে রাখা ও ফোন তল্লাশি স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর সরাসরি আঘাত।
- এদিকে সরওয়ার কামালের নামে প্রকাশ হওয়া অঙ্গীকারনামা ও সম্মতিপত্র নতুন করে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। নথিতে দাবি করা হয়েছে, কুমিল্লার জেলা প্রশাসক হিসেবে পদায়ন নিশ্চিত হলে তিনি নগদ আট কোটি টাকা প্রদান করবেন। পাশাপাশি দায়িত্ব গ্রহণের পর নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করা এবং মনোনীত রাজনৈতিক ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সমন্বয় রেখে চলার কথাও সেখানে উল্লেখ রয়েছে।
- অভিযোগে উঠেছে এসেছে আরও ভয়াবহ তথ্য চসিকের রাজস্ব বিভাগজুড়ে তাঁর নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে ‘চাঁদাবাজি সিন্ডিকেট’। এক ভুক্তভোগীর লিখিত অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা সরওয়ার কামালের নেতৃত্বে বিভাগটিতে সুসংগঠিত ‘অর্থ বাণিজ্য’ চালু রয়েছে।
- অভিযোগে বলা হয়, টিও, ডিটিও, কর আদায়কারী ও অনুমতি পরিদর্শকদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায় করা হয়। অনেক কর্মচারীর বেতন থেকেও বিভিন্ন অজুহাতে অর্থ কেটে নেওয়া হয়। ‘স্কেল প্রদান’র নামে প্রায় ৬০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
- এছাড়া ‘মিটিং বাণিজ্য’, ‘পিকনিক বাণিজ্য’ এবং ‘সার্কেল ভিজিট’র নামে মাসে লাখ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। বড় অঙ্কের হোল্ডিং চেক নির্দিষ্ট ব্যাংকে জমা দিয়ে ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়া, এমনকি ব্যাংক থেকে কম্পিউটার ও এলইডি টিভির মতো উপহার গ্রহণের অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
- রাজস্ব বিভাগে ভয়ভীতির পরিবেশ তৈরি করতে বিভিন্ন সার্কেলে দালাল নিয়োগের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব দালালের মাধ্যমে কর্মচারীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে অর্থ আদায় করা হয়।
- তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সরওয়ার কামাল। তিনি দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে প্রচারিত অঙ্গীকারনামা ও চুক্তিপত্র সম্পূর্ণ ভুয়া এবং সেখানে তার স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে।
- এ বিষয়ে চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীন বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না। যে বিভাগ থেকে নোটিশ ইস্যু হয়েছে, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।’
- এছাড়া চসিকের সরওয়ার কামাল নামের কাউকেই তিনি ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না।
ডিসি হতে ৮ কোটির ‘ডিল’! চসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তাকে শোকজ
‘দুর্নীতির সম্রাট’ সরওয়ার কামাল লুটেপুটে খাচ্ছে পুরো রাজস্ব বিভাগ