- শরীয়াহ্ ভিত্তিক ব্যাংকিং পরিচালনার দাবি করা স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে একজন মদ ব্যবসায়ীর নাম সুপারিশ করা হয়েছে এমন তথ্য সামনে আসার পর দেশের ব্যাংকিং খাতে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের এ সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা, শরীয়াহ্ বিশেষজ্ঞ এবং সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তারাও।
- সূত্র জানায়, গত ১৬ জুলাই অনুষ্ঠিত স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ৪২৯তম পরিচালনা পর্ষদের সভায় চেয়ারম্যান হিসেবে ফিরোজুর রহমান ওলিওর নাম সুপারিশ করা হয়। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরেও অস্বস্তি তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
- ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ২০২০ সালে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকে রূপান্তরিত হয়। ব্যাংকটি নিজেকে শরীয়াহ্-সম্মত আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালনার দাবি করে আসছে। তবে চেয়ারম্যান পদে এমন একজন ব্যক্তির নাম আসায় সেই অবস্থান নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।
- ফিরোজুর রহমান ওলিওর মালিকানায় একাধিক লাইসেন্সধারী বার ও হোটেল রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অতীতে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, সরকারকে কর দিয়ে লাইসেন্সের আওতায় মদ বিক্রি করলে তা হারাম নয় এবং মদ ওষুধ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। তার এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচিত হয়েছিল।
- এছাড়া তিনি নিজেকে নিরক্ষর বলেও উল্লেখ করেছিলেন। অথচ এখন দেশের একটি ইসলামী ধারার ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সর্বোচ্চ পদে তার নাম সুপারিশ হওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করছেন অনেকেই।
- অভিযোগ রয়েছে, ফিরোজুর রহমান ওলিও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে হামলা, সরকারি জমি দখলসহ নানা অভিযোগও রয়েছে।
- রাজধানীর পান্থপথে সরকারি জমির ওপর নির্মিত ওলিও ইন্টারন্যাশনাল হোটেল নিয়েও তিনি আলোচনায় ছিলেন। ২০২৪ সালের জুনে ঢাকা জেলা প্রশাসন ভবনটি সরকারি খাসজমি দাবি করে উদ্ধার করে। তবে বর্তমানে সেখানে আবারও বাণিজ্যিক কার্যক্রম চলার অভিযোগ রয়েছে।
- অভিযোগের বিষয়ে ফিরোজুর রহমান ওলিও বলেন, তার মূল ব্যবসা রেস্টুরেন্ট এবং লাইসেন্স অনুযায়ী সেখানে মদ বিক্রি হতো। তিনি দাবি করেন, অনেক আগেই বারের ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, অতীতেও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের বিভিন্ন কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
- স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়াদ মাহমুদ চৌধুরী এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুল আজিজও মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
- ব্যাংকের এক পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, চেয়ারম্যান পদে সুপারিশটি যথাযথ আইন, বাংলাদেশ ব্যাংকের করপোরেট গভর্ন্যান্স নির্দেশনা এবং বোর্ডের বিধি অনুসারে হয়েছে কি না, তা নিয়ন্ত্রক সংস্থার খতিয়ে দেখা উচিত। তার ভাষ্য, পর্ষদে শিক্ষিত ও অভিজ্ঞ পরিচালক থাকা সত্ত্বেও বিতর্কিত একজন ব্যক্তিকে কেন সুপারিশ করা হলো, সেটিও তদন্তের বিষয়।
- বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর আহমেদ জামাল বলেন, ইসলামী ধারার ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে এমন একজন ব্যক্তিকে সুপারিশ করা যৌক্তিক কি না, তা পরিচালনা পর্ষদেরই ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত। শরীয়াহ্-ভিত্তিক ব্যাংকে এমন ব্যক্তিকেই নেতৃত্বে আনা প্রয়োজন, যার ব্যক্তিগত ও পেশাগত অবস্থানের সঙ্গে ইসলামী নীতির সাংঘর্ষিক কোনো বিষয় না থাকে।
- স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের শরীয়াহ্ সুপারভাইজরি কমিটির চেয়ারম্যান মুহাম্মাদ মুহিবুল্লাহিল বাকি নদভী বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত নন। নিশ্চিত তথ্য পাওয়ার পরই এ বিষয়ে মতামত দেওয়া সম্ভব বলে জানান তিনি।
- শরীয়াহ্ কমিটির আরেক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অভিযোগ সত্য হলে তা অত্যন্ত দুঃখজনক হবে। তার দাবি, একজন নিরক্ষর ও বিতর্কিত ব্যক্তিকে চেয়ারম্যান করা হলে তিনি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করবেন।
- বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসাইন খান বলেন, কোনো ব্যাংকের চেয়ারম্যান নির্বাচন পরিচালনা পর্ষদের এখতিয়ার। বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারে না। তবে ইসলামী ধারার ব্যাংকের চেয়ারম্যান এমন হওয়া উচিত, যার সঙ্গে ইসলামী বিধানের কোনো সাংঘর্ষিক বিষয় না থাকে।
ইসলামী ধারার ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে ‘মদ ব্যবসায়ী’ সুপারিশ! স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংককে ঘিরে তীব্র বিতর্ক
ফিরোজুর রহমান ওলিওর মালিকানায় একাধিক লাইসেন্সধারী বার ও হোটেল রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে