চট্টগ্রাম আদালতের অঘোষিত সাত মহারাজ ।তারা আবার কোন বড় কর্তা নয়। তবু তাদের ভয়ে সবাই তটস্থ থাকতেন।তারা হলেন, মূখ্য মহানগর হাকিম আদালত (সিএমএম) বেঞ্চ সহকারি মোহাম্মদ উসমান গনি , মহানগর দায়রা জজ আদালতের স্টেনোগ্রাফার দীপেন দাশগুপ্ত, মূখ্য মহানগর হাকিম (সিএমএম) আদালতের প্রধান তুলনাকারক মো. রহমত উল্লাহ, মূখ্য বিচারিক হাকিম (সিজেএম) আদালতের বেঞ্চ সহকারি জয়নাল আবেদীন, জেলা ও দায়রা জজ আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা অঞ্জন কুমার চৌধুরী ও বেঞ্চ সহকারী এস.এম মোর্শেদ এবং সাইবার ট্রাইবুন্যালের বেঞ্চ সহকারি কামরুল হাসান খন্দকার।
প্রথম পর্বে সাতজনকে নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন।
তাদের বিরুদ্ধে ফ্যাসিস্ট আওয়ামীলীগের শাসন আমলে চট্টগ্রাম আদালত ভবনে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে সরকার বিরোধী বিএনপি – জামায়াতের কর্মীদের হয়রাণী, হাইকোটের জামিনের কাগজপত্র গ্রহণে গড়িমসি,কম সময়ে মামলার হাজিরা , বিভিন্ন মামলার আদেশ লিখে দেয়ার নাম করে বিচারপ্রার্থীদের থেকে বড় অঙ্কের ঘুষ গ্রহণ ।
এই সব কর্মচারীরা আওয়ামীলীগের নানা ধরণের সুযোগ সুবিধা পেয়ে অবৈধ উপায়ে বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়েছেন এরা। এবার তারা ভোল পাল্টিয়ে নিজেদের কখনও বিএনপি বা কখনও জামায়াতের অনুসারি দাবি করছেন। আবার দুর্দান্ত প্রতাপের সাথে আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে অস্থিতিশীল করতে নানা অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা ও আদালত সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে তুলে ধরা হলো
ছাত্রজনতার বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচারী হাসিনা ও তার দলের নেতাকর্মীরা দেশ ছেড়ে পালালেও চট্টগ্রামের অফিস-আদালতের সর্বত্রে এখনও তাদের ছায়া হয়ে কাজ করছেন এ এইসব ব্যক্তিরা ।
তাদের দুর্নীতি ও অনিয়মের চিত্র-
চট্টগ্রামের মূখ্য মহানগর হাকিম (সিএমএম)
মোহাম্মদ উসমান গনি। বেঞ্চ সহকারি হিসেবে চাকরি করছেন চট্টগ্রামের মূখ্য মহানগর হাকিম (সিএমএম) আদালতে। শুধু চাকরিই করছেন না তিনি, অদৃশ্য ক্ষমতায় দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণ করছিলেন আদালত অঙ্গনের বিচারকদেরও।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের ভাতিজা পরিচয়ে ব্যপক দাপট তার। নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করলেও চাচা কোটায় চাকরি পেয়েছেন উসমান। আনিসুল হকের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) আলাউদ্দিন বাবুর সাথে সিন্ডিকেট করে সারাদেশে নিয়োগ বাণিজ্য করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। গড়েছেন কোটি কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি। বিচারকরা কে কোন দলের অনুসারি এ তথ্য সাবেক আইনমন্ত্রী ও সচিবকে দেয়াও ছিল তার অন্যতম কাজ। তুলে ধরা হলো তাদের দুর্নীতি ও অনিয়মের চিত্র-
মহানগর দায়রা জজ আদালত
স্টেনোগ্রাফার দীপেন দাশগুপ্ত (সদ্য বদলী ), তার বিরুদ্ধে ইসকন আর্থিক সহযোগিতা করার অভিযোগ রয়েছে। প্রতিদিন বিভিন্ন মামলার আদেশ লিখে দেয়ার নাম করে বিচারপ্রার্থী জনসাধারণ ও আইনজীবী সহকারিদের কাছ থেকে অনেকটা প্রকাশ্যেই বড় অঙ্কের ঘুষ লেনদেন করছেন তিনি। স্বৈরচারী হাসিনা সরকারের সময় বিরোধীদলের নেতাকর্মীরা হাইকোর্ট হতে জামিন পেলেও জামিননামা গ্রহণে ছিল তার কালক্ষেপন। আত্মীয়স্বজনদের হয়রানি করে আদায় করতেন মোটা অঙ্কের ঘুষ। এভাবে বিপুল অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন তিনি। তার বিরুদ্ধে নানা ধরণের অভিযোগ থাকলেও এখনও স্বপদে বহাল রয়েছেন। আইন মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিবকে চট্টগ্রাম আদালতের কর্মচারীরা কে কোন দল সমর্থক বা সমর্থন করে তার তথ্য দেয়া এবং পরামর্শ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা ছিল তার অন্যতম কাজ।
মূখ্য মহানগর হাকিম (সিএমএম) আদালত
মো. রহমত উল্লাহ, চট্টগ্রামের মূখ্য মহানগর হাকিম (সিএমএম) আদালতের প্রধান তুলনাকারক তিনি। বিচারবিভাগীয় কর্মচারি এসোসিয়েশনের কেন্দ্রিয় নেতা হিসেবে বেশ প্রভাবশালী কর্মচারি মনে করেন নিজেকে। এ আদালতের নকল শাখার টাইপ করার সব কাজ আইনজীবী ভবনের নিচতলায় বহিরাগতদের মাধ্যমে করান তিনি। তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ১১জন উমেদার। তাদের দিয়ে মামলার মূল নথি পাঠানো হয় আইনজীবী ভবনের নিচে। এতে মামলার গুরুত্বপূর্ণ কাগজ সরিয়ে ফেলা কিংবা ডকুমেন্ট পরিবর্তন বা পরিমার্জনের সুযোগ পান চুক্তিবব্ধপক্ষ। প্রতি ফলিও নকলে নেয়া হয় ৭০-১০০ টাকা।
তাছাড়া মহানগর এলাকার যত বড় বড় মাদক মামলা হয় সেগুলোর আসামীপক্ষকে ম্যানেজ করে আসামীকে নিজ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে জামিনে বের করেন তিনি। এভাবে তিনি কমপক্ষে ২০ কোটি টাকার মালিক বলে জানান আদালতের সংশ্লিষ্টরা। চট্টগ্রাম শহরের বাকলিয়া, চকবাজার ও ফিরিঙ্গিবাজারে তার একাধিক ফ্ল্যাট-প্লট, বাড়ি-গাড়ি রয়েছে। বিভিন্ন সংবাদপত্রে তার অনিয়ম ও দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশ হলেও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসান মাহমুদের খাসলোক ও আওয়ামী লীগ ক্যাডার পরিচয়ে বরাবরই চলছে তার অবৈধ সব কর্মকাণ্ড।
মূখ্য বিচারিক হাকিম (সিজেএম) আদালত
চট্টগ্রামের মূখ্য বিচারিক হাকিম (সিজেএম) আদালতে বেঞ্চ সহকারি মো. জয়নাল আবেদীন। এ আদালতে বিচারক আসেন আবার নির্ধারিত সময় শেষে বদলি হয়ে অন্যত্রে চলে যান, তবে বদলি নেই বেঞ্চ সহকারি মো. জয়নাল আবেদীনের। বিচার সংশ্লিষ্টদের মুখেমুখে আলোচনা রয়েছে, তার খুঁটির জোর অনেক শক্ত। হয়রানির কারণে অতিষ্ট আদালত অঙ্গনের বিচার সংশ্লিষ্টরা। দীর্ঘ সময় ধরে স্থানীয় আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কার্যক্রমে সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকায় তাকে কখনো বদলি করা হয়নি। কোটিপতি জয়নাল আবেদীনও বর্তমানে স্বপদে বহাল রয়েছেন।
জেলা ও দায়রা জজ আদালত
প্রশাসনিক কর্মকর্তা অঞ্জন কুমার চৌধুরী স্থানীয় আ.লীগের সভা সমাবেশে সরাসরি অংশগ্রহণ করে থাকেন। আদালত পাড়ায় তিনি সাবেক সচিব আবু সালেহ শেখ জহিরুল ইসলাম দুলালের এজেন্ট হিসেবেই পরিচিত। জামিন বাণিজ্যের মাধ্যমে নামে-বেনামে বিপুল অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, বিচারকদের মাধ্যমে অন্যান্য কর্মচারীদের হয়রানি করিয়ে আধিপত্য ধরে রাখেন তিনি।
চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আদালত
এস.এম মোর্শেদ, চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বেঞ্চ সহকারী তিনি। স্বৈরচারী হাসিনা সরকারের সময় বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীদের জামিনের মিস কেইস শুনানির তারিখ শর্ট-লং ও জামিনের কন্টাক্ট করে আদায় করেন মোটা অংকের টাকা। জামিননামা গ্রহণকালে হয়রানির মাধ্যমে টাকা আদায়ের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। আর এভাবে বিপুল অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন তিনি। সরকারি কর্মচারি ও চাকুরিতে বহাল তবিয়তে থাকলেও বর্তমানে তিনি একজন পরিবহন ব্যবসায়ী এবং ডেইরী ফার্মের মালিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাইবার ট্রাইবুন্যাল
কামরুল হাসান খন্দকার, চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাইবার ট্রাইবুন্যালের বেঞ্চ সহকারি তিনি। সাইবার ট্রাইবুন্যালের বিভিন্ন মামলায় অভিযোগ আমলে গ্রহণ, জামিন বাণিজ্য, খালাস-সাজার বাণিজ্য করে বিপুল অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন। চট্টগ্রাম নগরীর কর্ণেল হাটে অবৈধ টাকায় সুউচ্চ ভবন নির্মাণ করেছেন। চট্টগ্রাম শহরে তার দশটি সিএনজি অটোরিক্সা রয়েছে বলে জানা যায়।
এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর আইনজীবী আক্তার কবির চৌধুরী বলেন, ঘুষ খোরের কোনো পার্টি নাই। যে সময় যে দল ক্ষমতায় আসে এরা সে পার্টির হয়ে নিজেদের চলমান কাজ চালিয়ে নেয়। এদেও নিয়ন্ত্রণ করা সংশ্লিষ্ট আদালতের বিচারকের দায়িত্ব। তাছাড়া নিম্নস্তরের এসব কর্মচারি আদালতে অস্থিতিশীল কিছু করতে পারবে বলে মনে হয় না।