গ্রামীন জনপদের উন্নয়ন,গ্রাম্য আদালতের মাধ্যমে সালিশ ও ছোটোখাটো অভিযোগ/মামলা নিষ্পত্তিকরণ, মাঠ পর্যায়ে সরকারি সিদ্ধান্ত ও পরিসেবাসমূহ বাস্তবায়ন,উন্নয়ন কর্মকান্ডে জনগণের অংশগ্রহণ ইত্যাদি কাজকর্ম সম্পাদনে ইউনিয়ন পরিষদ গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে থাকে।ইউনয়ন পরিষদকে কেন্দ্র করে তৃণমূল থেকে গণতান্ত্রিক চর্চা ও জন প্রতিনিধি নির্বাচন শুরু হয়। তদানিন্তন পাকিস্তান আমল থেকে এ প্রথা প্রচলিত। অতীতে গ্রামের শিক্ষিত সুপরিচিত,আর্থিকভাবে স্বচ্ছল,সৎ এবং মানব কল্যানে নিবেদিত ব্যক্তিবর্গ প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের মাধ্যমে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হতেন।

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন উপলক্ষে গ্রামীন জনপদে আনন্দমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হতো।ভোটারগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে ভয়ভীতির উর্ধ্বে থেকে স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে পছন্দের প্রার্থী নির্বাচিত করতেন। কিন্ত বিগত সরকারের আমল থেকেই ইউনিয়ন পরিষদকে রাজনীতিকরণ করা হয় এবং দলীয়ভাবে নির্বাচনের বিধান চালু করে সুপরিকল্পিত  ভাবে নিজেদের লোককে চেয়ারম্যান/মেম্বার নির্বাচিত করার সুযোগ সৃষ্টি  করা হয়।সংশ্লিষ্ট এমপি তার সংসদীয় এলাকায় লক্ষ লক্ষ টাকার বিনিময়ে প্রার্থী মনোনয়ন প্রদানপূর্বক ভয়ভীতি ও কূটকৌশলের মাধ্যমে অন্যান্যদের নির্বাচনে আসার পথ বন্ধ করে বিনা ভোটে পছন্দনীয় প্রার্থীকে চেয়ারম্যান /মেম্বার নির্বাচিত করতে সহায়তা করেন।এতে স্থানীয় এমপির জন্য কোটি কোটি টাকার বানিজ্যের দ্বার উন্মোচিত হয়।বিনা ভোটে দলীয় চেয়ারম্যান/মেম্বার নির্বাচিত হওয়ার কারনে জনগণের প্রতি তাদের কোন দায়বদ্ধতা থাকে না।উপরন্তু গরীব জনগোষ্ঠীর উপর শোষনের মাত্রা বৃদ্ধি পায়।কেননা তাদের উপর এমপির সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থাকায় তারা তদানিন্তন জমিদারের ন্যায় বেপরোয়া হয়ে ইউনিয়ন পরিষদকে নিজের ইচ্ছেমতো পরিচালনা করতে থাকে।অতীতে দেখা গেছে জনগণের সেবার পরিবর্তে শোষনের মাত্রা বেশি ছিল।বিগত সরকার তৃণমূল থেকে তাদের একচ্ছত্র  দলীয় আধিপত্য বিস্তারের জন্যই দলীয়ভাবে নির্বাচনের পদ্ধতি চালু করে।
      বাংলাদেশে অতীতে জাতীয় নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে অনেক প্রশ্ন উত্থাপিত হলেও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়ে তেমন কোনো অভিযোগ উঠেনি।বিএনপি সরকারের আমলে সকল ইউ,পি নির্বাচনে শতভাগ স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখা হয়েছিল।সে সময়ে নির্বাচিত চেয়ারম্যানগণ জনগণের নিকট দায়বদ্ধ ছিল। নির্দলীয়ভাবে নির্বাচন হলে জনগণের পক্ষে নিজেদের পছন্দের প্রতিনিধি বেছে নেয়ার সুযোগ থাকে এবং রাজনীতি বিমুখ, নিরীহ ও ভালো মানুষ নির্বাচনে অংশগ্রহণে উজ্জীবিত হয়। বিগত সরকারের সময়কালে দলীয়ভাবে মেম্বার/চেয়ারম্যান  নির্বাচিত হওয়ায় পরিষদ অফিস দলীয় অফিসে পরিনত হয় এবং সবসময় দলীয় নেতা-কর্মী দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে।তাছাড়া উন্নয়ন কর্মকান্ডসহ প্রতিটি কাজে চাঁদাবাজির ক্ষেত্র সৃষ্টি  হয়।স্থাবর সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়, বাড়ি ঘর নির্মাণ,জন্ম নিবন্ধন সনদ,জাতীয়তার সনদ,ওয়ারিশ সনদ ইত্যাদি সংগ্রহে যথেষ্ট হয়রানির সম্মুখীন হতে হয় এবং  মোটা অংকের অর্থ ব্যয় করতে হয়।মাঠ পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাদের সাথে জনগণের সম্পর্ক হতে হবে সৌহার্দপূর্ণ। কিন্তু তার পরিবর্তে বিপরীত অবস্থা গড়ে উঠে।দলীয় সমর্থন থাকায় বিশেষ করে এমপির কৃপা দৃষ্টির কারনে চরমভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার হতে দেখা যায়।চেয়ারম্যানগণ স্থানীয় এমপির ক্যাশিয়ার হিসেবেও পরিচিতি পায়।এভাবেই তারা গ্রামীণ জনপদে ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
       বর্তমানে চেয়ারম্যানগণ তার অধিকৃত এলাকায় অবস্থিত স্কুল,কলেজ,মাদ্রাসায় খবরদারি করে থাকে।শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারিত না থাকায় যে কোনো ব্যক্তির পক্ষে চেয়ারম্যান ও মেম্বার নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ থাকে। অনেক অশিক্ষিত চেয়ারম্যান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সম্মানিত শিক্ষকদের উপর মাতব্বরি করতে দ্বিধাবোধ করেন না।বর্তমানে শিক্ষার হার অনেক বেড়েছে। সুশিক্ষিত ব্যক্তি এসব প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান-মেম্বার পদে অধিষ্ঠিত হলে প্রতিষ্ঠানসমূহ শক্তিশালী হবে,জনগণের সেবারমান বৃদ্ধি পাবে এবং মাঠ পর্যায়ে ন্যায় নীতি ও ন্যায্যতা নিশ্চিত  হবার সম্ভাবনা থাকবে।এ বিবেচনায় চেয়ারম্যান পদের  শিক্ষাগত যোগ্যতা অন্যূন স্নাতক এবং মেম্বারদের উচ্চ মাধ্যমিক নির্ধারণ করা যেতে পারে।নির্বাচন পদ্ধতি দলীয়মুক্ত করে পূর্বের ন্যায় নির্দলীয়ভাবে অনুষ্ঠানের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া যায়।স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের দাখিলকৃত প্রতিবেদনের সুপারিশমালায় চেয়ারম্যানদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নূন্যতম স্নাতক নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে।জনগনের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত মেম্বারদের মধ্য হতে এবং মেম্বারদের ভোটে একজনকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করার কথা বলা হয়েছে।আলোচ্য বিষয়টি সরকার নিশ্চয় গভীরভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।তবে মেম্বারদের দ্বারা চেয়ারম্যান নির্বাচনের সুযোগ রাখা হলে আর্থিকভাবে স্বচ্ছল বা ধণী মেম্বারগণ চেয়ারম্যান হওয়ার লক্ষে টাকার বিনিময়ে মেম্বারদের ভোট ক্রয়ের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়বে। এতে এক ধরনের অনৈতিক ও অশুভ প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হবে এবং বাণিজ্যের সুযোগ সৃষ্টির আশংকাও দেখা দেবে। যারা টাকা বিনিয়োগ করে চেয়ারম্যান হবেন তাদের নিকট ভালো কিছু প্রত্যাশা করা যাবে না এবং  জনগণের প্রত্যাশাও পূরণ হবে বলে মনে হয় না।
      বর্তমান পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে অনেক রাজনৈতিক দল আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে  ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভার নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবী জানাচ্ছে।অপরদিকে কতিপয় রাজনৈতিক দল এর বিরোধিতা করে সংসদ নির্বাচনের পর এসব নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলছে।দেশে প্রশাসন ও আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো সম্পূর্ণ  স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল হয়নি।অহরহ মব সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটছে। এরকম অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে গ্রামীণ জনপদ উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে।এতে বিশৃঙ্খলা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির আশংকা থেকে যায়। আশাকরি সরকার জানমালের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে এ ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
(লেখক অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা)