সুবিধা বঞ্চিত, হত দরিদ্র মানুষের অভিভাবক এবং মানবিক ডাক্তার হিসেবে সুপরিচিত মরহুম ডাক্তার ফিরোজ আহমেদ চৌধুরী ১৯২৪ সালে চট্টগ্রাম জেলার রাউজান উপজেলার অন্তর্গত গহিরা গ্রামস্থ বক্স আলী চৌধুরী বাড়ির এক সম্ভ্রান্ত ও বনেদি মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন।তাঁর পিতার নাম মরহুম হামদু মিয়া চৌধুরী।তিনি শৈশবকাল থেকে অত্যন্ত শান্তশিষ্ট ও প্রখর মেধাবী ছিলেন বলে জানা যায়।কৃতিত্বের সাথে মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় পাস করার পর তৎকালীন বেংগল স্টেট মেডিকেল ফ্যাকাল্টির অধীন চট্টগ্রাম মেডিকেল স্কুলে চার বছর মেয়াদী এলএমএফ ( লাইসেন্সশিয়েট অব মেডিকেল ফ্যাকাল্টি) কোর্সে ভর্তি হন এবং সফলতার সাথে উক্ত কোর্স সম্পন্ন করেন।এলএমএফ কোর্সটি তৎকালীন "স্টেট মেডিকেল ফ্যাকল্টি(রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদ, বর্তমানে বিএমডিসি)" কর্তৃক স্বীকৃত ছিল। উল্লেখ্য যে, ১৯৪৬ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার পূর্বে এদেশে এমবিবিএস কোর্স চালু হয়নি।সে সময়ে এলএমএফ পাস করা ডাক্তারগণ সারাদেশের বেশিরভাগ অঞ্চলে চিকিৎসা সেবা প্রদান করতেন।
ডাক্তার ফিরোজ আহমেদ চৌধুরী এলএমএফ পাস করার পর প্রথমে সরকারি হাসপাতালে কিছু সময় সহকারী সার্জন হিসেবে কাজ করেন।পরবর্তীতে নিজ জন্মস্থান গহিরাস্থ কালা চাঁন চৌধুরী বাজারে চেম্বার খুলে চিকিৎসা সেবা প্রদান শুরু করেন। সে সময়ে পার্শ্ববর্তী ৩/৪টি ইউনিয়নে রেজিস্টার্ড ও কোয়ালিফাইড কোনো চিকিৎসক ছিলেন না।ফলে একমাত্র রেজিস্টার্ড চিকিৎসক হিসেবে তাঁর চেম্বারে প্রচুর রোগীর সমাগম হতো।তিনি মনোযোগ সহকারে রোগীর যাবতীয় বৃত্তান্ত জেনে ভেবে চিন্তে চিকিৎসাপত্র প্রদান করতেন।তাঁর প্রদত্ত চিকিৎসায় বেশিরভাগ রোগী সুস্থ ও রোগমুক্ত হতেন।কথিত আছে উনি রোগীর গায়ে হাত বুলিয়ে দিলে রোগী সুস্থ হয়ে যেতেন।রোগীরা নিজের ইচ্ছানুসারে 'ফি' কিংবা ভিজিট দিতেন আবার গরীব রোগীদের নিকট থেকে কেনো 'ফি' নিতেন না। রোগীদের প্রতি আন্তরিকতা ও সহানুভূতি প্রদর্শন,ভালো ব্যবহার,মনোযোগ সহকারে রোগীর সমস্যাদি অবহিত হওয়া,সুপরামর্শ ও যথাযথ চিকিৎসা প্রদানের কারনে তাঁর সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।ফলশ্রুতিতে প্রতিদিন উনার কাছে অনেক দুর-দুরান্ত থেকেও প্রচুর রোগী আসতেন।দক্ষ ও অভিজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে উনার সুখ্যাতি ছিল প্রচুর।সহজেই সঠিক ও নির্ভুলভাবে রোগ নির্ণয় করে চিকিৎসা প্রদানে পারদর্শী ছিলেন।রোগীর সাথে কথোপকথনের সময়ে রোগীর আর্থিক অবস্থা অবহিত হতেন।গরীব,অসহায় রোগীদেরকে বিনা 'ফি'তে চিকিৎসা সেবা এবং ঔষধপত্র নিজের থেকে প্রদান করতেন।এক পর্যায়ে পার্শ্ববর্তী গ্রামসমূহের অসহায়,হতদরিদ্র, সুবিধা বঞ্চিত মানুষকে সহায়তা প্রদানের লক্ষে ধনী,সামর্থ্যবান রোগীদের নিকট থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে একটি মিসকিন ফান্ড সৃষ্টি করেন।অত:পর হতদরিদ্র ও অভাবী মানুষের তালিকা তৈরি করে তাদেরকে প্রতি সপ্তাহের রোববার ও বুধবার প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা প্রদান করতেন।এ সহায়তা মৃত্যুর পুর্ব পর্যন্ত বহাল ছিল।চিকিৎসা করে যা আয় হতো তা থেকে পরিবারের নূন্যতম প্রয়োজন মিটিয়ে অবশিষ্ট অর্থ মিসকিন ফান্ডে দান করতেন।
তিনি অত্যন্ত সাদাসিধা জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিলেন।গ্রামের সাধারণ মানুষের মতো একটি টিনের চালা কাঁচাঘরে পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করতেন।লাখ লাখ টাকা আয় করার এবং বিলাসবহুল জীবন যাপনের পর্যাপ্ত সুযোগ থাকা সত্বেও তা পরিহার করেছিলেন। অর্থলিপ্সা,
আভিজাত্য ও বিলাসিতা উনাকে স্পর্শ করতে পারেনি।তিনি ছিলেন নিরহঙ্কার ও সদালাপী একজন সাদামনের মানুষ। অত্যন্ত ধার্মিক ও সময়মতো ধর্মীয় কাজ সম্পাদনে তৎপর থাকতেন।সর্বদাই আল্লাহর উপর নির্ভর করতেন এবং প্রতিটি কাজে আল্লাহ পাককে স্মরণ করে তাঁর রহমত কামনা করতেন। সারাটা জীবন মানব কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন।নোয়াজিশপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন সাবেক প্রধান শিক্ষকের নিকট থেকে জানা যায় তিনি পবিত্র হজ্জ পালন অবস্থায় পবিত্র মক্কা শরীফে নামাজ আদায়কালে উনার ডান পাশে ডাক্তার ফিরোজ আহমেদ চৌধুরীকে নামাজ আদায়রত অবস্থায় দেখতে পান।নামাজের সালাম শেষ করে দেখেন উনি নেই। ভদ্রলোক হজ্জ পালন শেষে দেশে প্রত্যাবর্তন করে জানতে পারেন ডাক্তার সাহেব হজ্জ পালনে মক্কা শরীফ গমণ করেননি। উনার মেজ সন্তান বন্ধুবর নেওয়াজ উদ্দিন চৌধুরী (নৌ বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) আমার স্কুল জীবনের সতীর্থ।তাঁদের পিতা একজন খ্যাতিমান ও কীর্তিমান চিকিৎসক হওয়া সত্বেও তাদেরকে অত্যন্ত সাধারণ জীবন যাপন করতে দেখেছি ।তারাও বাবার মতো জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়েছেন।তাদের মধ্যেও অহঙ্কার, আত্মম্ভরিতা ও বিলাসিতা পরিলক্ষিত হয়নি।
মানব দরদী ও মানবিক গুণে গুণান্বিত এ মহান চিকিৎসক বিগত ২৫-০২-১৯৯৬ তারিখে প্রায় ৭২ বছর বয়সে মহান আল্লাহ পাকের ডাকে সারা দিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন।তাঁর মৃতুতে রাউজানের গহিরা,মোবারেকখীল,পশ্চিম গহিরা,দলইনগর,কোতোয়ালিঘোনা,চিকদাইর,নোয়াজিশপুর, বিনাজুরি ইত্যাদি এলাকার হাজার হাজার মানুষ শোকার্ত ও শোকে বিহ্বল হয়ে পড়ে।উক্ত এলাকাসমূহের অসহায়, হতদরিদ্র, সুবিধা বঞ্চিত জনগোষ্ঠী একজন ত্রাণকর্তা ও অভিভাবককে হারায়।উনার কাছে ধর্ম,বর্ণের কোনো ভেদাভেদ ছিলনা।ছিল না কোনো রাজনৈতিক পরিচয়।তিনি আজীবন সকল ধর্মের মানুষকে নিরলসভাবে সেবা ও সহায়তা প্রদানে সচেষ্ট ছিলেন।তাঁর এ মানবিকতা, মহানুভবতা ও মানব সেবার স্বীকৃতির দাবী রাখে।উনার ত্যাগ ও কর্মকে সম্মান জানানোর লক্ষে উনাকে 'চট্টগ্রাম সমিতি পদক', 'একুশে পদক' বা যে কোনো রাষ্ট্রীয় পদক প্রদানে প্রচেষ্টা চালানো যেতে পারে। উল্লিখিত এলাকায় অনেক সম্মনিত ব্যক্তিবর্গ রয়েছেন যাঁরা চেষ্টা করলে এটা সম্ভব হতে পারে।যদিও তিনি কেনো সম্মাননা বা পুরস্কারের জন্য মানব সেবায় নিজেকে উজার করে সমর্পন করেননি।তথাপি প্রজন্মের দায়বদ্ধতা, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুরূপ ভালো কাজে উৎসাহিত করা ও ভালো মানুষ গড়ার দৃষ্টান্ত সৃষ্টির জন্য পদক্ষেপ নেওয়া সমীচীন হবে বলে প্রতীয়মান হয়।উনার জীবন,কর্ম ও পেশার উপর গবেষণা হলে সমাজ,রাষ্ট্র ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম উপকৃত হবে।সীমাহীন ত্যাগ,অকৃত্রিম মানব সেবা,মানব কল্যাণ, মানুষের প্রতি অফুরন্ত ভালোবাসার জন্য উনি আজীবন এলাকার মানুষের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। মহান আল্লাহ পাক এ মহান মানব দরদী চিকিৎসককে জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করুন।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তা
মরহুম ফিরোজ আহমেদ চৌধুরী-একজন মানবিক ডাক্তার
---আইয়ুব চৌধুরী---
ডা: ফিরোজ আহমেদ