বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সাম্প্রতিক পরিবর্তন এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালের পর তাঁর জানাজায় মানুষের বিপুল উপস্থিতি আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে,তিনি শুধু একটি দলের নেত্রী ছিলেন না, ছিলেন বহু মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। একই সঙ্গে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করে আজ তারেক রহমানের ওপর এসে পড়েছে এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব।

দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকট ও দমন-পীড়নের পর জনগণের রায়ে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে,এটি শুধু রাজনৈতিক পালাবদল নয়, বরং একটি নতুন প্রত্যাশার সূচনা। আগামী পাঁচ বছর তারেক রহমানের নেতৃত্ব বাংলাদেশের গণতন্ত্র, অর্থনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার ও নেতৃত্বের দায়

জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে দুটি শক্তিশালী অধ্যায় সৃষ্টি করেছেন। জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ভিত্তি গড়ে তুলেছিলেন। বেগম খালেদা জিয়া তাঁর সরকারের সময়ে অবকাঠামো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেন।

এই ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার বহন করে তারেক রহমানের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ,যোগ্য ও সৎ নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত স্থাপন করা। রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা ধরে রাখা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষতা ও দূরদর্শিতার প্রমাণ দেওয়া আরও গুরুত্বপূর্ণ।

দীর্ঘ নিপীড়নের স্মৃতি ও ত্যাগের মূল্যায়ন

গত প্রায় ১৭ বছর বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা নানা ধরনের রাজনৈতিক নিপীড়ন, মামলা, গ্রেপ্তার ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। অনেকেই আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রেখে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে চরম সংকটে পড়েছেন।

রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে এই ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করা তারেক রহমানের জন্য নৈতিক ও রাজনৈতিক উভয় দিক থেকেই জরুরি। যারা প্রকৃত অর্থে আন্দোলন সংগ্রামে অবদান রেখেছেন, তাঁদের রাষ্ট্রীয় ও দলীয় কাঠামোতে সম্মানজনক সুযোগ দেওয়া হলে দলীয় ঐক্য ও সাংগঠনিক শক্তি সুদৃঢ় হবে।

হাইব্রিড রাজনীতি ও সুযোগসন্ধানীদের চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে ‘হাইব্রিড’ রাজনীতিবিদের উত্থান নতুন নয়। সুবিধাবাদী অনেক ব্যক্তি রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করে দলীয় পদ-পদবি বা রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করেন। এই প্রবণতা গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির জন্য বড় পরীক্ষা হলো,যোগ্যতা, সততা ও ত্যাগের ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্বাচন করা। মন্ত্রিসভা ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে পরীক্ষিত ও দক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ দিলে রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষতা বাড়বে এবং দুর্নীতির সুযোগ কমবে।

জনগণের প্রত্যাশা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা

সাধারণ মানুষের প্রধান উদ্বেগ এখন জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা। দীর্ঘ সময় ধরে মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সংকট ও সামাজিক বৈষম্য মানুষের জীবনকে চাপে ফেলেছে।

তারেক রহমানের সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত,সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন। কৃষি, শিল্প, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ উন্নয়নে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে অর্থনীতিতে গতি আসবে। বিশেষ করে তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচি দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

কঠিন সিদ্ধান্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার

রাষ্ট্র পরিচালনায় জনপ্রিয় সিদ্ধান্তের পাশাপাশি কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহসও প্রয়োজন। প্রশাসনিক সংস্কার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাচন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রম,এসব ক্ষেত্রে দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার জরুরি।

তারেক রহমানের সামনে সুযোগ রয়েছে,শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার। ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতি থেকে বেরিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল হবে।

গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও জাতীয় ঐক্য

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভাজন ও বৈরিতা প্রায়ই উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

তারেক রহমানের নেতৃত্বে একটি নতুন ধারা সূচিত হতে পারে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু তা যেন রাষ্ট্র পরিচালনার পথে অন্তরায় না হয়,এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।

পররাষ্ট্রনীতি ও বৈশ্বিক অবস্থান

বাংলাদেশ এখন একটি উদীয়মান অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জলবায়ু পরিবর্তন ও নিরাপত্তা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো জরুরি।

তারেক রহমানের নেতৃত্বে ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করা হলে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মর্যাদা আরও বাড়বে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।

নৈতিক নেতৃত্ব ও সুশাসনের প্রতিশ্রুতি

সমসাময়িক রাজনীতিতে জনগণের প্রধান দাবি সুশাসন। উন্নয়ন প্রকল্পের পাশাপাশি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা এখন রাজনৈতিক বৈধতার অন্যতম শর্ত।

তারেক রহমান যদি দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেন এবং নৈতিক নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, তবে জনগণের আস্থা দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠিত হবে।

আগামী পাঁচ বছর: সম্ভাবনা ও পরীক্ষার সময়

আগামী পাঁচ বছর বাংলাদেশের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার সময়। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সুযোগ রয়েছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি যদি জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে, তবে এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে।

অন্যদিকে, যদি দলীয় স্বার্থ, সুবিধাবাদী রাজনীতি ও দুর্বল শাসনব্যবস্থা প্রাধান্য পায়, তবে জনগণের আস্থা আবারও ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।

 

তারেক রহমানের সামনে ইতিহাসের এক কঠিন কিন্তু সম্ভাবনাময় পথ। জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকার বহন করে তাঁকে দক্ষতা, সততা ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হবে। ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন, হাইব্রিড রাজনীতি থেকে মুক্ত থাকা, যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচন এবং জনগণের চাহিদাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া,এই চারটি স্তম্ভই আগামী পাঁচ বছরে তাঁর নেতৃত্বের সফলতা নির্ধারণ করবে।

বাংলাদেশের জনগণ এখন শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, বাস্তব উন্নয়ন ও সুশাসন চায়। তারেক রহমান যদি এই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেন, তবে তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা নয়, বরং একটি যুগের রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

লেখক: সংবাদকর্মী, কলামিস্ট ও সমাজকর্মী।