দেশের অর্থনীতির প্রাণখ্যাত কর্ণফুলী নদী দখলমুক্ত করার একের পর এক আদালতের রায় থাকলেও থমকে আছে নতুন মাছ বাজার উচ্ছেদ। আনু মাঝির ঘাট থেকে হালদার মোহনা পর্যন্ত নদীতীর রক্ষা ও অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের নির্দেশ থাকলেও অদৃশ্য কারণে বাস্তবে কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
আজ উচ্ছেদ, তো কালই সেই জায়গায় নতুন করে স্থাপনা—বছরের পর বছর এভাবেই চলছে নদীতীর দখলের কানামাছি খেলা। কেউ গড়ে তুলেছে মাছ বাজার ও বরফ কল, কেউ বানিয়েছে বাস-ট্রাক স্ট্যান্ড, আবার কোথাও বসেছে নৌ-পারাপারের ঘাট। গড়ে উঠেছে নানা ব্যবসা-বাণিজ্যের দোকানপাট।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বন্দর ও জেলা প্রশাসনের লুকোচুরি খেলায় মরতে বসেছে কর্ণফুলী। প্রায় ২৫০ মিটার নদীভূমি দখল করে গড়ে উঠেছে অবৈধ মাছ বাজার ও বরফ কল। আদালতের বারবার রায় আসার পরও জেলা প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো উচ্ছেদ উদ্যোগ নেই—যেন ‘শস্যের ভিতরে ভূত’।
নদীর বুকে জেগেছে চর, কমেছে গভীরতা
বন্দর কর্তৃপক্ষ ক্যাপিটাল ড্রেজিং সম্পন্ন করার দাবি করলেও চট্টগ্রাম নদী ও খাল রক্ষা আন্দোলনের চলমান জরিপে দেখা গেছে, মাছ বাজার থেকে প্রায় ৩০০ মিটার দক্ষিণে নদীর মাঝ বরাবর প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিশাল চর জেগে উঠেছে। ফলে এ অংশে নদীর প্রবাহ সঙ্কুচিত হয়ে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩০০ থেকে ৩৫০ মিটার।
অথচ ২০১৪ সালে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রণীত কর্ণফুলী রক্ষা সংক্রান্ত স্ট্র্যাটেজিক মাস্টার প্ল্যানে নদীর প্রস্থ উল্লেখ ছিল প্রায় ৯৩৫ মিটার। বাস্তব চিত্র তার সম্পূর্ণ বিপরীত।
ব্যয় বেড়েছে, ফল মিলছে না
২০১৮ সালের মে মাসে ফিরিঙ্গিবাজার ফেরিঘাট থেকে শাহ আমানত সেতু অতিক্রম করে শিকলবাহা খালের মোহনা পর্যন্ত কর্ণফুলী খননের জন্য ২৫৮ কোটি টাকায় নৌবাহিনীর সঙ্গে চুক্তি করে বন্দর। পরে ২০২১ সালে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৩২১ কোটি টাকায়।
বন্দর কর্তৃপক্ষ ড্রেজিং শেষ করার কথা বললেও অভিযোগ উঠেছে—নদীর অংশ দখল করে ভরাটের মাধ্যমে মাছ বাজার গড়ে তোলায় তারাই ভূমিকা রেখেছে। সম্প্রতি হাইকোর্টে পাঠানো জবাবে বিভাগীয় কমিশনার উল্লেখ করেছেন, বন্দর নিজেদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে কর্ণফুলী দখল করে মাছ বাজার স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে।
সরে জমিনে যা দেখা গেল
ভাটার সময় শাহ আমানত সেতুর মাঝ পিলারের কাছে জেগে ওঠা চরে জেলেদের মাছ ধরতে দেখা যায়। চাক্তাই ও রাজাখালী খালের মোহনাতেও নদীর গভীরতা নেমে এসেছে দুই থেকে আড়াই মিটারে। স্থানীয়দের মতে, মাছ বাজার স্থাপনের ফলে কর্ণফুলী নদীর অর্ধেকের বেশি অংশ ভরাট হয়ে গেছে।
লিজ নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য
মাছ বাজার ব্যবসায়ী সমিতির নেতা দাবিদার মোহা. আলি কখনও বলছেন সোনালী মৎস্যজীবী সমিতির নামে বন্দর থেকে লিজ নেওয়া হয়েছে এবং বার্ষিক রাজস্ব দেওয়া হয়। আবার কখনও দাবি করছেন, ১০৩টি দোকানের ভাড়া হিসেবে জাতীয় মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেডকে মাসিক প্রায় ৪ লাখ টাকা পরিশোধ করা হচ্ছে, বাকি ১৪২টি দোকান সমিতির নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে।
অন্যদিকে, জাতীয় মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি মো. সোলাইমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্রশ্ন রয়ে গেল
আদালতের রায়, শতকোটি টাকার প্রকল্প, বারবার জরিপ—সবকিছুর পরও কেন থামছে না দখল ও ভরাট? দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই নদী কি প্রশাসনিক গাফিলতি আর প্রভাবশালীদের দখলদারিত্বের কাছে হার মানছে?
কর্ণফুলী বাঁচাতে এখন কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপই দেখার অপেক্ষায়