---মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী---
অভিযোগ রয়েছে কিছু ক্ষেত্রে আন্দোলনকারী নেতাকর্মীদের পুলিশের কাছে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করে তুলে দেওয়া হয়েছে। এইটা তো সাংবাদিকতার নৈতিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সাংবাদিকের কাজ তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশ করা, কোনো পক্ষের হয়ে দমন-পীড়নের হাতিয়ার হয়ে ওঠা নয়।
সাংবাদিকতা একটি মহান পেশা। সমাজে সত্য প্রকাশ, ক্ষমতার অপব্যবহার তুলে ধরা এবং জনগণের কাছে নিরপেক্ষ তথ্য পৌঁছে দেওয়াই একজন প্রকৃত সাংবাদিকের প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবতা হলো অনেক সময় সাংবাদিকতার এই মৌলিক নীতির পরিবর্তে ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক পক্ষপাত সামনে চলে আসে। তখন প্রশ্ন ওঠে, সাংবাদিকতা কি সত্যিই তার নৈতিক অবস্থানে আছে, নাকি তা কোনো না কোনো রাজনৈতিক স্বার্থের ছায়ায় পরিচালিত হচ্ছে?
সম্প্রতি চট্টগ্রামে কিছু সাংবাদিকের আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠছে কিছু সাংবাদিক বিএনপির বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে সমালোচনামূলক বা নেতিবাচক লেখা প্রকাশ করছেন। সমালোচনা বা প্রশ্ন তোলা সাংবাদিকতার স্বাভাবিক অংশ। কোনো রাজনৈতিক দলই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সমালোচনা কি সব দলের ক্ষেত্রে সমানভাবে করা হচ্ছে? নাকি তা নির্বাচিতভাবে কোনো নির্দিষ্ট দলের বিরুদ্ধে পরিচালিত হচ্ছে?
অনেকেই জানতে চাইছেন, যারা আজ বিএনপির বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে লিখছেন, তারা কি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে একইভাবে লিখেছেন? গণতান্ত্রিক সমাজে ক্ষমতাসীনদের সমালোচনা করা সাংবাদিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কারণ ক্ষমতার কেন্দ্রে যারা থাকেন, তাদের কর্মকাণ্ডই সবচেয়ে বেশি জনস্বার্থের সঙ্গে যুক্ত থাকে। তাই সাংবাদিকতার সাহস ও সততা সবচেয়ে বেশি পরীক্ষা হয় তখনই, যখন ক্ষমতাসীনদের ভুল বা অনিয়ম তুলে ধরার প্রশ্ন আসে।
আরও একটি প্রশ্ন সামনে আসে আন্দোলন-সংগ্রামের সময় সাংবাদিকদের ভূমিকা নিয়ে।
সাংবাদিকতা যখন নিরপেক্ষ থাকে না, তখন সমাজে আস্থার সংকট তৈরি হয়। মানুষ সংবাদমাধ্যমকে তখন আর নির্ভরযোগ্য তথ্যের উৎস হিসেবে দেখে না। বরং মনে করে, সংবাদও রাজনৈতিক লড়াইয়ের একটি হাতিয়ার হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতি শুধু সাংবাদিকতার জন্যই নয়, পুরো সমাজ ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর।
সাংবাদিকতার মূল শক্তি হলো বিশ্বাসযোগ্যতা। এই বিশ্বাসযোগ্যতা গড়ে ওঠে নিরপেক্ষতা, সাহস এবং নৈতিকতার ওপর ভিত্তি করে। একজন সত্যিকারের সাংবাদিক কখনোই ক্ষমতার কাছে মাথা নত করেন না, আবার কোনো রাজনৈতিক দলের অন্ধ সমর্থকও হন না। তিনি সত্যের পক্ষে থাকেন, সেটি যে দলের বিরুদ্ধেই যাক না কেন।
বাংলাদেশের ইতিহাসে অনেক সাহসী সাংবাদিকের উদাহরণ রয়েছে, যারা প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও সত্য প্রকাশের জন্য আপসহীন ছিলেন। তারা দেখিয়েছেন, সাংবাদিকতা কোনো ব্যক্তিগত লাভের পথ নয়; এটি একটি সামাজিক দায়িত্ব।
সুতরাং আজ যখন সাংবাদিকতার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, তখন প্রয়োজন আত্মসমালোচনা ও পেশাগত নীতিতে ফিরে যাওয়ার। সমালোচনা অবশ্যই থাকবে, কিন্তু তা হতে হবে সবার জন্য সমান। কারণ একপক্ষকে আক্রমণ আর অন্যপক্ষকে নীরব সমর্থন দেওয়া সাংবাদিকতা নয়,এটি পক্ষপাত।
সমাজে একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে “ইট মারলে পাটকেল খেতে হয়।” অর্থাৎ অন্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার আগে নিজের অবস্থানও পরিষ্কার রাখতে হয়। সাংবাদিকদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি প্রযোজ্য। যদি সাংবাদিকরা সত্যিই নৈতিকতা ও নিরপেক্ষতার অবস্থানে থাকেন, তাহলে তাদের লেখনী হবে সবার জন্য সমানভাবে কঠোর এবং ন্যায্য।
শেষ পর্যন্ত মনে রাখতে হবে সাংবাদিকতা কোনো রাজনৈতিক দলের মুখপত্র হওয়ার জন্য নয়। এটি সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর একটি দায়িত্বশীল পেশা। আর সেই দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই সাংবাদিকরা সমাজে তাদের মর্যাদা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখতে পারেন।
লেখক: সংবাদকর্মী, কলামিস্ট ও সমাজকর্মী।