সংগ্রামী গৃহবধূ থেকে বিএনপির নেতৃত্ব, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের কয়েক দশকের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
আজ ১৫ আগস্ট। বিএনপির চেয়ারপারসন ও বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিন। ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যুর পর এবারই প্রথম তাঁর জন্মদিন তাঁকে ছাড়া পালিত হচ্ছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি যেমন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছেন, তেমনি রাজপথের আন্দোলন, কারাবাস, রাজনৈতিক সংকট ও ব্যক্তিগত শোকের মধ্য দিয়েও পথ চলেছেন।
তাঁর রাজনৈতিক জীবনকে ঘিরে রয়েছে যেমন ব্যাপক সমর্থন ও ভালোবাসা, তেমনি রয়েছে রাজনৈতিক বিরোধিতা ও বিতর্ক। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
গৃহবধূ থেকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে প্রবেশ ছিল প্রচলিত রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরাধিকারসূত্রে নয়। স্বামী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯৮১ সালের হত্যাকাণ্ডের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হয়। পরের বছর বিএনপির নেতাকর্মীদের আহ্বানে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হন।
বিএনপির তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮২ সালের জানুয়ারিতে তিনি দলের প্রাথমিক সদস্য হন। ১৯৮৩ সালে পান সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব এবং ১৯৮৪ সালের ১০ মে বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
একজন ব্যক্তিগত জীবনকেন্দ্রিক গৃহবধূ থেকে কয়েক বছরের মধ্যে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্বে উঠে আসা ছিল বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা।
এরশাদবিরোধী আন্দোলনে রাজপথের নেতৃত্ব
১৯৮২ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ক্ষমতা গ্রহণের পর দেশে সামরিক শাসন ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। সেই সময় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে বিরোধী দলগুলো আন্দোলনে নামে।
বেগম খালেদা জিয়া বিএনপির নেতৃত্বে সেই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন। ১৯৮৩ সালে সাতদলীয় জোট গঠনসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে এরশাদবিরোধী আন্দোলনকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁকে একাধিকবার আটক ও গৃহবন্দি করা হয়।
১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের পর ৬ ডিসেম্বর এরশাদের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে সামরিক শাসনের অবসান ঘটে। এই আন্দোলনে তাঁর দৃঢ় অবস্থানের কারণে রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
১৯৯১: প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সবচেয়ে বড় দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। বেগম খালেদা জিয়া নিজে পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবগুলোতেই জয়ী হন। ২০ মার্চ তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
তাঁর প্রথম মেয়াদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা ছিল সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা। ১৯৯১ সালের সাংবিধানিক সংশোধনের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রপতি-শাসিত কাঠামো থেকে বাংলাদেশ আবার সংসদীয় পদ্ধতিতে ফিরে যায়।
একজন নারী হিসেবে সরকারপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যেমন নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে, তেমনি দেশের নারীদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও তা একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে।
শিক্ষা, নারী ক্ষমতায়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনার অধ্যায়
বেগম খালেদা জিয়ার সরকারগুলোর সময় শিক্ষা, নারীশিক্ষা, মেয়েদের উপবৃত্তি, অর্থনৈতিক সংস্কারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া হয়। তাঁর প্রথম সরকারের সময় প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ এবং নারী শিক্ষার প্রসারে বিভিন্ন কর্মসূচি উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠে।
বিএনপির তথ্য অনুযায়ী, তাঁর সরকারের সময়ে তৈরি পোশাক খাতে নারীদের কর্মসংস্থানও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
তাঁর সরকার বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বাজারমুখী সংস্কার, বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়। একই সঙ্গে তাঁর শাসনামল নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধিতা, নির্বাচনব্যবস্থা ও রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন বিষয়েও ব্যাপক বিতর্ক ছিল।
তিনবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব
১৯৯১ সালের পর ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি এবং ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনেও বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হন। ফলে তিনি মোট তিনবার বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন।
২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট নির্বাচনে জয়ী হলে তিনি তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। এই মেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো ও বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংঘাত ও বিভিন্ন বিতর্কও তাঁর সরকারের সময়কে আলোচিত করে রাখে।
এক-এগারো: জীবনের সবচেয়ে কঠিন রাজনৈতিক সময়
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় শুরু হয়। সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বেগম খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হন এবং দীর্ঘ সময় কারাবন্দি থাকেন।
এই সময় তাঁর বড় ছেলে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও গ্রেপ্তার হন। পরে চিকিৎসার জন্য তিনি বিদেশে যান। পরিবারের ওপর রাজনৈতিক ও আইনি চাপের সেই সময়টি বেগম খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত জীবনের অন্যতম কঠিন অধ্যায় হয়ে ওঠে।
একই সময়ে বিএনপির রাজনীতিতে তাঁর নেতৃত্ব আরও দৃঢ় হয় এবং দলীয় কর্মীদের কাছে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
মায়ের জীবনে আরেক গভীর শোক
রাজনীতির বাইরে বেগম খালেদা জিয়ার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল তিনি একজন মা।
তাঁর দুই সন্তান তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো।।দুজনের জীবনই রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে গেছে। ২০১৫ সালে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুর সংবাদ বেগম খালেদা জিয়ার জীবনে নেমে আনে গভীর শোক। বিদেশে থাকা অবস্থায় হৃদ্রোগে তাঁর মৃত্যু হয়।
সন্তান হারানোর সেই ব্যক্তিগত বেদনার মধ্যেও তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
কারাবাস, মামলা ও অসুস্থতা
বেগম খালেদা জিয়ার জীবনের শেষ রাজনৈতিক অধ্যায় ছিল দীর্ঘ আইনি লড়াই, কারাবাস এবং শারীরিক অসুস্থতায় পূর্ণ।
২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় সাজা হওয়ার পর তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে শারীরিক অসুস্থতার কারণে কারাগারের পরিবর্তে হাসপাতালে চিকিৎসা এবং ২০২০ সালের মার্চে সরকারের নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষ মুক্তি দেওয়া হয়। এরপর বিভিন্ন সময়ে তাঁর মুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হয়।
বয়স ও নানা জটিল অসুস্থতার কারণে পরবর্তী সময়ে তাঁর চিকিৎসা দেশের রাজনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে ওঠে।
২০২৪-এর রাজনৈতিক পরিবর্তন ও মুক্তি
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলন এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি সংসদ বিলুপ্ত করেন এবং বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়।
দীর্ঘ বন্দিত্ব ও শর্তসাপেক্ষ মুক্তির পর এই মুক্তি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করে। তবে তখন তাঁর শারীরিক অবস্থা অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
শেষ অধ্যায়
দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ থাকার পর ২০২৫ সালের শেষ দিকে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক শোকের সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করা হয় এবং তাঁকে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতা হিসেবে স্মরণ করা হয়।
তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।
শেষ বিদায়ে জনসমুদ্র
মৃত্যুর পর তাঁর শেষ বিদায়েও দেখা যায় বিপুল জনসমাগম। দলীয় নেতাকর্মী ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তাঁর জানাজায় অংশ নেন এবং শ্রদ্ধা জানান।
এই ব্যাপক জনসমাগম ছিল তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মানুষের সঙ্গে তৈরি হওয়া সম্পর্কের একটি দৃশ্যমান প্রতিফলন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অন্যতম প্রধান প্রতীক।
ইতিহাসে খালেদা জিয়ার অবস্থান কোথায়?
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক মূল্যায়ন একমাত্রিক নয়। তাঁর সমর্থকদের কাছে তিনি গণতন্ত্রের সংগ্রামী নেত্রী ও আপসহীন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কাছে তাঁর শাসনামল ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন ও সমালোচনা।
তবে ইতিহাসের বিচারে তাঁর গুরুত্ব অন্য জায়গায়।
একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে তিনি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে উঠে এসেছেন। সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯৯১ সালে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। তিনবার সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, কারাবাস, মামলা, অসুস্থতা ও ব্যক্তিগত শোকের মধ্যেও চার দশকের বেশি সময় বিএনপির নেতৃত্বে ছিলেন।
তাঁর রাজনৈতিক জীবন তাই শুধু একটি দলের ইতিহাস নয় বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন, ক্ষমতার পালাবদল, রাজনৈতিক সংঘাত এবং রাষ্ট্র পরিচালনার কয়েক দশকের ইতিহাসের সঙ্গেও তা গভীরভাবে যুক্ত।
জন্মদিনে ফিরে দেখা এক দীর্ঘ সংগ্রামের জীবন
আজ তাঁর জন্মদিনে বেগম খালেদা জিয়াকে স্মরণ করার অর্থ কেবল একজন প্রয়াত রাজনৈতিক নেত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা জানানো নয়; বরং বাংলাদেশের রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়কে ফিরে দেখা।
স্বামীর মৃত্যুর পর রাজনীতিতে প্রবেশ, এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনা, রাজনৈতিক সংকট, সন্তান হারানোর বেদনা, কারাবাস ও অসুস্থতা সব মিলিয়ে তাঁর জীবন ছিল উত্থান-পতন, সাফল্য-ব্যর্থতা ও সংগ্রামে পরিপূর্ণ।
সমর্থন কিংবা সমালোচনা যে দৃষ্টিকোণ থেকেই তাঁকে দেখা হোক, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়ার নাম একটি দীর্ঘস্থায়ী অধ্যায় হিসেবেই থাকবে।
জন্মদিনে তাই তাঁকে স্মরণ মানে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে স্মরণ করা একজন নারী কীভাবে প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতৃত্বে উঠে এসেছিলেন, সেই ইতিহাসকে স্মরণ করা।
বেগম খালেদা জিয়া নেই, কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর চার দশকেরও বেশি সময়ের নেতৃত্ব, সংগ্রাম ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার আগামী প্রজন্মের আলোচনায় থাকবেই।
লেখক: রাজনীতিবিদ, কলামিস্ট ও সমাজকর্মী