চট্টগ্রামের বালুচড়ায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কার্যালয়ে কোনো ধরনের পূর্বঘোষণা ছাড়াই বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার ঘটনায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন শত শত সেবাগ্রহীতা। সাড়ে তিন ঘণ্টার বেশি সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় কার্যত অচল হয়ে পড়ে বিআরটিএর দাপ্তরিক কার্যক্রম। একই সঙ্গে শত শত যানবাহনের চাপ ও মানুষের ভিড়ে চট্টগ্রাম-হাটহাজারী সড়কে সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট।
মোটরযানের কাগজপত্র জরিমানা ছাড়া হালনাগাদের সরকারি সুযোগের শেষ দিনে গতকাল এ ঘটনা ঘটে। বিআরটিএ কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, একটি গাড়ির কাগজপত্র হালনাগাদ নিয়ে মতবিরোধের জেরে পিডিবির ষোলশহর সাবস্টেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নের ঘটনা ঘটিয়েছেন। বিআরটিএর উপপরিচালকের দাবি, এর পেছনে বকেয়া বিলের চেয়ে ব্যক্তিগত ‘ইগো’ বেশি কাজ করেছে। তবে পিডিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ৮৩ হাজার টাকা বকেয়া বিলের কারণে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। পরে পুনরায় সংযোগ দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জরিমানা ছাড়া মোটরযানের কাগজপত্র হালনাগাদের সুযোগের শেষ দিন হওয়ায় সকাল থেকেই বাস, ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহন নিয়ে শত শত মানুষ বিআরটিএর বালুচড়াস্থ কার্যালয়ে ভিড় করেন। সকাল ৯টায় যথারীতি কার্যক্রম শুরু হলেও দেড় ঘণ্টা পর বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এতে বিআরটিএর পাশাপাশি কার্যালয়ের অভ্যন্তরে থাকা ব্যাংকের বুথের কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে পড়ে।
প্রথমে কর্মকর্তারা বিষয়টিকে লোডশেডিং মনে করলেও দুপুর ১টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না আসায় বিআরটিএর উপপরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ সানাউল হক পিডিবি ষোলশহরের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রকৌশলী মোহাম্মদ সানাউল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তখন তাঁকে জানানো হয়, বিআরটিএর বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। কারণ হিসেবে ৮৩ হাজার টাকা বকেয়া বিলের কথা উল্লেখ করা হয়।
বিআরটিএর উপপরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ সানাউল হক বলেন, আমাদের অফিসে প্রতি মাসে এক লাখ টাকার বেশি বিদ্যুৎ বিল আসে। ৮৩ হাজার টাকার রানিং বিলের জন্য কীভাবে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলো, তা আমার বোধগম্য নয়। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, আমাদের কোনো ধরনের পূর্ববার্তা না দিয়ে বিআরটিএ কম্পাউন্ডের বাইরে হাটহাজারী সড়কের ওপর স্থাপিত পোল থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে তাঁরা চলে যান।
তিনি অভিযোগ করেন, সংযোগ বিচ্ছিন্নের পেছনে বকেয়া বিলের চেয়ে ব্যক্তিগত ‘ইগো’ বেশি কাজ করেছে। কয়েক দিন আগে পিডিবির ষোলশহরের নির্বাহী প্রকৌশলী একটি গাড়ির কাগজপত্র হালনাগাদ করতে বিআরটিএতে পাঠান। কিন্তু আইনগত জটিলতার কারণে গাড়িটির কাগজপত্র হালনাগাদ করা সম্ভব হয়নি।
সানাউল হক ব্যাখ্যা করে বলেন, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ব্যবহৃত যানবাহনের ফিটনেস ও ট্যাক্স-টোকেন হালনাগাদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আইবাস কোডের অসংগতি রয়েছে। এ কারণে বিআরটিএর বিদ্যমান সফটওয়্যারে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে না। এটি কোনো কর্মকর্তার ব্যক্তিগত অনিচ্ছা কিংবা বিআরটিএ কর্তৃপক্ষের ইচ্ছাকৃত অসহযোগিতা নয়; বরং প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত জটিলতা।
তিনি আরও বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী উন্নয়ন প্রকল্প শেষ হওয়ার পর প্রকল্পের যানবাহন কেন্দ্রীয় পরিবহন পুলে জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে। প্রকল্প সমাপ্তির পর সংশ্লিষ্ট যানবাহন কোনো কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ব্যবহারের সুযোগ নেই। আইনগত কারণে গাড়িটির কাগজপত্র হালনাগাদ করা সম্ভব না হওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নের ঘটনা ঘটানো হয়েছে বলে তাঁর অভিযোগ।
বিআরটিএর আরেক কর্মকর্তা বলেন, একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অন্য প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক জটিলতা কিংবা মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু সেই সমস্যার সমাধান না করে আরেকটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগে ফেলা কতটা যৌক্তিক, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
এ বিষয়ে পিডিবি ষোলশহরের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রকৌশলী মোহাম্মদ সানাউল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘একটু সমস্যা হয়েছিল। ঠিক হয়ে গেছে তো।’ কী কারণে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল—এমন প্রশ্নের জবাব না দিয়ে তিনি দ্রুত ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।
এদিকে বেলা ২টার দিকে বিআরটিএ কার্যালয়ে পুনরায় বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়। তবে দীর্ঘ সময় কার্যক্রম বন্ধ থাকায় সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তি পুষিয়ে নিতে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রাত প্রায় ১০টা পর্যন্ত অফিস করেন। যেসব গ্রাহক ব্যাংকে টাকা জমা দিতে পেরেছিলেন, তাঁদের যানবাহনের কাগজপত্র হালনাগাদের কাজ সম্পন্ন করে দেওয়া হয়।