মোহাম্মদ আইয়ুব চৌধুরী
 

  আজ ২৬ অক্টোবর চট্টলতত্ত্ববিদ, মুক্তিযোদ্ধা,বুদ্ধিজীবি,একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও গবেষক মরহুম আবদুল হক চৌধুরীর ২৮তম মৃত্যু বার্ষিকী।তিনি ২৪ আগস্ট,১৯২২ সালে চট্টগ্রাম জেলার রাউজান উপজেলার অন্তর্গত  নোয়াজিশপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী এ মহান মানুষটি সম্পর্কের দিক দিয়ে আমার মায়ের চাচা,আমার নানা।শৈশব ও কৈশোরে নানা বাড়িতে  অবস্হানের কারনে উনাকে অতি কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি এবং তাঁর স্নেহধন্যও ছিলাম। তিনি সাদাসিধা ও সুশৃঙ্খল জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিলেন এবং তা পছন্দও করতেন।পিতা-মাতার একমাত্র ছেলে হিসেবে প্রচুর জমি জমার মালিক হওয়া সত্বেও তিনি ছিলেন নিরহঙ্কার একজন সাদা মনের  মানুষ। কখনো অহংকারী হতে কিংবা বিলাসবহুল জীবন যাপন করতে দেখিনি। সাধারণ ও খেটে খাওয়া মানুষের প্রতি ছিল তাঁর গভীর মমত্ববোধ ও ভালোবাসা।
    অসাধারণ মেধাবী,প্রতিভাধর ও প্রখর বুদ্ধিদীপ্ত হওয়ায় সামাজিক ন্যায় বিচারের জন্য খুবই দক্ষ ও অভিজ্ঞ বিচারক হিসেবে সর্বাধিক পরিচিত ছিলেন।তাই মানুষও ন্যায় বিচার প্রাপ্তির প্রত্যাশায় এবং বিপদে-আপদে বুদ্ধি,উপদেশ ও পরামর্শ গ্রহণের জন্য উনার কাছে ছুটে যেতেন।সামাজিক ন্যায় বিচার নিশ্চিত করনে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। 
     ছোটকাল থেকে দেখেছি নিয়মিত দৈনিক পত্রিকা,বই পড়া ও লেখালেখি নিয়ে মগ্ন থাকতেন।উনার মুখাবয়ব উপলব্ধি করলে উনাকে একজন দার্শনিকই মনে হবে।আমরা সবাই উনাকে ভয় পেতাম।উনি বাড়িতে অবস্হান করলে সবাই চুপচাপ থাকতো।কোন প্রকার হৈ- চৈ নয়।অথচ তিনি ছিলেন সহজ-সরল একজন উদার মনের মানুষ।তিনি সন্তানদের লেখাপড়া নিয়ে সবসময় সচেতন থাকতেন।শুধু তাই নয় বাড়ির অন্যান্য ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া,  চলাফেরা ও আচরনের ব্যাপারে সবসময় খোঁজ খবর ও নজর রাখতেন। খারাপ কিছু দৃষ্টি গোচর হলে তাৎক্ষণিকভাবে শাসন করতেন এবং ভুল ধরিয়ে দিয়ে শোধরানো নির্দেশ দিতেন।একদিন আমি নানাদের কাচারি ঘরে পড়ালেখা  করছিলাম। ঐ সময়ে
উনার তৃতীয় ছেলে শিক্ষাবিদ অধ্যাপক শহীদুল আমিন চৌধুরী (ডাক নাম নুরু)তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে রাস্ট্র বিজ্ঞান বিভাগে অনার্সে সবে ভর্তি হয়েছেন।সম্ভবতঃ পড়ার কক্ষে নুরু মামা কেউ একজনের সাথে কথা বলছিলেন।নানা পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় নুরু মামার কথা বলার আওয়াজ শুনে বললেন "ওয়া নুরু,নোয়া বই কিন্নু,বইত কি কি আছে পাতা উল্টাই চওনা"।এভাবেই তিনি সন্তানদেরকে পরোক্ষভাবে মৃদু সতর্ক করতেন। কখনো রাগ দেখাতেন না এবং উচ্চস্বরে কথাও বলতেন না। মৃদু ও যথোপযুক্ত শাসনের কারনে আল্লাহর রহমতে উনার প্রতিটি সন্তানই উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে প্রত্যেকেই স্ব-স্ব পেশাই প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন।
    ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্হান নেওয়ায় এবং অকুণ্ঠ সমর্থন জ্ঞাপন করায় তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন।গ্রেফতারের পর উনার উপর অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন চালানো হয় এবং উনার বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলাও দায়ের করা হয়।তখন তিনি ডায়াবেটিস,উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ছিলেন।ঐ সময়ে উনার ৩য় ছেলে শিক্ষাবিদ অধ্যাপক শহীদুল আমিন চৌধুরীও গ্রেফতার হন। আদালতের মাধ্যমে জামিন লাভের পর চট্টগ্রাম শহর থেকে গ্রামের বাড়িতে আসার পথে উনাকে একনজর দেখার জন্য যুদ্ধ চলাকালীন ঐ সময়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শত শত মানুষ গহিরা চৌমুহনীতে জমায়েত হয়েছিল।আমরাও সেখানে উপস্হিত ছিলাম। যা ছিল উনার প্রতি সাধারণ মানুষের গভীর মমত্ববোধ ও অপরিসীম ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। 
   সম্ভবতঃ ১৯৭২-৭৩ সালে মূল ঘরের সামনে একটি মাটির ঘর তৈরী করেন।ঘরটিকে লাইব্রেরীতে রুপান্তর করে সবসময় ঐ ঘরে বই-পুস্তক ও পুঁতি-পত্র নিয়ে অভিনিবিষ্ট থেকে লেখালেখিতে ব্যস্ত থাকতেন।ঐ ঘরে প্রবেশাধিকার ছিল সীমিত।উনি নিজে না ডাকলে কখনো কেউ প্রবেশ করতো না।সে ঘরেই বসেই সম্ভবতঃ তিনি প্রথম বই "চট্টগ্রামের ইতিহাস প্রসঙ্গ" প্রকাশের জন্য পান্ডুলিপির চূড়ান্ত কাজ সম্পন্ন করেন।যদিও বহু বছর পূর্ব থেকেই গবেষণা ও লেখালেখির কাজ শুরু করেছিলেন।বেশ কয়েকবার ঐ ঘরে প্রবেশ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে।তিনি কয়েকবার আমাকে ডেকে নিয়ে বসিয়ে ডিকটেশন দিতেন,আমি লিখতাম।আসলে উনি এসব কি লেখালেখি করছেন কিছুই বুঝতাম না।আমি একদিন সাহস করে জিজ্ঞেস করেছিলাম নানা 'এ কিসসা-কাহিনী লিখে কি করবেন'? উত্তরে বললেন সময় আসুক তখন বলবো।উনার লিখা প্রথম বই 'চট্টগ্রামের ইতিহাস প্রসঙ্গ' প্রকাশের পর স্বাক্ষরসহ  একটি কপি শুভেচ্ছা স্বরুপ আমাকে প্রদান করে বলেছিলেন ঐ সময়ে এ বইটির পান্ডুলিপি মুসাবিদা করা হয়েছিল।তিনি মৃত্যুর পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত ১২টি বই রচনা করেছেন।তাঁর লিখা একটি বই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগে পাঠ্যবই হিসেব অন্তর্ভুক্ত ও স্বীকৃতিপ্রাপ্ত।বৃহত্তর চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলের ইতিহাস ও সমাজ- সংস্কৃতি গবেষণায় অনন্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ বাংলাদেশ সরকারের দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ মর্যাদাপূর্ন বেসামরিক পুরস্কার একুশে পদকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন।জীবিতকালে তিনি অনেক সরকারি,বেসরকারি স্কুল,কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়,বিভিন্ন সমাজ উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা,সদস্য,প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন।তাঁর রচিত গ্রন্থাবলীতে বাংলাদেশের একটি বৃহত্তম অঞ্চলের অতীত ইতিহাস, তথ্যাবলী এবং হারিয়ে যাওয়া ও প্রচলিত সমাজ-সংস্কৃতি সুন্দরভাবে পরিস্ফুটিত হয়েছে যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম যুগে যুগে এসব সঠিক ইতিহাস ও তথ্যাবলী জানতে পারবে।
    আমার নানি ছিলেন একজন মহৎ ও উদার মনের মহীয়সী নারী।উনাকে রত্না গর্ভা নারীও বলা হয়ে থাকে।একজন সফল গৃহিনী হিসাবে সন্তানদের লালন-পালন সহ সংসার সামাল দিয়েছেন। নানার কোন কাজে তিনি হস্তক্ষেপ কিংবা ব্যাঘাত সৃষ্টি করেননি বরং সহায়তা করেছেন।
১৯৯৪ সালে মৃত্যুকালে উনার বয়স হয়েছিল ৭২ বছর।আরো কিছুদিন বেঁচে থাকলে জাতি উনার কাছ থেকে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেরও সঠিক ইতিহাস এবং সমাজ ও সংস্কৃতির সঠিক তথ্যাদি জানার সুযোগ পেত।উনার গবেষণা,কর্ম ও প্রকাশিত পুস্তকাদির বিষয়ে বিশিষ্টজনদের জ্ঞানগর্ভ আলোচনা/মূল্যবান অভিমত ইতোমধ্যে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।আমার দেখা এ মহান গবেষকের ব্যক্তিগত জীবনের কিছু স্মৃতি সংক্ষিপ্তভাবে প্রকাশ করলাম।উনার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও আত্মার শান্তি কামনা করছি। আল্লাহপাক উনাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন।