গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ-১৯৭২ অনুচ্ছেদ ৯০ (খ) তে বলা ছিল যে, রাজনৈতিক দলগুলির কেন্দ্রীয় কমিটিসহ সকল কমিটিতে ৩৩% নারী প্রতিনিধিত্ব ২০২০ সালের মধ্যে নিশ্চিত করতে হবে। ইতিমধ্যেই ২০২২ সাল অতিক্রম করেছে । তথাপি প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোসহ অন্য কোনো রাজনৈতিক দলই এই শর্ত পূরণে সক্ষম হয়নি।
নারী উন্নয়ন ফোরাম ও অপরাজিতা নেটওয়ার্ক আয়োজিত শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এসব কথা বলেন আনোয়ারা উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান মরিয়ম বেগম।
মঙ্গলবার সকালে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত এ সংবাদ সম্মেলনে মরিয়ম বেগম আরো বলেন, ইসি তে পাঠানো বা পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে ২৪ শতাংশ নারী নেতৃত্ব রয়েছে। বিএনপির সব পর্যায়ের কমিটিতে ১৫ ভাগ নারী সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। জাতীয় পার্টি (জাপা)-তে নারী প্রতিনিধিত্ব রয়েছে ২০ শতাংশ, আর আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বাধীন জাতীয়পার্টি-জেপিতে এই হার ১৬ শতাংশ। অন্যান্য দলের মধ্যে সিপিবি তে ১৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ ও জাসদে ১১ দশমিক ৯২ শতাংশ নারী নেতৃত্ব রয়েছে। এনপিপির ২০ শতাংশ, বাংলাদেশ মুসলিমলীগ ৬ শতাংশ, গণতন্ত্রী পার্টিতে ১৫ শতাংশ ও বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টে ১ শতাংশ নারী নেতৃত্ব রয়েছে। কর্নেল অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলিডিপির) কমিটিতে নারী নেতৃত্ব রয়েছে ২২ শতাংশ। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে কোনো দলেই প্রত্যাশিত ৩৩% নারী প্রতিনিধিত্ব নেই। অবশ্য এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হিসাবে একটি দলের নাম সামনে এসেছে - গণফ্রন্ট, যারা ইসিকে জানিয়েছে, তাদের কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধি রাখা হয়েছে।
সংবাদ সংবাদ সম্মেলনে হাটহাজারী উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান মোক্তার বেগম মুক্তা বলেন, সিনিয়র নেতৃত্ব নারী ক্ষমতায়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। আর্থিক সচ্ছল নারীরাও এগিয়ে যাওয়ার সাহস ও ক্ষমতা রাখে।
এছাড়া সংবাদ সম্মেলনে ৭দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলো হলো : ১. রাজনৈতিক দল সমূহে ৩৩% নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার ব্যাপারে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে যে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল (২০২০), তা যেহেতু ইতোমধ্যে অতিক্রান্ত হয়েছে, নতুন একটি সময়সীমা বেঁধে দিয়ে তা অনতিবিলম্বে প্রকাশ করা হোক, এবং বাস্তবায়নের ব্যবস্থা নেওয়া হোক। আমরা চাই এই সময়সীমা হোক ২০২৫ সাল।
২. আগামী ২০২৫ সালের মধ্যে সকল রাজনৈতিক দলের সকল কমিটিতে এক-তৃতীয়াংশ (৩৩%) প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে এই শর্ত রাজনৈতিক দল নিবন্ধন আইন ২০২০-এ যুক্ত করতে হবে।
৩. গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে সুনির্দ্দিষ্ট করা প্রয়োজন যে, রাজনৈতিক দলের সম্পাদকমন্ডলী বিশেষ করে সভাপতি/সাধারন সম্পাদক, যুগ্ম সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক পদগুলোর মধ্যে যেকোন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে নারী অর্ন্তভুক্ত করতে হবে।
৪. জেলা, উপজেলা এবং ইউনিয়নের রাজনৈতিক দলের মূল কমিটিতে নারীর অংশগ্রহণ ও অগ্রগতি কতটুকু হলো তা নির্বাচন অফিস/ কর্মকর্তারা নিয়মিত ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন। ৫. জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নারীদের ৩৩% মনোনয়ন দেওয়ার শর্ত যুক্ত করা।
৬. রাজনৈতিক দলের কমিটি গুলোর মেয়াদ শেষ হওয়ার সাথে সাথে সম্মেলনের আয়োজন করা। উপজেলা এবং জেলার
৬. মূল কমিটিতে ৩৩% নারীর অর্ন্তভূক্তির উদ্যোগ গ্রহণ করা। কার্যনির্বাহী কমিটিতেও ৩৩% নারীকে সম্পৃক্ত করা।
৭. দলীয় মনোনয়নের ক্ষেত্রে দলকে সাহসী ও কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে কেবল মাত্র প্রতীকী অংশগ্রহণ নয়, নারীর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে এবং মনোনয়ন বৃদ্ধি করতে হবে।
এসময় বক্তারা আরো বলেন, রাজনৈতিক দলসমূহে ন্যূনতম ৩৩% আসনে নারীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার দাবি আমরা জানাচ্ছি বাংলাদেশের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী। আমরা আশা করব দেশের সকল রাজনৈতিক দল তথা সরকার আমাদের এই দাবি পূরণে এগিয়ে আসবেন। নারীদের প্রতি করুণার দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং আইনের শাসনের প্রতি তাঁদের দায়বদ্ধতা প্রমাণের জন্য। আমরা এও বলতে চাই, জনগণের অর্ধেক হিসাবে জনপ্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রেও রাজনীতি তথা স্থানীয় সরকারসহ সকল পর্যায়ে ৫০% পদে নারীরা এক সময় আসবেন, এটা একটি গণতান্ত্রিক দেশে প্রত্যাশিত। আমরা যাঁরা ইতোমধ্যে বিভিন্ন পদে জনপ্রতিনিধি হিসাবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি, তাঁরা নানাভাবে এটা প্রমাণ করতে পেরেছি যে, সুযোগ পেলে নারীরাও আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন তথা সুশাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নির্বাচনে নারীরা প্রায় সময় মনোনয়ন পায়না, এবং এক্ষেত্রে যুক্তি হিসাবে প্রায়ই বলা হয়, যোগ্য নারীরা সংখ্যায় কম। এই কথিত সীমাবদ্ধতা দূরীকরণের প্রধান পন্থা হতে পারে রাজনৈতিক দলসমূহের সকল স্তরে ৩৩% পদে নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা, যা দেশের বিদ্যমান আইন অনুযায়ীও পালনীয়। আশা করি এক্ষেত্রে সকল রাজনৈতিক দল নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসবেন।
সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন, আনোয়ার থানাধীন হাইলধর ইউনিয়নের অপরাজিতা নেটওয়ার্ক এর সভাপতি উম্মে সাজিয়া সুলতানা, বটতলী ইউনিয়নের অপরাজিতা নেটওয়ার্ক এর সদস্য রওশন আক্তার প্রমূখ।