যুব ও কিশোর-কিশোরীদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য নিশ্চিত করার অঙ্গীকার গ্রহণের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামে বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ (বিএনপিএস) এর আয়োজনে দুই দিনের বিভাগীয় কনফারেন্স ২০২২ সম্পন্ন হয়েছে।
সোমবার চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গনে কনফারেন্সের শেষ দিনে তিন পার্বত্য জেলা থেকে আগত যুবা নারী, কিশোরী, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, আমন্ত্রিত অতিথিরা, কনফারেন্সে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ ‘যুব ও কিশোর-কিশোরীদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে আমি অঙ্গীকারবন্ধ’ স্লোগান সম্বলিত ফেস্টুন লাগানো বেলুন উড়িয়ে এই অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। এরআগে কনফারেন্সে মোমবাতি হাতে আলোক শিখায় বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি ও অংশগ্রহণকারীরা যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণ ও নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে শপথ গ্রহণ করেন।
কনফারেন্সের দ্বিতীয় দিনের সমাপনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন) মোহাম্মদ আনোয়ার পাশা বলেন, পাহাড়ে জীবনযাত্রায় ভিন্নতা ও বৈচিত্র্য আছে। পিছিয়ে পড়াদের মধ্যে পিছিয়ে পড়া হলো নারীরা। তাদের জন্য সেবা নিশ্চিত করা সরকারসহ সব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। বাল্য বিবাহ প্রতিরোধ কার্যক্রম আমি চাকরি জীবনে শুরু করি ২০১০ সাল থেকে নোয়াখালীর সেনবাগে যখন ইউএনও ছিলাম। তিন বছরে সেখানে ৩৫০টির মত বাল্য বিবাহ আমি প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়েছি। শেষের দিকে ভিকটিমরা অনেকে নিজেরা ফোন করত। অভিযানে গিয়ে দেখেছি অনেক বর ভয়ে পালিয়ে গেছে। বাল্য বিবাহ বন্ধের এই তাড়না পেয়েছি আমি নিজের জীবন থেকে। আমার মায়ের বিয়ে হয় ১৩ বছর বয়সে। আমরা অনেক ভাইবোনকে শৈশবে ও কৈশোরে হারিয়েছি। বাল্য বিবাহ তখন রাষ্ট্র বা প্রশাসনের বিষয় ছিল না। তখন শিশু মৃত্যু হার বেশি ছিল। এখনো বড় শহরগুলোতে বাল্য বিবাহের প্রবণতা আছে। বাল্য বিয়ে ও নারীর প্রতি সহিংসতার মত বিষয়গুলো ঠেকাতে নারীর অধিকার ভিত্তিক কার্যক্রমে এখন বিএনপিএসের মত অনেক সংগঠন এগিয়ে এসেছে। শুধু বাল্য বিয়ে ঠেকানো নয় আরো অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। যার বাল্য বিয়ে ঠেকাচ্ছি তাকে আমি সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে পারছি কিনা? যদিও আমরা সাম্যের কথা বলি কিন্তু নারীর প্রতি পরিবার ও সমাজের মানসিকতায় অনেক বৈপরীত্য আছে। কন্যাশিশুর জন্ম হলে মাকে দোষারোপ করছি অথচ তাতে মায়ের বিন্দু পরিমাণ ভূমিকা বা দায় নেই। এখন সময় বদলাচ্ছে। শুধু তথ্য প্রযুক্তি নয় নাগরিকদের চিন্তায়ও ডিজিটাল ও স্মার্ট হতে হবে। তাহলেই কেবল ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে। শুধু পাহাড়ে নয় সমতলে অনেক রকম মাইন্ডসেট আছে, অনেক কুসংস্কার আছে। এসব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
এরআগে সোমবার সকালে কনফারেন্সের দ্বিতীয় দিনের প্রথম অধিবেশনে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন বিএনপিএসের প্রকল্প ব্যবস্থাপক সঞ্জয় মজুমদার। ‘মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা’ বিষয়ে প্রেজেন্টেশন দেন বিএনপিএসের মাস্টার ট্রেনার রিমি চাকমা ও সুমিত বণিক। সঞ্জয় মজুমদারের মডারেশনে এই সেশনে প্রধান আলোচক ছিলেন পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের রিজিওনাল কনসালটেন্ট ডা. ছেহেলী নার্গিস। প্যানেল আলোচক ছিলেন উইভ'র নির্বাহী পরিচালক নাই উ প্রু মারমা এবং টংগ্যা'র নির্বাহী পরিচালক প্রাণজিত দেওয়ান। আলোচনায় অংশ নেন কিশোরী ক্লাবের সদস্যরা।
দ্বিতীয় অধিবেশন হয় 'জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা' বিষয়ে। এতে প্রধান আলোচক ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. খাদিজা মিতু। আলোচক ছিলেন ইলমা'র নির্বাহী পরিচালক জেসমিন সুলতানা পারু, কেএমকেএস এর নির্বাহী পরিচালক শেফালিকা ত্রিপুরা ও একেএস এর নির্বাহী পরিচালক ডনাই প্রু নেলী। এই অধিবেশনে প্রেজেন্টেশন দেন বিএনপিএসের ক্যাপাসিটি বিল্ডিং কোঅর্ডিনেটর নাসরিন বেগম।
অধিবেশন গুলোতে সৃজনশীল কাজের প্রদর্শনী হিসেবে নাটক ও পোস্টার উপস্থাপন করেন কিশোরী ক্লাবের সদস্যরা। মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন মেন্টর, শিক্ষার্থী, কিশোরী ক্লাবের সদস্য এবং অংশগ্রহণকারীরা।
‘আমাদের জীবন, আমাদের স্বাস্থ্য, আমাদের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক প্রকল্পটি ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন'র অর্থায়নে ও সিমাভি নেদারল্যান্ডস’র কারিগরি সহযোগিতায় ৩ পার্বত্য জেলায় ১০টি স্থানীয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (সিএসও) বাস্তবায়ন সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। তিন পার্বত্য জেলার ১৭টি উপজেলার ৬১টি ইউনিয়নে উক্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে।
‘যুব ও কিশোর-কিশোরীদের জন্য নিশ্চিত হোক যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং অধিকার’ বিষয়ক দুই দিনব্যাপী এসআরএইচআর কনফারেন্সে অংশ নেয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা উন্নয়ন সংস্থা রাঙামাটির প্রোগ্রেসিভ হিল ফ্লাওয়ার, টংগ্যা ও উইভ, বান্দরবানের অনন্যা কল্যাণ সংগঠন, গ্রাউস ও তহ্জিংডং এবং খাগড়াছড়ির জাবারাং কল্যাণ সমিতি, তৃণমূল উন্নয়ন সংস্থা, ও খাগড়াপুর মহিলা কল্যাণ সমিতি।