হাসিনা আক্তার কোহিনুর


অক্টোবর মাসটা আসলেই প্রাণের ভেতরটায় মোচড় দিয়ে ওঠে। এই দিনটাতে আমরা আমাদের প্রাণ প্রিয় বাবাকে হারিয়েছি। আজ বাবার ৫২তম মৃত্যু বার্ষিকী। 

বাবা, আপনাকে ছাড়া আরো একটি বছর কাটিয়ে দিলাম। তবুও আপনি আমাদের স্মৃতিতে আজও অমলিন। সেই মায়া ভরা সদা হাস্যোজ্জ্বল মুখটি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ঠোঁটের কোণে লাল টুকটুকে পানের পিক উঁকি দিতো। শ্বশ্রুমন্ডিত মায়াবী চেহারাটা তো ভুলতে পারি না! ভোলা যায় না! শৌর্যে-বীর্যে অসাধারণ একজন পুরুষ ছিলেন আপনি। অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। আপনি আমাদের রক্তে, আমাদের নিঃশ্বাসে মিশে আছেন। মৃত্যু অবধি আপনার স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকবো আমরা। 

উত্তপ্ত সূর্যের প্রখর তাপের নিচে বিশাল বটগাছ হলো বাবা। সেই শীতল ছায়াটিই হলো সন্তানের জন্য একটা নিরাপদ আশ্রয়। কিন্তু পিতৃহীন হয়ে বড়ো হওয়াটা যে কতো কষ্টের, কতো দুর্ভাগ্যের তা আমরা ছাড়া আর কেউ বুঝবে না। জন্মেছিলাম আমরা তিন বোন সোনার চামচ মুখে নিয়ে। সময় কাটছিলো সোহাগে-আদরে, স্নেহ-ভালোবাসা আর মায়া-মমতায়। আমরা যেন বাবার সাম্রাজ্যে একেকজন রাজকন্যা। আমাদের কদরের সীমা ছিলো না। বড় আপা চেমন আরা বেগম, আমি হাসিনা আকতার কোহিনুর ও নাছিমা আকতার শাহিনুরকে ঘিরেই বাবার আনন্দের ভূবনে সুখের সীমা ছিলো না। বাবার বাগানের শেষ ফুলটি রওশন আকতার নাচনুর তখনো প্রস্ফুটিত হয়ে পৃথিবীর আলো দেখেনি। মুরব্বীদের মুখে শুনেছি আমি নাকি বাবার অন্তঃপ্রাণ ছিলাম। যতোক্ষণ বাবা কোলে না নিতেন ততোক্ষণ আমি কাঁদতেই থাকতাম। কোলে নিয়ে আদর করলে আমিও নাকি আমার ছোট্ট হাতে বাবার শ্বশ্রুমণ্ডিত মুখটা ছুঁয়ে আদর করতাম। তখন বাবার আঙ্গুল ধরে ছোট ছোট পায়ে মাত্র হাঁটতে শিখেছি। সেই থেকে আজ অবধি আমার হাতে লেগে আছে বাবার হাতের মায়াবী ছোঁয়া, বাবার গায়ের মিষ্টি খুশবু। সব আনন্দের ছন্দ পতন ঘটিয়ে মাত্র সাড়ে তিন বছর বয়সে বাবার সাথে বিরহ-বিচ্ছেদ হয়ে গেল। বিনা মেঘে বজ্রপাত! বাবা পৃথিবীর মোহ মায়া কাটিয়ে সবাইকে শোক সাগরে ভাসিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন। আর আমরা নিপতিত হলাম ছাদবিহীন প্রখর সূর্যের নিচে বালুকাময় মরুভূমিতে। এরপর অসহায় পিতৃহীন তিন কন্যা আশ্রয় পেলাম জনমদুঃখিনী বিধবা মায়ের আঁচলের ছায়ায়। বাবা চলে যাওয়ার পনের দিন পর তার বাগানের শেষ ফুলটি রওশন আকতার নাচনুরের জন্ম হলো। বাবা নামটি উচ্চারিত হওয়ার সাথে সাথে যে কোনো বয়সী সন্তানের অন্তরে শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসা অনুভূত হয়। আমার বেলায়ও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। নিরাপদ আশ্রয়টুকু চলে গেল একেবারে অবুঝ শিশু বয়সেই! তাই বন্ধু বান্ধবীরা সবাই বাবাকে নিয়ে আনন্দে আহ্লাদে ও স্মৃতি রোমন্থনে ব্যস্ত থাকলেও আমাদের সে সুযোগ হয় নি। আমাদের স্মৃতির ভান্ডার ছিলো শূন্য। বাবাকে সাজাতে পারিনি ভাবাবেশের অলীকতায়। আঁকা হয়নি বাবা নামক বটবৃক্ষের হিমেল ছায়ার স্মৃতির কারুকাজ এবং বাবা-- বাবা-- বলে উষ্ণ বুকে আশ্রয় নিয়ে হৃদয় জুড়ানোর কোনো গল্পও লেখার সুযোগ হয় নি। তবে মা, নানু এবং আত্মীয় স্বজনের কাছে শুনেছি, ২৪ জুলাই' ১৯০৩ সালে  সাতকানিয়া থানার ঢেমশা গ্রামের সম্ভ্রান্ত এক মুসলিম পরিবারে আমার বাবা জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন বুজরুচ মেহের চৌধুরী এবং মাতা ছিলেন মোছাম্মৎ হালিমা খাতুন। ১৯১৭ সালে মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চ শিক্ষার জন্য কলকাতায় চলে যান। পরে লেখাপড়া শেষ করে সেখান থেকে এসে চট্টগ্রাম আদালতে আইন পেশা শুরু করেন। বাবা ছিলেন প্রতিথযশা আইনজীবী, চট্টগ্রাম জেলা বার এসোসিয়েশনের সভাপতি, চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের সদস্য, পটিয়া মহকুমা সদর বারের সাধারণ সম্পাদক ও সাতকানিয়ার অবিভক্ত ঢেমশা ইউনিয়নের ছত্রিশ (৩৬) বছর যাবত দায়িত্ব পালনকারী প্রেসিডেন্ট বা চেয়ারম্যান। তিনি অনেক জনহিতকর কাজে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আমার শিক্ষানুরাগী বাবা বিভিন্ন প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে নিজের বত্রিশ (৩২) কানি জমির উপর দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রাচীনতম বিদ্যাপীঠ সাতকানিয়া সরকারি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

সাতকানিয়া ডাক বাংলো প্রতিষ্ঠার জন্য জমি দান করেন। নিজের অর্থায়নে সাতকানিয়া বাসীর বহুল প্রত্যাশিত চেমন আরা সড়ক নির্মাণ করেন এবং কলেজ রোড সংলগ্ন নিজের জমির উপর দৃষ্টিনন্দন "মোজাফফর মোক্তার মসজিদ" নির্মাণ করেন। এছাড়া তিনি সাতকানিয়া এবং চট্টগ্রাম শহরের অনেক স্কুল, এতিমখানা ও মাদ্রাসার উন্নয়নের সাথেও জড়িত ছিলেন। সমাজসেবা ও জনহিতকর কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ তৎকালীন পাকিস্তান সরকার থেকে তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ সমাজসেবক পদক "টি কে" (তমগায়ে খেদমত) উপাধিতে ভূষিত হন।

সাতকানিয়া-লোহাগড়া সমিতি ঢাকাসহ বিভিন্ন সংগঠন বাবাকে মরণোত্তর পদকে ভূষিত করেছেন। জাতীয় পার্টি আমলে সংসদ সদস্য ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের তৎকালীন সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ইব্রাহিম বিন খলিল চৌধুরীর উদ্যোগে যোগাযোগ মন্ত্রী মাননীয় আনোয়ার হোসেন মঞ্জু সাতকানিয়া রাস্তার মাথা থেকে কলেজ পর্যন্ত সড়কটি "আলহাজ্ব মোজাফফর আহমদ চৌধুরী সড়ক" নামে উদ্বোধন করেন। আমরা সেজন্য ইব্রাহিম বিন খলিল চৌধুরীকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি। 

বাবা ছিলেন খুবই ধর্মভীরু। প্রতিদিন ভোরে উঠে নামাজ পড়ে মুখস্থ কোরআন তেলোয়াত করে 'মোক্তার বাড়ি'র ঘুরানো বারান্দা এবং  বাগানে মর্নিং ওয়াক ছিলো তার নিত্যদিনের অভ্যাস। বাবার চেহারার আদলসহ সবকিছু নাকি দাদা ভাইয়ের মতো ছিলো। দাদা ভাইয়ের মতো বাবারও একটি ঘোড়া ছিলো। বাবা গ্রামের বাড়ি গেলে গাড়ির হর্ণ শুনে ঘোড়াটি বাবাকে এগিয়ে নিতে আসতো। বাবা চলে যাওয়ার পর ঘোড়াটি বাবার কবরের পাশে শুয়ে শুয়ে কাঁদতো। পরে শুনেছি অল্প ক'দিন পর ঘোড়াটিও মারা গেছে।

চলাফেরায় বিলাসবহুল অত্যাধুনিক মডেলের বেশ দামী গাড়ি ব্যবহার, চলনে-বলনে, কথা-বার্তায় আভিজাত্যতা রক্ষা করে চললেও বাবা ছিলেন গরীবের অন্তঃপ্রাণ। আদালতে গরিব ও নির্যাতিত মানুষের অভিযোগ প্রাথমিক দৃষ্টিতে সত্য প্রতীয়মান হলে তিনি বিনা ফিতে মামলা পরিচালনা করে তাদের অধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় অনেক নজির রেখে গিয়েছিলেন। বাবার দরজা নাকি মেহমান ও গরিবদের জন্য সব সময় খোলা ছিলো। কেউ নাকি কোনো সময় না খেয়ে ঘর থেকে যেতে পারে নি। তাছাড়া অসংখ্য গরিব মেয়েকে নিজ খরচে বিয়ে দিয়ে কন্যা দায়গ্রস্ত পিতাকে উদ্ধার করেছেন। আমার বাবা ছিলেন অসম্ভব জনপ্রিয়। ঊনিশ শত একাত্তর সালের একুশে অক্টোবর বাবার চলে যাওয়ার খবর শুনে চট্টগ্রামে বিশেষ করে দক্ষিণ চট্টগ্রামে নেমে এসেছিলো শোকের ছায়া। শুরু হয়েছিলো শোকের মাতম। সর্বশ্রেণীর মানুষের অংশ গ্রহণে বিশাল জানাযার নামাজে তার জনপ্রিয়তার প্রমাণ মিলে। মাত্র সাড়ে তিন বছর বয়সে বাবাকে হারানো যে, কতোটা বেদনাদায়ক, কতোটা কষ্টকর তা একমাত্র আমাদের মতো শিশু বয়সে পিতৃহারা সন্তানরাই জানে। আমাদের শহরের বাড়ির বৈঠক খানায় রাখা সাদা কাফনে জড়ানো বাবার মায়াভরা মুখটা ছাড়া তেমন কোনো স্মৃতি মনে না পড়লেও মা, নানু, আত্মীয়-স্বজন, মরহুম এডভোকেট বদিউল আলম চাচা এবং বাবার বন্ধু আমার খালু এডভোকেট মরহুম আহমেদুর রহমান সাহেব থেকে বাবার শৌর্য বীর্যের কথা জানতে পেরেছি। আজ আমি শ্রদ্ধার সাথে তাঁদের স্মরণ করছি। বাবা সম্পর্কে জানা সবার বর্ণনা মতে বাবাকে আমার মানসপটে আঁকতে চেষ্টা করেছি। 

"বাবা ছিলেন দক্ষিণ চট্টগ্রামের সিংহ পুরুষ। আইনের শাসন প্রত্যাশী প্রতিথযশা আইনজীবী, স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষা বিস্তারে সংগ্রাম রত  শিক্ষানুরাগী, সব ধরণের কল্যাণ কাজে সাহায্যকারী দানবীর, সমাজ সংস্কারে বিভোর সমাজসেবক, গরিবের দুঃসময়ে সাহায্য কারী গরিবের  বন্ধু, উন্নয়নের পক্ষে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী সাহসী, স্পষ্টবাদী, ধর্মভীরু, নিরহংকারী, অসম্ভব জনপ্রিয় ও অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী একজন নেতা ছিলেন।"

আমার মরহুম বাবা মোজাফফর আহমদ চৌধুরী টি কে আমাদের আদর্শ, আমাদের অহংকার, আমাদের গৌরব ও আমাদের প্রেরণা। এমন একজন ক্ষণজন্মা খ্যাতিমান পুরুষের ঔরসে জন্ম গ্রহণ করে আমরা আজ ধন্য।
মহান রাব্বুল আলামীনের দরবারে শোকরিয়া আদায় করছি। আপনারা সবাই আমাদের মরহুম বাবার জন্য দোয়া করবেন।

"রাব্বির হাম হুমা কামা রাব্বাইয়ানী সাগিরা।" 

আল্লাহ আমাদের বাবার সকল গোনাহ মাফ করে তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউসের উচ্চ মাকামে অধিষ্ঠিত করুন।
আমীন।