২০১৮ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলনের মুখে নতি স্বীকার করে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোটা বাতিল করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। কিন্তু ২০২৪ সালের জুনে হাইকোর্টের এক রায়ে আবারো কোটা পদ্ধতি কার্যকর হলে নতুন করে ক্ষোভে ফেটে পড়ে ছাত্রসমাজ। দেশজুড়ে গড়ে ওঠে আন্দোলন, যা ইতিহাসে ‘জুলাই বিপ্লব’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।

২০২৪ সালের ১ জুলাই শুরু হয়ে ৫ আগস্ট পর্যন্ত টানা পাঁচ সপ্তাহ দেশজুড়ে চলা এই অভূতপূর্ব গণআন্দোলনে ছাত্র, চাকরি প্রার্থী, যুবকসহ সর্বস্তরের জনগণ অংশ নেয়। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ শুরু হলেও সরকারের কঠোর দমননীতির ফলে তা রূপ নেয় গণজাগরণে। আন্দোলনের চূড়ান্ত ফলাফল আসে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান এবং পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা দায়েরের মধ্য দিয়ে।

১৩৫ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্রে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়। অভিযোগে বলা হয়, ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ, হত্যাকাণ্ড, অঙ্গহানি, নির্যাতনসহ নানা অপরাধ সংঘটিত হয়েছে রাষ্ট্রীয় মদদে এবং আসামিদের সরাসরি নির্দেশনায়।

মোট ৮১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য এবং বিপুল পরিমাণ নথি-প্রমাণের ভিত্তিতে এই অভিযোগ গঠিত হয়। চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন পরবর্তীতে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হন। মামলার বিচার শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩-এর অধীনে।

আন্দোলনের সময়কার ঘটনাবলি অনুসারে, ৪ জুলাই আপিল বিভাগ কোটা সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় স্থগিত না করায় আন্দোলন জোরদার হয়। ৬ জুলাই ‘বাংলা ব্লকেড’, ১০ জুলাই ‘সরকারি চাকরিতে কোটার বিরুদ্ধে অব্যাহত বিক্ষোভ’, ১৪ জুলাই রাষ্ট্রপতি বরাবর স্মারকলিপি পেশ এবং পরবর্তীতে শেখ হাসিনার ‘রাজাকার’ মন্তব্য আন্দোলনকে আরও উত্তাল করে তোলে।

এই সময় ছাত্রলীগ ও সরকারপন্থী সংগঠনগুলোর সশস্ত্র হামলায় বহু শিক্ষার্থী আহত হন। রংপুরে আবু সাঈদের গুলিতে মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। এমনকি জাতিসংঘের মনোগ্রামযুক্ত সাঁজোয়া যান ব্যবহার করে বিক্ষোভ দমন করার অভিযোগ ওঠে। সাধারণ মানুষ, রিকশাচালক, শ্রমিক থেকে শুরু করে বহু প্রবাসীও এই আন্দোলনে শরিক হন।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আন্দোলনে শহীদ হন অন্তত ১,৪০০ জন, যাদের মধ্যে ১২-১৩ শতাংশই শিশু। আহত হন প্রায় ৩৫,০০০ জন, গ্রেফতার করা হয় অন্তত ১৭,৭০০ জনকে। এই মানবিক বিপর্যয় থেকে উদ্ভূত হয় গণআন্দোলনের চূড়ান্ত সফলতা—একনায়কতান্ত্রিক শাসনের অবসান।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এই অপরাধের বিচার একটি ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া হয়ে উঠেছে। ১০ জুলাই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয়। ৩ আগস্ট মামলার সূচনা বক্তব্য এবং ৪ আগস্ট প্রথম সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।

৫ আগস্টের পর ট্রাইব্যুনালে ২৭টি মামলা হয়, যাতে ২০৬ জনকে আসামি করা হয় এবং ৭৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়। একজন আসামি কারাগারেই মৃত্যুবরণ করেন।

এই বিচারের মাধ্যমে বাংলাদেশ এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে—একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক এবং ফ্যাসিবাদ-মুক্ত রাষ্ট্রের পথে।