চট্টগ্রাম শহরে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অবৈধ ভবনের সংখ্যা। মনে হচ্ছে ভবনমালিকদের মধ্যে যেন আইন না মানার প্রতিযোগিতা চলছে। আশ্চর্যের বিষয়, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) নিজস্ব ভবনেও মানা হয়নি বিল্ডিং কোড—পার্কিং স্পেস বরাদ্দ থাকলেও তা দোকান হিসেবে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। সিডিএর নিজস্ব জমিও দখল হয়ে যাচ্ছে অন্যদের হাতে, যেখানে গড়ে উঠছে বাড়িঘর ও বাণিজ্যিক স্থাপনা। ফলে একদিকে সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব, অন্যদিকে নাগরিকরা ভোগান্তিতে পড়ছে প্রতিনিয়ত।
গত আট মাসে সিডিএ ভ্রাম্যমাণ আদালত ১৮টি উচ্ছেদ অভিযান চালালেও বড় কোনো প্রভাবশালী অপরাধীর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সিডিএর অভ্যন্তরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট অনৈতিক সুবিধার মাধ্যমে এসব অবৈধ ভবন ও মালিকদের রক্ষা করছে। সংশ্লিষ্ট মহল এ অভিযানকে “আইওয়াশ” বা লোক দেখানো পদক্ষেপ বলেই অভিহিত করেছেন।
১৮টি অভিযানে কোটি টাকার জরিমানা, কিন্তু দখল বহাল তবিয়তে
সিডিএ আদালত সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ২ মার্চ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ১৮টি উচ্ছেদ অভিযানে ১ কোটি ১৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ ও ৪২ লাখ টাকা সরকারি জরিমানা আদায় করা হয়েছে। অভিযানের সময় ৫০–৬০টি স্থাপনার মালিককে সতর্ক করা হলেও রহস্যজনকভাবে তারা অবৈধ স্থাপনা সরাননি। বরং অনেক ক্ষেত্রে উচ্ছেদ হওয়া স্থানে নতুন ভবন নির্মাণ করে বাণিজ্যিক ভাড়াবাণিজ্য চলছে।
চান্দগাঁওয়ের সিটি গার্ডেন এলাকায় ১৯৬২ সালে সিডিএ অধিগ্রহণ করা প্রায় ৪ বিঘা জমি এখন দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে। তারা গ্যাস ও বিদ্যুতের সংযোগ নিয়ে ভাড়াবাণিজ্য করছে। কর্ণফুলী গ্যাস কোম্পানি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলেও সিডিএ নেয়নি কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ।
নিজেদের ভবনেও নিয়ম ভঙ্গ
নিউমার্কেট এলাকার রয়েল প্লাজা—সিডিএর মালিকানাধীন বহুতল ভবনটির পার্কিং স্পেসে নিয়ম ভেঙে চলছে দোকান ব্যবসা। আশপাশের ভবনগুলোর অবস্থাও একই; গ্রাউন্ড ফ্লোর পর্যন্ত দোকান, পার্কিংয়ের অস্তিত্ব নেই। এমনকি চেরাগি পাহাড়ে এস আলম গ্রুপ অনুমোদন ছাড়াই ২৩ তলা ভবন নির্মাণ করেছে—সিডিএ সেখানেও নিশ্চুপ।
বায়েজীদ বোস্তামী মাজারসংলগ্ন সংরক্ষিত এলাকায় অবৈধ নির্মাণ, পাহাড়তলীতে উচ্ছেদকৃত দোকান পুনর্নির্মাণ, জামালখান ও আশ্রাফ আলী রোডে নকশাবহির্ভূত নির্মাণ—সবখানেই একই চিত্র: উচ্ছেদ হয়, আবার গড়ে ওঠে নতুন ভবন।
হাজারো অননুমোদিত ভবন, চোখ বুজে সিডিএ
চট্টগ্রাম নগরের প্রায় প্রতিটি এলাকায়—আসাদগঞ্জ, খাতুনগঞ্জ, চান্দগাঁও, মুরাদপুর, জিইসি, লালখানবাজার, চকবাজার, জামালখান, আগ্রাবাদ, পতেঙ্গা—অসংখ্য অননুমোদিত ও নকশাবহির্ভূত ভবন রয়েছে। অথচ ব্যবস্থা নেওয়া তো দূরের কথা, মাঝে মাঝে নোটিশ দিলেও পরে “সমঝোতা” করে নিরব থাকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সিডিএ আইন কর্মকর্তা মো. নাসির খান বলেন, “মামলা জটিলতার কারণে কিছু অননুমোদিত ভবনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। আদালতের রায় পেলেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
অন্যদিকে পরিদর্শক তোফায়েল আহমেদ দাবি করেছেন, “সব অননুমোদিত ভবনের তালিকা করা হচ্ছে, পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সংখ্যায় ভয়ঙ্কর চিত্র
সিডিএর ২০২৪ সালের তথ্যানুসারে, চট্টগ্রাম মহানগরে ভবনের সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ, এর মধ্যে বহুতল ভবন ১০ হাজারের বেশি। পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে ছয়তলার বেশি ভবনের ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক হলেও, অনুমোদন নিয়েছে মাত্র ১০০টির মতো। সূত্র বলছে, অনেক ভবনের নকশা অনুমোদন হয়েছে “অনৈতিক সুবিধার” মাধ্যমে।
ভেতরের চিত্র: ঘুষে নীরবতা, তদবীরের দেয়াল
তদন্তে জানা গেছে, অবৈধ ভবনগুলো থেকে সিডিএর কিছু কর্মকর্তা নিয়মিত ঘুষ নেন, যার বিনিময়ে তারা চোখ বন্ধ করে রাখেন। অথরাইজড অফিসার ২ মো. তানজিব হোসেন বলেন, “আমাদের ত্রুটি একদম নেই বলা যাবে না। তবে আমরা চেষ্টা করছি নিয়ম ফিরিয়ে আনতে।”
সিডিএর এক অভ্যন্তরীণ সূত্রের মন্তব্য—
“কিছু বিষয় সিডিএ একা সমাধান করতে পারে না; রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। অনেক সময় ওপর থেকে তদবীর আসে, ফলে মাঝপথেই আটকে যায় বিচার প্রক্রিয়া।”