লাজুক গৃহবধূ থেকে ক্যারিশম্যাটিক নেত্রী হয়ে ওঠার
 গল্প

“পাত্রী এত রূপসী যে, তাঁকে বিয়ে করলে বিজলিবাতির দরকার হবে না”
এই উক্তিটি যেন একসময় বৃহত্তর দিনাজপুরজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। সেই পাত্রীই পরবর্তীতে হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা বেগম খালেদা জিয়া।
খালেদা জিয়ার পিতা এস্কান্দার মজুমদার ছিলেন ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার শ্রীপুর গ্রামের বাসিন্দা। ১৯১৯ সালে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় তিনি তাঁর বোন ও ভগ্নিপতির সঙ্গে ভারতের জলপাইগুড়িতে যান। সেখানে মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে প্রথমে চা বাগানে চাকরি এবং পরে চায়ের ব্যবসা শুরু করেন। ব্যবসায়িক সাফল্যের ধারাবাহিকতায় একপর্যায়ে তিনি জলপাইগুড়ির ‘চা–বাগান সমিতি’র সম্পাদক নির্বাচিত হন।
১৯৩৭ সালে তাঁর বিয়ে হয় পঞ্চগড়ের মেয়ে তৈয়বা খাতুনের সঙ্গে। এই দম্পতির তিন মেয়ে ও দুই ছেলের মধ্যে খালেদা ছিলেন তৃতীয়। দেশভাগের পর, ১৯৪৭ সালে, পরিবারটি দিনাজপুরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে।
মরহুম সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ তাঁর গ্রন্থ ‘বেগম খালেদা জিয়া: জীবন ও সংগ্রাম’-এ খালেদা জিয়ার নামকরণের পেছনের গল্প তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন—শিশুটি পুতুলের মতো সুন্দর ও কমনীয় হওয়ায় পরিবারের সবাই আদর করে তাঁকে “পুতুল” নামে ডাকতেন। এই নামটি দিয়েছিলেন তাঁর বড় বোন সেলিমা ইসলাম। সবচেয়ে বড় বোন খুরশিদ জাহান তাঁকে ডাকতেন ‘টিপসি’ নামে, যদিও সেই নাম পরে আর প্রচলিত ছিল না। আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর নাম রাখা হয় খালেদা খানম।
পারিবারিক চিকিৎসক অবনী গোস্বামী নবজাতকের নাম ‘শান্তি’ রাখার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর অস্থির সময়ে এই নাম শান্তির প্রতীক হতে পারত। তবে তৎকালীন সাম্প্রদায়িক বাস্তবতায় সেই নাম রাখা সম্ভব হয়নি। ফলে আদরের নাম হিসেবেই ‘পুতুল’ থেকে যায়।
মহিউদ্দিন আহমদের ‘খালেদা’ বইয়েও এই নামকরণের গল্প উঠে এসেছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, ১৯৮৪ সালের ১ এপ্রিল খালেদা জিয়া বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হওয়ার পর মাসিক নিপুণ পত্রিকায় তাঁর মা–বাবার একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। সেই সাক্ষাৎকারে তাঁর বাবা এস্কান্দার মজুমদার বলেন, খালেদা ছিল সবার আদরের, দেখতে–শুনতে সবার চেয়ে ভালো এই কারণেই তাঁকে ‘পুতুল’ নামে ডাকা হতো।
শৈশবে খালেদা জিয়া ছিলেন প্রাণবন্ত ও দূরন্ত। বড় বোন সেলিমার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল গভীর ও বন্ধুত্বপূর্ণ। অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের মতো দুই বোন একই বিছানায় ঘুমাতেন। তাঁর চুল ছিল লম্বা; গোসলের পর চুল শুকানো কঠিন হতো বলে বাইরে যাওয়ার সময় মা নিজ হাতে চুল বেঁধে দিতেন। চাচাতো বোন নার্গিসের সঙ্গে ছিল তাঁর ঘনিষ্ঠতা, দুজন একসঙ্গে স্কুলে নাচও শিখতেন।
দুটি বইতেই উঠে এসেছে খালেদা জিয়ার ফুলপ্রীতির কথা। ১৯৮৩ সালের মার্চে নিপুণ পত্রিকায় ‘খালেদা জিয়ার দিনকাল’ শিরোনামে প্রকাশিত লেখায় তাঁর ফুলের প্রতি ভালোবাসার কথা উল্লেখ করা হয়। সেখানে আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুনের তোলা খালেদা জিয়ার একক ছবি এবং দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোর সঙ্গে তোলা ছবি প্রকাশিত হয়।
সেই লেখাটি ছিল প্রথাগত সাক্ষাৎকার নয়। কারণ, খালেদা জিয়া সাধারণত সাক্ষাৎকার দিতে অনাগ্রহী ছিলেন। তবে আলাপে তিনি বলেছিলেন,
“আগে আমার শখ ছিল ফুলের বাগান করা। ফুল সংগ্রহ করা এখনো আমার হবি। বিদেশ সফরে অনেক উপহার পেলেও আমি শুধু ফুলই রেখে দিই। ফুল আমার খুব ভালো লাগে।”
এই সময় তরুণ ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা কর্মকর্তা হিসেবে দিনাজপুরে কর্মরত ছিলেন। খালেদা জিয়ার মায়ের চাচাতো বোন ছিলেন জিয়ার মা। পারিবারিক পরিবেশেই জিয়াউর রহমান প্রথম খালেদাকে দেখেন এবং পছন্দ করেন। তিনি বিয়ের প্রস্তাব জানিয়ে বাবার কাছে চিঠি পাঠান। তখন তাঁর বাবা করাচিতে অবস্থান করলেও বিয়েতে সম্মতি দেন।
১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট, শুক্রবার, দিনাজপুরের মুদিপাড়ায় খালেদা জিয়ার পিত্রালয়ে তাঁদের বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। বিয়েতে খালেদা জিয়া পরেছিলেন তাঁর মায়ের লাল বেনারসি শাড়ি। অনুষ্ঠান ছিল অত্যন্ত সাদামাটা।
সাবেক স্পিকার জমির উদ্দিন সরকারের লেখা ‘দ্য পলিটিক্যাল থট অব তারেক রহমান’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে—তিন বোনের মধ্যে খালেদাই ছিলেন সবচেয়ে সুন্দর। সেই সময় একটি গল্প দিনাজপুরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এক ঘটক জিয়াউর রহমানকে বলেছিলেন,
“আপনি যদি তাঁকে বিয়ে করেন, তাহলে আপনার বাড়িতে বিজলিবাতির দরকার হবে না। তাঁর রূপের আলোতেই অন্ধকার দূর হয়ে যাবে।”
জিয়া হেসে সম্মতি দেন,আর গড়ে ওঠে এক সুখী দাম্পত্য।
রাজনৈতিক জীবনে খালেদা জিয়া ছিলেন অনন্য। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো তিনি পৈতৃক নিবাস দিনাজপুর–৩ আসন থেকে মনোনয়নপত্র জমা দেন। পাশাপাশি বগুড়া–৭ ও ফেনী–১ আসনেও প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এর আগে তিনি ফেনী, বগুড়া, লক্ষ্মীপুর, সিরাজগঞ্জ, চট্টগ্রাম, ঢাকা, রাজশাহী ও খুলনাসহ বিভিন্ন আসন থেকে নির্বাচন করেছেন।
একাধিক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও তিনি কখনো পরাজিত হননি। ২০০৮ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত পাঁচটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৩টি সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রতিটিতেই বিজয়ী হওয়া বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে খালেদা জিয়া একমাত্র উদাহরণ।

লেখক: কলামিস্ট ও সংবাদ কর্মী