অপেক্ষা! আবারও ওসমান হাদি ফিরবে। ইনসাফের কথা বলবে। তেজদীপ্ত কন্ঠে সত্যে এবং অধিকারের আওয়াজ তুলবে। রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবি, সাংবাদিক, লাখো কোটি ছাত্রজনতার মুনাজাতে ওসমান ফিরে আসবে। মসজিদে মসজিদে জায়নামাজে বসে চলছে ওসমানের জন্য প্রার্থনা। দলমত নির্বিশেষে কেউ ওসমানকে সন্তান কেউবা অভিভাবক সম্বোধন করে অভিব্যক্তির কথা জানাচ্ছেন। কেউ বলছেন ওসমান আমার ভাই, ওসমানই বাংলাদেশ। আবার কেউবা জানাচ্ছেন ওসমানরা প্রতিদিন জন্মায় না, যুগে যুগে কালেভদ্রে ওসমানরা আসে। এদেশে ওসমানদের খুব প্রয়োজন। নিজের জীবনের বিনিময়ে অনেকে আল্লাহ কাছে ওসমানকে ভিক্ষা চাচ্ছেন। অনেকে প্রিয়জনকে হারানোর বেদনার সঙ্গে ওসমানের গুলিবিদ্ধ হওয়ার বেদনাকে তুলনা করছেন। সব কিছুকে চাপিয়ে ভিন্ন দৃষ্টি দেখা গেছে শনিবার ঢাকা মেডিকেল থেকে যখন ওসমানকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তখন এক দল তরুণ এক সঙ্গে এক কন্ঠে হাউমাউ করে চিৎকার করে বলছেন "ওসমান, আমাদের ছেড়ে যাইস না" যাইস নারে ভাই আমার আমাদের ছেড়ে। ওসমান! ওসমান!! ওসমান!!! কিন্তু ওসমান কী এই আওয়াজ শুনেছে! তাঁর কানে কী এই বেদনার সূর পৌঁছেছে। তা অজানা। ওসমানের তখন দৃশ্যপট ছিলো রক্তেভেজা। মাথা শুভ্র কাপড়ে ঢাকা। মুখমণ্ডলে জমাট রক্ত। চোখ দুটো বন্ধ। হুশ রয়েছে এমন দৃশ্যও দেখা যায়নি। তবুও ভক্তদের স্কেস ধরে এ্যাম্বুলেন্সে উঠানোর আগ পর্যন্ত ছিলো স্বার্থহীন বেদনার বোবা কান্না। এই কান্না শুধু হাসপাতালে নয়, দেশবিদেশে লাখো ভক্ত নেটদুনিয়া অভিভ্যক্তি জানাচ্ছেন।  

ইতিমধ্যে এই আবেগের ক্ষুদ্র ভিডিও ক্লিপ ইতিমধ্যে দেশবিদেশে ছড়িয়ে গেছে। প্রতি ঘণ্টা প্রতি মিনিটে লাখো কোটি মানুষ ওসমানের দিকে চেয়ে আছে। কখন ওসমান ফিরছে। কখন আবার ওসমানের হুঙ্কার শোনা যাবে। গণমাধ্যমের স্কিনে একটি সুখবরের অপেক্ষা। সবশেষ শনিবার বিকেলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন ওসমানের কিডনির কার্যক্ষমতা ফিরলেও অবস্থা উদ্বেগজনক। এখনও জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে সবার ওসমান। উদ্বেগ কাটেনি মেডিকেল বোর্ডের। 

শেখ মোস্তাফিজুর রহমান নামের এক চিকিৎসক লিখেন- হাদী তুই মানে আমি। হাদী তুই মানে আমার সন্তান।হাদী তুই মানে জন্মভূমি। হাদী আমার মা মারা গেছেন গত জুন মাসে। তারপর থেকে কারো জন্য এমন করে চোখে জল আসে নাই। তারপর থেকে কারো জন্য এমন করে বুকের ভেতর যন্ত্রণা হয় নাই। অথচ ভাই হাদী তোর সাথে আমি কোনদিন বাস্তবে একটিবার দেখা করি নাই এমনকি কথাও বলি নাই। তারপরেও ভাই তোর জন‍্য আমার কলিজাটা ছিড়ে যাচ্ছে। ভাই তুই তো আমাদের মতো সাধারন মানুষের পক্ষে প্রতিবাদী কন্ঠস্বর। তুই তো আমাদের মতো মজলুমের জন‍্য ইনসাফের লড়াইয়ে এক নিঃসঙ্গ শেরপা।

আসলাম হাওলাদার নামের এক ভক্ত লিখেছেন, আমরা ছোটবেলায় টিপু সুলতান দেখতাম তখন থেকে বুঝেছি সে ছিল একজন বীর পুরুষ তারা কখনো ইংরেজদের কাছে হার মানেনি, সারেন্ডার করেনি , সিংহের মত গর্জন দিয়ে যুদ্ধ করেছে।  শহীদ হয়েছে , তারপরও তার তরবারি ছিল বীরের মতন । এখন দেখছি আমাদের ওসমান ভাই উনিও একজন বীর । আল্লাহ আমাদের ওসমানকে ফিরিয়ে দিক মুনাজাতে এইটুকুই আমার/ আমাদের প্রার্থনা... । 

মোহাম্মদ আবদুল্লাহ মজুমদার। এই সময়ের একজন কবি ও সংগঠক। তিনি ওসমানের ছবি দিয়ে ফেসবুকে লিখেছেন, বিপ্লব আমাদের কাছে নির্মম পিপাসায় একফোটা সজীবতা।আমরা আমৃত্যু ক্রীতদাস থাকার ঘোর বিরোধী,তাই ঝড়ের আত্মনাদ শুনলে বিজলীর ন্যায় ছুটে যাই।কারণ শাহাদাৎ আমাদের কাছে অমরত্বের কবিতা। ওসমান আমাদের ভাই। ওসমানই বাংলাদেশ। 

নাজমুল হোসাইন লিখেন- “হাদি শুধু একটি নাম নয়, নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নবাহক এক সাহসী প্রাণ।যে সত্যের পাশে দাঁড়াতে জানে, যাকে থামাতে পারে না দুশমনের গুলিও।বাংলাদেশ বদলাবে- এমন হাদিদের হাত ধরেই।কারণ আলোকে কখনো অন্ধকার থামাতে পারে না।”
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষারথী নাসিম আরাফাত বলেন, হাদী যদি বাঁচে—সে আরও শক্ত হয়ে ফিরবে।আর যদি না বাঁচে—ঘরে ঘরে জন্ম নেবে হাজারো হাদী।ফি আমানিল্লাহ। 

রাজনৈতিক ব্যাক্তি মোঃ সাইফ সালাউদ্দিন খাঁন বলেন, ওসমান হাদী বেচা বিক্রি না-হওয়া, রণহুংকার দেয়া এক বিপ্লবী বীর এর নাম।অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদী কন্ঠস্বর ওসমান হাদি। ওসমান হাদিরা একবারই জন্মে।।আর তাদের কখনো মৃত্যু হয় না।এই হাদি বেঁচে ফিরুক, মহাকাব্য রচনা করুক রাজনীতিতে"!অন্তরের অন্তস্তল থেকে হাদির জন্য দোয়া।আল্লাহ তাকে আমাদের মাঝে ফিরিয়ে আনুক।

মেহেদী হাসান সোহাগ লিখেন- আমি শুধু স্মরণ করছি, খুব বেশি না মাত্র তিন দিন আগে হাদি ভাইকে সময় টিভিতে প্রশ্ন করা হলো, "এই যে কোনো রকম সেফটি ছাড়া নির্বাচনী প্রচারনায় হাঁটেন আপনার ভয় লাগে না?হাদি ভাই বলেন, "আমি ছোটবেলা থেকে এই স্বপ্নটা দেখি যে, একটা তুমুল মিছিল হচ্ছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে। সেই মিছিলে আমি আছি। কোনো একটা বু'লে'ট এসে আমার বুকটা বিদ্ধ করে দিয়েছে এবং আমি হাসতে হাসতে শহীদ হয়ে গেছি। সবাই যখন মৃত্যুটাকে ভীষণ ভয় পায়, আমি তখন আল্লাহর কাছে সন্তুষ্টি নিয়ে পৌঁছাতে চাই। ইনসাফের হাসি নিয়ে আমি আমার আল্লাহর কাছে পৌঁছাতে চাই"

উল্লেখ্য, গত শুক্রবার দুপুরে জুমার নামাজ শেষে রিকশায় গন্তব্যে ফিরছিলেন ইনকিলাব মঞ্চের ওসমান হাদি। রাজধানী বিজয়নগরের কালভার্ট এলাকায় পৌঁছলে পেছন থেকে আসা মোটরসাইকেলের আরোহী থেকে খুব কাছ থেকে ওসমান হাদির মাথা লক্ষ্য করে গুলি চালায়। গুলি তার মাথার ডান পাশ দিয়ে ঢুকে বাম পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। এরপর মোটরসাইকেলের গতি বাড়িয়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। গুরুতর আহতাবস্থায় দুপুর ২টা ৩৫ মিনিটে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) নেওয়া হয়। উন্নত চিকিৎসার আশায় একই দিন রাত সাড়ে ৭টার দিকে পরিবারের সিদ্ধান্তে হাদিকে এভারকেয়ারে হাসপাতালে নেওয়া হয়।